Image description

দেশে জমে উঠেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার পৈতৃক বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার আমজাদহাট ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে দলীয় সমর্থনপ্রত্যাশী ১৯ জন। শুধু আমজাদহাট নয়, প্রতিটি ইউনিয়নেই ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী কোথাও ১৮, কোথাও ১৭ জন। আবার কোনো কোনো ইউনিয়নে সাত-আটজন পর্যন্ত মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। স্থানীয় পর্যায়ে গণসংযোগের পাশাপাশি দলীয় মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতাদের সমর্থন পেতে যোগাযোগ করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। তাঁদের কেউ কেউ ঢাকায় এসে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছেন।

জানতে চাইলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায়ে দলের নেতা-কর্মীদের সমর্থন ও মতামতের ভিত্তিতে বাছাই করে যোগ্য প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়া হবে। এবার কোনো প্রতীক না থাকায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে বিশৃঙ্খলা ছাড়া।’

বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল বিএনপিতে প্রার্থীর ছড়াছড়ি। দলীয় সমর্থন পেতে নেতা-কর্মীদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। আগ্রহীরা নিজের এলাকায় প্রচারণার পাশাপাশি দলীয় সমর্থন নিশ্চিত করতে মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। কেউ ঢাকায় এসে মন্ত্রী-এমপিদের বাসায় যাচ্ছেন, কেউ আবার এলাকায় দলীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন। শুধু মন্ত্রী এমপি বা দলীয় নেতাই নন, এর বাইরেও মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে এমন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দিয়েও তাঁরা তদবির করাচ্ছেন। প্রার্থীরা স্থানীয় পর্যায়ে গণসংযোগ, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছেন। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেতাদের পাশাপাশি নতুন মুখও নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী। কেউ বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের ভূমিকা তুলে ধরছেন। কেউ সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড ও স্থানীয় পর্যায়ে জনসম্পৃক্ততার কথা সামনে আনছেন। আবার কেউ এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজ ও সাধারণ মানুষের পাশে থাকার অভিজ্ঞতাকে প্রার্থিতার পক্ষে যুক্তি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দল ত্যাগী, পরীক্ষিত ও যোগ্য নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করবে। যাঁরা অতীতে আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, তাঁদের প্রাধান্য দেওয়া হবে।

কোনো কোনো এলাকায় ১৯ জন পর্যন্ত মনোনয়নপ্রত্যাশী : জানা যায়, নারায়ণগঞ্জে প্রত্যেকটি ইউনিয়নেই ছয় থেকে সাতজন বিএনপির সমর্থনপ্রত্যাশী দৌড়ঝাঁপ চালাচ্ছেন। রূপগঞ্জের মুড়াপাড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও চেয়ারম্যান প্রার্থী মো. মজিদ ভূইয়া বলেন, দল ক্ষমতায়, তাই প্রার্থীর ছড়াছড়ি। আড়াইহাজারে ব্রাহ্মন্দী ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও চেয়ারম্যান প্রার্থী ডা. মনির বলেন, আড়াইহাজার উপজেলায় ১০টি ইউনিয়ন রয়েছে। এর মধ্যে এমনও ইউনিয়ন আছে, যেখানে ১৬ থেকে ১৭ জন বিএনপির সমর্থনপ্রত্যাশী প্রার্থী রয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, ‘নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত হওয়ার পর দলীয় সমর্থন জানিয়ে দেব। যাঁরা দলীয় সমর্থনের বাইরে গিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন, তাঁদের ব্যাপারে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ গাজীপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় ৩৯টি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিতে একাধিক প্রার্থী প্রচারণা চালাচ্ছেন।

ফেনী সদর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ৮৫ জন। ফুলগাজীর ছয় ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী ৭১ জন। সাধারণ ও সংরক্ষিত নারী সদস্য পদে দলীয় সমর্থন পেতে ২৮৫ জন জীবনবৃত্তান্ত জমা দিয়েছেন। কক্সবাজারে ৭১টি ইউনিয়নে বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী প্রভাববলয় তৈরির পাশাপাশি দলের ঊর্ধ্বতন মহলের সুনজরে আসার জন্য নানা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক শামীম আরা স্বপ্না দুজনই এমপি হওয়ায় তাঁদের সুনজরে থাকার চেষ্টা করছে সম্ভাব্য প্রার্থীরা। কক্সবাজারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নির্দেশনা বা ঘোষণাই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে।

বরিশালের ৮৮ ইউনিয়ন পরিষদে প্রত্যেকটিতে চার থেকে পাঁচজন প্রার্থী প্রচারণায় রয়েছেন। সমর্থন পেতে ছুটছেন প্রভাবশালী নেতা, এমপি ও মন্ত্রীর পেছনে। কেউ কেউ নিজেকে সংশ্লিষ্ট আসনের এমপি ও মন্ত্রীর সবুজসংকেত পেয়েছেন দাবি করে প্রচার-প্রচারণায় নেমেছেন। হিজলার প্রার্থী আসাদুজ্জামান সজল বলেন, জনপ্রিয়দের প্রার্থী করা উচিত। সংশ্লিষ্ট এমপির সঙ্গে জেলা নেতাদের সমন্বয় করে সমর্থন দেওয়া হলে বিতর্ক এড়ানো যাবে। বরিশাল দক্ষিণ জেলা বিএনপির সদস্যসচিব আবুল কালাম শাহীন বলেন, কেন্দ্র ঘোষিত নির্দেশনার আলোকে ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলার নেতাদের সমন্বয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।

খুলনার নয়টি উপজেলার ৬৮ ইউনিয়ন পরিষদে প্রতিটিতে বিএনপির একাধিক প্রার্থী প্রচারণায় রয়েছেন। খুলনা জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, দলীয় সমর্থন লাভে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শীর্ষ নেতা ও এমপি-মন্ত্রীদের বাসভবনে ভিড় করছেন।

রংপুর জেলায় ৭৮ ইউনিয়ন পরিষদে বিএনপির দুই শতাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলছেন।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ৫৬ জন। শুধু কূপতলা ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদেই মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ১১ জন। ইউনিয়নভিত্তিক হিসাবে লক্ষ্মীপুরে সাতজন, বল্লমঝাড়ে ছয়জন, মালিবাড়ী, খোলাহাটি ও গিদারীতে পাঁচজন করে এবং ঘাঘোয়ায় চারজন প্রার্থী রয়েছেন। কামারজানি ও মোল্লারচরে তিনজন করে, সাহাপাড়া, বাদিয়াখালী ও বোয়ালীতে দুজন করে এবং রামচন্দ্রপুরে একজন মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন।

রাজশাহীর প্রতিটি ইউনিয়নে গড়ে সাতজন করে প্রার্থী সরব। দলের সমর্থন না পেলে স্বতন্ত্রভাবে লড়তে চান কেউ কেউ। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাইদ চাঁদ বলেন, সমঝোতা করে শেষ পর্যন্ত একজনকে সমর্থন দেওয়া হবে। বগুড়ার ১৩টি উপজেলার ইউনিয়নে বিএনপির একাধিক প্রার্থী স্থানীয় সংসদ সদস্যদের কাছে নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন। তাঁদের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় হাই কমান্ডের সবুজসংকেত পাওয়ার চেষ্টা করছেন।

জয়পুরহাটের ৩২টি ইউনিয়নে যোগ্য ও সর্বগ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করতে প্রতি উপজেলায় একটি করে জরিপ কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলজার হোসেন বলেন, ‘তৃণমূলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে আমরা একক প্রার্থী চূড়ান্ত করব।’ কুমিল্লায় ১৯৩টি ইউনিয়নের অধিকাংশগুলোতে বিএনপি তাদের প্রার্থীদের সবুজসংকেত দিয়েছে। একাধিক প্রার্থীও রয়েছেন। দেবিদ্বার উপজেলার ১৫ নম্বর বড়কামতা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘দলের কঠিন সময়ে নেতা-কর্মীদের পাশে ছিলাম। আশা করি দল আমাকে সমর্থন দেবে।’ কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার জাহান দোলন বলেন, দলীয় হাইকমান্ড মনোনয়ন দেবেন। অবশ্যই স্থানীয় এমপিদের মতামত গুরুত্ব পাবে।

সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমেদ চৌধুরী বলেন, দলীয় সমর্থন পাওয়ার জন্য অনেকেই এমপি-মন্ত্রীদের কাছে যাচ্ছেন। তাঁদের মাঠে কাজ করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

তথ্য সহযোগিতায় : বাংলাদেশ প্রতিদিনের সংশ্লিষ্ট জেলা প্রতিনিধি, নিজস্ব প্রতিবেদক ও ব্যুরো অফিস