Image description

ঠাকুরগাঁও পৌরসভা এলাকায় অবস্থিত হাজীপাড়া আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। এ কেন্দ্রের এক হাজার ৯৩৫টি বৈধ ভোটের মধ্যে জামায়াত প্রার্থী পেয়েছেন ৬৬৭টি। আর বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন পেয়েছেন এক হাজার ২৫০ ভোট। চার হাজার ১৩৮ ভোটারের মধ্যে পড়েছে এক হাজার ৯৩৫ ভোট। শুধু নিজের কেন্দ্র নয়, ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের ১৮২টি ভোটকেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন এ প্রার্থী, যা মোট ভোটকেন্দ্রের ৯৮ শতাংশের বেশি। তিনি মাত্র তিনটি ভোটকেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছেন, যা সব কেন্দ্রের দুই শতাংশের কম। অপর দিকে নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্য বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন ওই তিনটি বাদে বাকি সবকেন্দ্রে একচেটিয়া জয় পেয়েছেন। তবে আ.লীগ ও সংখ্যালঘু ভোট বিএনপির প্রার্থীর বিজয়কে আরও এগিয়ে রাখে। বিএনপি প্রার্থীর বিজয়ের পেছনে এ উপ-নির্বাচনের কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

স্থানীয় রাজনীতিক ও বিশিষ্টজনদের মতে, সাধারণ মানুষের ধারণার চেয়েও বেশি ভোট পেয়ে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন মির্জা ফয়সল আমীন। আর প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম ভোট পেয়েছেন দেলাওয়ার হোসেন। তাদের মতে, আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘুসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের ভোট টানতে পেরেছেন বিএনপির প্রার্থী। এক্ষেত্রে মির্জা ফখরুল ইসলামের ইমেজ ও উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি, বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে নেওয়া উন্নয়ন প্রকল্প অব্যাহত রাখার মতো ইস্যুগুলো জয়ে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে।

ফলাফলে আরও দেখা গেছে, রুহিয়া, ভূল্লী ও সদর উপজেলা নিয়ে ঠাকুরগাঁও-১ আসন গঠিত। রুহিয়া ও ভূল্লী উপজেলার প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই বিএনপির প্রার্থী জয় পেয়েছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন যে তিনটি কেন্দ্রে জয় পেয়েছেন তা ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলায়। ১৮৫টি কেন্দ্রের ফলাফলে বিএনপি পেয়েছে দুই লাখ ২৭ হাজার ৭৮৯ ভোট। জামায়াত পেয়েছে ৯৬ হাজার ৪৫৩ ভোট। দুই প্রার্থীর ব্যবধান এক লাখ ৩১ হাজার ৩৩৬।

এদিকে, বিপুল ভোটের ব্যবধানে জয় পেলেও প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থীর সঙ্গে শুক্রবার দেখা করেছেন মির্জা ফয়সল আমীন। ভোটের পরদিন শুক্রবার দেলাওয়ার হোসেনের বাসায় ফুলের তোড়া নিয়ে যান তিনি। ?এ সময় দুজন কোলাকুলি করেন এবং একে অপরকে মিষ্টিমুখ করান। মির্জা ফয়সল আমীন দলীয় মতপার্থক্য ভুলে দেলাওয়ার হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। জবাবে দেলাওয়ার হোসেনও ঠাকুরগাঁওয়ের যে কোনো উন্নয়নমূলক কাজে পাশে থাকার কথা জানান।

যদিও জামায়াত দাবি করেছে, কারচুপি ও অনিয়ম করে দলটির প্রার্থীকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর বিএনপি ওইসব অভিযোগ অস্বীকার করে ভালো ভোট হয়েছে বলে দাবি করেছে। একই ধরনের দাবি করেছে নির্বাচন কমিশনও। এ নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও বাকি তিনজন জামানত রক্ষা করার মতো ভোটও পাননি। তবে ভোট পড়ার হার নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এ আসনে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। ওই নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছিলেন দুই লাখ ৩৮ হাজার ৮৩৬ ভোট। আর দেলাওয়ার হোসেন তখন পান এক লাখ ৪১ হাজার ১৭ ভোট। তিনি ৯৭ হাজার ৮১৯ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। বর্তমান সরকারের ৯ মাসের মাথায় এ উপনির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীর ভোট ৪৪ হাজার ৫০৪ ভোট কমেছে। যদিও সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় এ উপনির্বাচনে ভোট কম পড়েছে।

বিএনপির প্রার্থীর ১৮২ কেন্দ্রে একচেটিয়া জয় ও জামায়াত প্রার্থীর বড় ব্যবধানে পরাজয়ের কারণ মূল্যায়ন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের ঠাকুরগাঁও জেলা সভাপতি মো. আব্দুল লতিফ যুগান্তরকে বলেন, কয়েকটি কারণে বিএনপি প্রার্থী এতসংখ্যক ভোট পেয়েছেন। তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, তারই ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ আসনে সংসদ-সদস্য ছিলেন। তিনি স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ছিলেন এবং বর্তমানে রাষ্ট্রপতি। তার প্রতিশ্রুতি ছিল ঠাকুরগাঁওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ইপিজেড ও স্পোর্টস কমপ্লেক্স স্থাপন করা। বিমান বন্দর চালু করা এবং মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। ইতোমধ্যে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে শুরু করেছে এ এলাকার ভোটাররা। যেহেতু জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় নেই, তাই ভোটাররা তাদের উন্নয়ন স্বার্থে বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট বিএনপি পেয়েছে মন্তব্য করে মো. আব্দুল লতিফ বলেন, সংখ্যালঘু এক লাখ ৩০ থেকে এক লাখ ৩৫ হাজার ভোটারদের সামনে বিএনপিকে ভোট না দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তারা ভালো থাকার আশ্বাসে ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। আর এ আসনে অন্তত ৯ বার আওয়ামী লীগ সংসদ-সদস্য হিসাবে জয় পেয়েছিল। এ দলটির যারা ভোট দিয়েছেন, তারাও বিএনপিকে বেছে নিয়েছে। এমনকি পলাতক আওয়ামী লীগ নেতারাও ফোনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন বলে জানতে পেরেছি।

আওয়ামী লীগের ভোট বিএনপির প্রার্থীকে দিয়েছে কী না-এমন প্রশ্নের জবাবে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট অরুণাংশু দত্ত টিটো যুগান্তরকে বলেন, আমার জানা মতে, দলীয় পদধারী নেতারা কেউ ভোট দিতে যাননি। তবে স্থানীয় নেতাকর্মী যারা দলের ভাসমান ভোটার হিসেবে পরিচিত, তারা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে কী না-সেটা জানি না। নির্বাচনের আগে বিএনপির সহায়তায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মীর জামিন হয়েছে-এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছি। নিম্ন আদালত থেকে জামিন পাইনি।

কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে দেখা যায়, ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ১১৩টি কেন্দ্রে বিএনপি পেয়েছে এক লাখ ৪০ হাজার ৪২১ ভোট। জামায়াত পেয়েছে ৬৩ হাজার ৩১৫ ভোট। ব্যবধান ৭৭ হাজার ১০৬। এই উপজেলার ১১০টি কেন্দ্রে বিএনপি বেশি ভোট পেয়েছে। বাকি তিনটিতে জামায়াত প্রার্থী বেশি ভোট পেয়েছেন। ওই তিনটি কেন্দ্র হচ্ছে-জামায়াতের প্রার্থী জয় পেয়েছেন বান্দিগড় শের-ই-বাংলা উচ্চ বিদ্যালয়, দানারহাট আনছারিয়া ফাজিল মাদ্রাসা ও সৈয়দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। এসব কেন্দ্রে তিনি যথাক্রমে ৪৭, ২৫৭ ও ৬৮১ ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করেছেন।

রুহিয়া উপজেলার ৩৩টি কেন্দ্রে বিএনপি পেয়েছে ৩৮ হাজার ৮৭৮ ভোট। জামায়াত পেয়েছে ১৪ হাজার ৯৫১ ভোট। দুই প্রার্থীর ব্যবধান ২৩ হাজার ৯২৭। এই উপজেলার প্রতিটি কেন্দ্রেই বিএনপির প্রার্থী বেশি ভোট পেয়েছেন। বৈধ ভোটের হিসাবে রুহিয়ায় বিএনপির অংশ প্রায় ৭১ দশমিক ৬১ শতাংশ, জামায়াতের ২৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

ভূল্লী উপজেলার ৩৯টি কেন্দ্রে বিএনপি পেয়েছে ৪৮ হাজার ৪৯০ ভোট। জামায়াত পেয়েছে ১৮ হাজার ১৮৭ ভোট। ব্যবধান ৩০ হাজার ৩০৩। এখানেও ৩৯টি কেন্দ্রের সব কটিতে বিএনপি এগিয়ে ছিল। বৈধ ভোটের হিসাবে বিএনপির অংশ প্রায় ৭১ দশমিক ১৭ শতাংশ এবং জামায়াতের ২৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ রুহিয়া ও ভূল্লী-দুই এলাকাতেই বিএনপির ভোটের অনুপাত ৭১ শতাংশের বেশি। জামায়াতের তুলনামূলক ভালো অবস্থান ছিল সদর উপজেলায়। সেখানে বৈধ ভোটের প্রায় ৩০ দশমিক ৬৮ শতাংশ পেয়েছে দলটি।

কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলে বিএনপির সবচেয়ে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে ইসলামনগর উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে। সেখানে বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন দুই হাজার ৩২৮ ভোট, জামায়াতের প্রার্থী পেয়েছেন ১৫৬ ভোট। ব্যবধান দুই হাজার ১৭২।

বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর ভোটের বড় ব্যবধান মানতে নারাজ স্থানীয় জামায়াত নেতারা। তাদের মতে, নির্বাচনে কারচুপির মাধ্যমে সরকারদলীয় প্রার্থীকে জয়ী ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আলমগীর হোসেন বলেন, ভোটের হারের সঙ্গে মাঠে ভোটার উপস্থিতি আকাশ পাতাল পার্থক্য দেখা গেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়নি। বরং কারচুপির ভোট হয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে ভোট কারচুপি, অনিয়ম, নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও বাড়িঘর ভাঙচুরের প্রতিবাদে শনিবার বিকালে দলের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালন করা হবে।

ওই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী। তিনি বলেন, অত্যন্ত সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাধারণ মানুষ উন্নয়নের জন্য বিএনপি প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। তারা মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করেননি।

ঠাকুরগাঁও সদরের একাধিক রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জামায়াত তাদের নিজস্ব সমর্থকদের ভোট ঠিকই পেয়েছে। জামায়াতের একক ভোটব্যাংক কখনোই এত বিশাল ছিল না। তবে, উপনির্বাচনে মানুষের আগ্রহ কম থাকায় গত ভোটের চেয়ে ভোট কম পেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। তারা বলেন, নির্বাচনে মূল প্রভাব ফেলেছে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট। মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগ না থাকায় নিজেদের নিরাপত্তাহীনতা এড়াতে তারা বিএনপি প্রার্থীকে বেছে নিয়েছেন। প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়া নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী সৈকত বলেন, এই আসনে মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের আধিক্য বেশি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ভোটার, যারা সচরাচর আওয়ামী লীগকে সমর্থন করেন, তারা এবার বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন। মূলত সংখ্যালঘু ভোটের সমর্থনেই বিএনপি প্রার্থী বিশাল জয় পেয়েছেন।

জামানত হারিয়েছেন তিন প্রার্থী : এ নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর বাইরে অন্য প্রার্থীদের মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. খাদেমুল ইসলাম পেয়েছেন তিন হাজার ২৮৮ ভোট, খেলাফত আন্দোলনের মো. আবদুল আলীম নিজামী ৮৩৬ এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক ৪৪৯ ভোট পেয়েছেন। তারা তিনজনই জামানত হারিয়েছেন।