জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় কার্যকরের দাবিতে সরকারের ওপর ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলীয় ঐক্য। এ জন্য সংসদ ও রাজপথ—দুই জায়গাতেই সক্রিয় থাকার কৌশল নিয়েছে জোটটি। ধারাবাহিক লংমার্চ, সমাবেশ ও জনসংযোগের মতো মাঠের কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের দাবির পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে চায় তারা। দাবি আদায় না হলে কর্মসূচি আরও কঠোর করার বিষয়েও জোটের ভেতরে আলোচনা রয়েছে।
জামায়াত সূত্র বলছে, বিএনপি সরকার সংস্কার ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিরোধী অবস্থান নিয়েছে বলে মনে করে জামায়াত এবং এ বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরতে চায় তারা। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুও এসব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গুরুত্ব পেতে পারে। সনদ বাস্তবায়ন না করে সরকার সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিলে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেওয়া হতে পারে।
দলটির সূত্র আরও জানিয়েছে, গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সরকারের সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগের প্রতিবাদেই রাজপথে কর্মসূচি জোরদার করছেন তারা। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারসহ ৭ দফা দাবি সামনে রেখে বর্তমানে লংমার্চ করছে ১১ দলীয় ঐক্য। এসব কর্মসূচিতে স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি পালন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জানা গেছে, আগামী ডিসেম্বরে ঢাকায় একটি মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনা ছিল জামায়াত জোটের। তবে প্রতিটি বিভাগীয় পর্যায়ে লংমার্চের কর্মসূচি নেওয়ায় মহাসমাবেশের সময়সূচিতে পরিবর্তন আসতে পারে। খুলনার পর ঢাকা থেকে সিলেট অভিমুখী লংমার্চ কর্মসূচি পালন করা হবে। তবে দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এরপর রাজশাহী, বরিশাল ও ময়মনসিংহ বিভাগে লংমার্চ করার আলোচনা চলছে। আবার ফেব্রুয়ারির শুরুতে রমজান মাস শুরু হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখছেন ১১ দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্যরা। মহাসমাবেশ রমজানের আগে হতে পারে, আবার পরেও। তবে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ঢাকার মহাসমাবেশ থেকে আরও কঠোর কর্মসূচির হয়তো ঘোষণা আসতে পারে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্যের শরিক দলগুলো লংমার্চ সফল করতে সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে সাত দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী জনমত গড়ে তোলা এবং সরকারের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে। পরবর্তী কমর্সূচির বিষয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সূত্র আরও জানায়, সরকারের যে কোনো ভুল পদক্ষেপ দেখলেই তার প্রতিবাদ সংসদ ও রাজপথে জানাবে বিরোধী দল। ইস্যুভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি হাতে নেওয়া হবে। বিরোধী দলের প্রতিবাদের কারণে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনকে তার পদ থেকে ও ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি এমপিকে পদত্যাগ করিয়েছে সরকার। পুলিশের আইজিপির ক্রসফায়ারের বক্তব্যের প্রতিবাদ করার কারণে তাকে সরিয়ে দেওয়ার আলোচনা চলছে। এসব বিরোধী দলের প্রতিবাদের অর্জন।
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই সনদ ঘিরেই বিএনপি সরকারের সঙ্গে রাজনৈতিক টানাপোড়েনের সূত্রপাত জামায়াত ১১ দলের। বিশেষ করে জামায়াতের নির্বাচিত এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির এমপিরা এই শপথ না নেওয়ায় সংকট আরও জটিল হয়। এতে সংবিধান-সম্পর্কিত ৪৮টি প্রস্তাবের পক্ষে গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়লেও সেগুলো বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে জামায়াত। এ অবস্থায় শুধু প্রতীকী প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ না থেকে সংসদে বিতর্ক, প্রয়োজনে ওয়াকআউট এবং রাজপথের আন্দোলন সবকিছু একসঙ্গে চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে দলটির।
জামায়াতের একাধিক নেতা বলছেন, ১৯৯৬ সালে প্রবল আন্দোলনের মুখে বিএনপি সরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছিল। এবারও গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করতে প্রয়োজনে বড় আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। এ জন্য প্রয়োজন হলে সংসদ অধিবেশন বর্জন ও সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতাসহ বিভিন্ন কঠোর কর্মসূচির বিষয়েও ভাবা হচ্ছে।
অবশ্য তারা এও মনে করছেন, সনদ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। তাই সরকারের কাছ থেকে শুধু আশ্বাস নয়, সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও বাস্তবায়নের দৃশ্যমান অগ্রগতি চান তারা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরির ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। জামায়াতের নেতাদের ভাষ্য, সংবিধান সংশোধন কমিটিতে থাকার প্রস্তাব দেওয়া হলেও জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্য তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের যুক্তি, প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হলে তা আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়টিও তারা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সংবিধান সংস্কারের কোনো প্রস্তাব নিয়ে একবারও আমাদের ডাকেনি সরকার। বিএনপি একদলীয় যে পথে হাঁটছে সেই পথে আমাদের হাঁটতে বলে। কিন্তু ওই পথে হাঁটা মানে হলো অপকর্মকে সাপোর্ট করা। আমরা ওখানে কেন যাব?’
১১ দলীয় ঐক্যের শরিক এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু কালবেলাকে বলেন, সরকারের ভুল পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বিরোধী দলের কর্মসূচি চলমান রয়েছে। সরকার বিরোধী দলের প্রতিবাদের জবাবদিহি করছে। আগামী দিনেও কখনো বিক্ষোভ মিছিল, কখনো সমাবেশ কর্মসূচি চলবে।
জোটের অন্য দাবিগুলো হলো—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-জ্বালানি-গ্যাস ও সারের সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-দখল বাণিজ্য বন্ধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে দলীয়করণ বন্ধ করা। এসব দাবিতে এর আগে গত ৫ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম ও ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করেছিল ১১ দলীয় ঐক্য।
পৃথক কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে জোট শরিকরা: ১১ দলীয় ঐক্যের কর্মসূচির পাশাপাশি জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস পৃথক কর্মসূচি নিয়ে রাজপথে সক্রিয় রয়েছে। একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি বিলুপ্ত করে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, ব্যর্থতার দায়ে স্বরাষ্ট্র ও জ্বালানিমন্ত্রীর পদত্যাগ এবং জুলাই গণহত্যার বিচার দাবিসহ চার দফা দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে এনসিপি। গতকাল শুক্রবার বিকেলে শাহবাগে সমাবেশ করেছে দলটি। এনসিপি সূত্র জানায়, একই দাবিতে সারাদেশে বিভাগীয় সমাবেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা আসতে পারে।
এনসিপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য এবং দলটির মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার কালবেলাকে বলেন, ধারাবাহিকভাবে আমাদের কর্মসূচি চলবে। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের ওপর চাপ তৈরি করা হবে। প্রয়োজনে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কঠোরতর কর্মসূচি দিয়ে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করা হবে।
গণভোটের রায় বাস্তবানের দাবিতে সারাদেশে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নাগরিক সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটি জানিয়েছে, এরই মধ্যে ২০ থেকে ২৫ জেলায় এই সমাবেশ শেষ হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত বাকি জেলার কর্মসূচি পালনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়েছে। সারাদেশে সমাবেশ শেষে ঢাকায় মহাসমাবেশের ডাক দেওয়া হতে পারে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সমন্বয়ক হাসান জুনাইদ কালবেলাকে বলেন, কর্মসূচিতে আমাদের মূল দাবি হলো গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। দাবির পক্ষে সারাদেশে আমরা জনমত তৈরি করছি। রমজানের আগেই কর্মসূচি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে জেলা পর্যায়ের কর্মসূচি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা থেকে খুলনা অভিমুখী লংমার্চ আজ: চট্টগ্রাম ও রংপুরের পর আজ শনিবার খুলনা বিভাগ অভিমুখে প্রায় ৪১০ কিলোমিটার লংমার্চ করবে ১১ দলীয় ঐক্য। রাজধানীর বায়তুল মোকাররম থেকে সকাল ৭টায় উদ্বোধনী সমাবেশের পর লংমার্চ বহরের গাড়িগুলো পদ্মা ব্রিজ হয়ে খুলনা অভিমুখে রওনা দেবে। লংমার্চের বহরে এক হাজারের বেশি গাড়ি যুক্ত হতে পারে। রাতে কুষ্টিয়ার আবরার ফাহাদ স্টেডিয়ামে সমাপনী সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হবে কর্মসূচি। সেই সমাবেশে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটবে বলে প্রত্যাশা করছেন জামায়াত নেতারা। তাদের ভাষ্যমতে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রচারপত্র বিতরণ, মাইকিং ও গণসংযোগ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও রংপুরের লংমার্চের তুলনায় এবার বেশি সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।
ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে মাদারীপুর-শরীয়তপুরের মাঝামাঝি নাওডোবা দিয়ে খুলনা বিভাগের দিকে যাবে গাড়িবহর। পথে নাওডোবা, বাগেরহাটের কাটাখালী, খুলনার বাবরী চত্বর ও স্বাধীনতা চত্বর, যশোরের মুড়লি মোড় এবং ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পথসভা করবে জামায়াত জোট। তবে লংমার্চের পথ গোপালগঞ্জের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় সংঘাতের আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। কারণ এর আগে এনসিপি নেতারা গোপালগঞ্জে গিয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়েছিলেন।
তবে গোপালগঞ্জের নিরাপত্তার বিষয়টিকে আশঙ্কা হিসেবে দেখছেন না জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, গোপালগঞ্জ বাংলাদেশেরই একটি অংশ। সেখানে বিরোধী দলের লংমার্চ ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।