Image description

নিজে আওয়ামী লীগ বা শ্রমিক লীগ নেতা, ভাগনে শ্রমিক দল এবং বড় ভাই চরমপন্থি সংগঠনের আঞ্চলিক নেতা। এভাবেই ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে টাকার মেশিন পুষ্পপাড়া হাটের আধিপত্য নিজের পরিবারের কবজায় রাখেন হাট ইজারাদার আব্দুস সালাম। গত ৩০ বছর ধরে সালাম ছিলেন হাটের ইজারদার। কোটি টাকা খাটাতেন দাদন ব্যবসায়।

পাবনায় পুষ্পপাড়া হাটে সালাম ও রিপনকে খুনের ঘটনা টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে। দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত কার্যক্রম নিষিদ্ধ শ্রমিক লীগ নেতা আব্দুস সালাম (৬০) এবং তার ভাগনে ও শ্রমিকদল নেতা রিপন হত্যার ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও পুলিশ খুনের রহস্য উদ্ঘাটন বা কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় দুই নেতাকে হত্যার পর মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা উল্লাস করতে করতে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান। খুনিরা হত্যার পর ‘আজ থেকে পুষ্পপাড়া হাট স্বাধীন হলো’-এমন মন্তব্যও করেন বলে এসব সূত্র জানান।

এদিকে নিহত শ্রমিক লীগ নেতা ও পুষ্পপাড়া হাটের ইজারাদার সালাম সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। এলাকাবাসী এমনকি তার স্বজনরাও জানান গত ৩০ বছর ধরে সালাম পুষ্পপাড়া হাটের ইজারাদার ছিলেন।

তিনি অন্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে অন্তত ৩ কোটি টাকা দাদন দিয়েছেন বলেও এলাকাবাসী জানান। আর এ সবই পুষ্পপাড়া হাট থেকে অর্জিত। এসব নানা কারণে হাটের আধিপত্য থেকে বঞ্চিত এবং হাটকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হতে পারে বলে স্বজন ও পুলিশের ধারণা।

ঘটনার দিন সন্ধ্যায় সদর উপজেলা ও আতাইকুলা থানায় অবস্থিত পুষ্পপাড়া হাটে নিজ কার্যালয়ে দুর্বৃত্তদের এলোপাতাড়ি গুলিতে সালাম ও রিপন হোসেন (৩৫) নিহত হন। আব্দুস সালাম কার্যক্রম নিষিদ্ধ শ্রমিক লীগের সদর উপজেলা আহ্বায়ক ও হাট ইজারাদার এবং রিপন হোসেন সালামের ভাগনে ও আতাইকুলা ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সভাপতি ছিলেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইজারাদার সালামের নিজ অফিসে তারা দুজনই বসে কাজ করছিলেন।

এ সময় ৫ থেকে ৭ জনের মুখোশ পরা একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত সালামের অফিসে এসে হামলা চালায়। তারা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই সালামকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি করে। এ সময় তার ভাগনে ও হাট ইজারা কাজের সহকারী রিপন ঠেকাতে গেলে তাকেও দুর্বৃত্তরা গুলি করে। এতে দুজনই অফিসের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন।

এরপর দুর্বৃত্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে স্থানীয়রা দুজনকে উদ্ধার করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। দুজনের লাশের ময়নাতদন্তের পর শুক্রবার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুপুরে তাদের দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ জানান, পুষ্পপাড়া হাটের আধিপত্য নিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তিনি আরও জানান, এই জোড়া খুনের সঙ্গে কারা জড়িত তা উদ্ঘাটনে পুলিশ কাজ করছে। তবে শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা কিংবা কেউ আটক হয়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পুষ্পপাড়া হাট উত্তরবঙ্গের অন্যতম বড় গরুর হাট। এই হাটে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে। এই হাটকে কেন্দ্র করে সেখানে একটি ‘ক্রাইম জোন’ তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালে একসঙ্গে ৪ জন ছাড়াও এই হাটের আধিপত্য নিয়ে গত দেড় দশকে কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়েছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, নিহত সালাম কুরআনে হাফেজ এবং তিনি বেশ কয়েকবার হজ পালন করেছেন। তিনি মূলত আওয়ামী লীগ আমলের গত ১৬ বছরে শ্রমিক লীগ বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে থাকলেও যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সে দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় থাকতেন। এর মূল কারণ পুষ্পপাড়া হাটের ইজারা বা আধিপত্য।

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে সালাম জামায়াতের ছত্রছায়ায় থাকেন। বিগত জাতীয় নির্বাচনে তিনি দাঁড়িপাল্লার প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন বলে এলাকাবাসী জানান। তার ভাগনে নিহত রিপন বিএনপির বা শ্রমিক দলের সক্রিয় নেতা ছিলেন। অর্থাৎ তারা রাজনীতির ভারসাম্য রেখে পুষ্পপাড়া হাটের আধিপত্য নিজেদের কবজায় রাখতেন।

সালামের বড় ভাই কাল্যা কালাম পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল লাল পতাকা) আঞ্চলিক নেতা। তিনি দীর্ঘদিন জেলে থেকে সম্প্রতি জামিনে বেরিয়ে আসেন।