জাপান সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বিমানের ফ্লাইটে ত্রুটি রেখেই ছাড়পত্র দিয়েছিলেন প্রকৌশলী। শুধু তাই নয়, ত্রুটি পুরোপুরি নিরসন না করেই এমইএলের আওতায় উড়োজাহাজটিকে ঢাকায় ফেরার উপযোগী করা হয়। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী বা তার সফলসঙ্গীদের কারও বোঝার সাধ্য ছিল না। এতে করে দেশে ফেরার পথে তাদের পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিরাপত্তা নিয়ে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটে ত্রুটির নেপথ্য কারণ ও এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে চার সদস্যের বিমান কর্তৃপক্ষের চার কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিমানের চিফকে (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিডিউলিং) সভাপতি এবং ব্যবস্থাপককে (আইনবিষয়ক) সদস্য সচিব করে শুক্রবার এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন-চিফ ইঞ্জিনিয়ার (ইঞ্জিনিয়ারিং প্রডাকশন) এবং ডেপুটি চিফ (ফ্লাইট সেফটি)। চার কার্যদিবসের মধ্যে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। কমিটিকে ত্রুটির প্রকৃত কারণ শনাক্তকরণ ও নিরসন প্রক্রিয়া, উড্ডয়ন উপযোগিতা নিশ্চিতের পদক্ষেপ, আর্থিক ক্ষতি এবং দায়িত্বে অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা নির্ধারণের বিষয়ে বলা হয়েছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানে কারিগরি ত্রুটির বিষয়ে গঠিত বিমান কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন। তারা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করতে হলে নিজের ঘরের সন্তানকে দিয়ে ঘরের লোককে ধরা যাবে না। এর জন্য দেশি-বিদেশি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হলে সেই তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠত না। তদন্তেও প্রকৃত দোষী বের হয়ে আসত।
বৃহস্পতিবার জাপানের নারিতা বিমানবন্দরে উড্ডয়নের ঠিক আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজের স্পয়লারে ত্রুটি ধরা পড়ে। অথচ এর আগেই উড়োজাহাজটিকে উড্ডয়ন উপযোগী ঘোষণা করেছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া। এই প্রকৌশলীকে নিয়ে এর আগে থেকেই নানা অভিযোগ ও বিতর্ক চলছিল। তার বিরুদ্ধে দুটি বিমান লিজ-সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলা এখনো বিচারাধীন। দুদকের একজন কর্মকর্তা বলেন, এই প্রকৌশলীর থাকার কথা জেলে। কিন্তু তিনি হয়ে উঠেছেন বিমানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভিভিআইপি ফ্লাইটে এমন অভিযোগে জড়িতদের ছাড়ের সুযোগ নেই। সেদিন প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ফ্লাইট বিলম্বের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাও ঝুঁকিতে পড়তে পারত। এর আগেও প্রধানমন্ত্রীর লন্ডনফেরত ফ্লাইটের রক্ষণাবেক্ষণেও গুরুতর অনিয়ম পেয়েছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু সেই তদন্তের সুপারিশ কেন বাস্তবায়ন হয়নি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ ও বিমানের পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ভিভিআইপি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ধরনের ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে সেটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসাবে না দেখে পুরো রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা করা উচিত। উড্ডয়নের আগে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে হবে। এই ফ্লাইটের প্রকৌশলী কে ছিলেন সেটিও দেখতে হবে। তিনি কেন কারিগরি ত্রুটি জেনেও ছাড়পত্র দিলেন কীভাবে-সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে আগের তদন্তে উঠে আসা অনিয়মের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন। দায়িত্বপ্রাপ্তদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।’
উড্ডয়ন ছাড়পত্রের পরও ত্রুটি : বিমানের অভ্যন্তরীণ দায়িত্বপত্র অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের জাপান সফরে বিজি-৩৭৬ ও বিজি-৩৭৭ ফ্লাইটের জন্য প্রকৌশলী মো. সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া ও আব্দুল মান্নানকে মনোনীত করা হয়। নারিতায় উড়োজাহাজের ট্রানজিট চেক ও কারিগরি সনদ দেওয়ার দায়িত্ব ছিল তাদের। ২৯ অক্টোবর স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে নারিতা থেকে ঢাকার উদ্দেশে উড্ডয়নের কথা ছিল বিজি-৩৭৭ ফ্লাইটটির। বোর্ডিং শেষে উড়োজাহাজটি পুশব্যাক করে রানওয়ের দিকে ট্যাক্সি করার সময় ককপিটে স্পয়লার-সংক্রান্ত রেড সিগন্যাল দেখা যায়। নিরাপত্তার স্বার্থে পাইলট ক্যাপ্টেন ইমামুল উড্ডয়নের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। পরে উড়োজাহাজটিকে পার্কিং এলাকায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর প্রধানমন্ত্রী ও সফরসঙ্গীদের উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে নেওয়া হয়।
বিমানের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, ত্রুটি নিরসনে প্রকৌশলী সাদেকুল চার ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় নেন। এমনকি স্পয়লারের ত্রুটি পুরোপুরি দূর করতে পারেননি। উড়োজাহাজটিকে কোনোমতে ফ্লাইট পরিচালনার উপযোগী করে ঢাকায় ফেরানো হয়। এ কারণে অতিরিক্ত জ্বালানিও বহন করতে হয়েছে। অন্য স্পয়লারেও সমস্যা দেখা দিলে উড়োজাহাজটির নিরাপদ পরিচালনা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল বলে দাবি সূত্রটির।
সূত্র জানায়, বোয়িং ৭৮৭-৯ উড়োজাহাজটির স্পয়লার অ্যাকচুয়েটরের ত্রুটি এমইএল রেফারেন্স ২৭-৬১-০২-০২ অনুযায়ী ক্যাটাগরি-সি-তে ডিসপ্যাচযোগ্য ছিল না। কিন্তু বিমান প্রকৌশল বিভাগের অভ্যন্তরীণ ই-মেইল চালাচালিতে ডিসপ্যাচযোগ্য মর্মে বলা হয়। পাশাপাশি নির্ধারিত অপারেশন পদ্ধতি অনুসরণ এবং ফ্লাইট পরিকল্পনায় ১ শতাংশ অতিরিক্ত জ্বালানি রাখার নির্দেশনা ছিল। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ত্রুটিটি কোন পর্যায়ে এবং কী শর্তে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছিল? এমইএলের শর্ত যথাযথভাবে পূরণ করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। বিমানের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্রের দাবি, ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনার স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) অনুযায়ী এ ধরনের ফ্লাইটে কোনো এমইএল গ্রহণযোগ্য নয়।
আগেও বিতর্কে সাদেকুল : দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী সাদেকুল ইসলাম ভূঁইয়া ২০১৪ সালে মিসরীয় উড়োজাহাজ সংস্থা ইজিপ্ট এয়ার থেকে দুটি বোয়িং উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে করা দুদকের মামলার আসামি। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন। জামিনে থাকা অবস্থায় তাকে নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেন। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভিভিআইপি ফ্লাইটে তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের যাচাই করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে, সাদেকুলের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক বিধিনিষেধ ছিল কিনা এবং তাকে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কী মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছিল-তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে বিমান কর্তৃপক্ষের গঠিত কমিটিকে প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইটের উড্ডয়ন উপযোগিতা নিশ্চিত করতে নেওয়া পদক্ষেপ পর্যালোচনা এবং এ ঘটনায় ফ্লাইট বিলম্ব, যাত্রীদের ভোগান্তি ও বিমানের প্রাতিষ্ঠানিক ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব নিরূপণ করতে বলা হয়েছে। যদিও তদন্ত কমিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং প্রডাকশন বিভাগের প্রধানকে সদস্য রাখায় তদন্তের নিরপেক্ষতা ও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্নও সামনে আসে। কারণ ওই বিভাগের প্রকৌশলীরাই ফ্লাইটটির কারিগরি দায়িত্বে ছিলেন। তদন্তে ছাড়পত্র প্রদানকারী প্রকৌশলীর ভূমিকা, এমইএল প্রয়োগের বৈধতা, প্রি-ফ্লাইট চেকলিস্ট এবং ত্রুটি নিরসনের পর উড্ডয়ন উপযোগিতা নিশ্চিতের প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক শাহনূর আহমেদ ত্রুটির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী ফ্লাইটে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় নারিতা থেকে যাত্রা বিলম্বিত হয়। এ ঘটনায় বিমান ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, কমিটির প্রতিবেদন জমা দিলে বিস্তারিত জানা যাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, তদন্তে শুধু ত্রুটির কারণ চিহ্নিত করলেই হবে না; ছাড়পত্র দেওয়া থেকে শুরু করে ত্রুটি নিরসন ও উড্ডয়নের অনুমতি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের দায় নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায় আগের মতো তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি হলেও বিমানের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।