Image description

মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেমে বিতর্কে জড়িয়ে নানা নাটকীয়তার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন ইশরাক হোসেন। রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন ডেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক দাবি করেন-তার কারণে বিএনপি বা সরকার যাতে ‘বিব্রত না হয়’ এবং প্রধানমন্ত্রীর কাজ ‘আড়ালে পড়ে না যায়’, সেজন্যই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এদিন সকালেই তিনি পদত্যাগপত্র প্রস্তুত করে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পৌঁছে দেন। রোববার রাতে একটি খবর ছড়িয়ে পড়ে-ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর। এ নিয়ে ইশরাক রাতেই অডিওবার্তা ও বিবৃতি দিয়ে পদত্যাগের নির্দেশের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি এটিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিলেও রাত পোহাতেই পদত্যাগের বিষয়টি নিজেই সামনে আনেন। দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বিস্তারিত জানাবেন বলে ফেসবুকে পোস্টও দেন। ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের ঠিক ৮ মাসের মাথায় বিতর্কে জড়িয়ে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হলো ইশরাককে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে মিরপুরে রাড্ডা সেন্টারে হামলার ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ-সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি সংসদ-সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এছাড়া দুই মাস আগে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিত্ব হারান জহির উদ্দিন স্বপন। তাকে মন্ত্রিত্ব থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়। ইশরাক মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করলেও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ-সদস্য পদ ধরে রাখছেন। মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দেন তিনি।

এদিকে নির্ধারিত সময়ের আগেই নেতাকর্মীদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত হন ইশরাক হোসেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণে পৌঁছালে তাকে ঘিরে ধরেন তার অনুসারী ও গণমাধ্যমকর্মীরা। একপর্যায়ে গাড়ির ছাদ খুলে হ্যান্ডমাইকে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন তিনি। সেখানে নিজের পদত্যাগের ঘোষণা পুনর্ব্যক্ত করেন। এ সময় তার অনুসারীরা ‘রাজপথের ইশরাক ভাই, আমরা তোমায় ভুলি নাই’, ‘ইশরাক ভাই ভয় নাই, রাজপথ ছাড়ি নাই’, ‘মাদকের আস্তানা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’ প্রভৃতি স্লোগান দিতে থাকেন। বেলা ২টা ৫৬ মিনিটে প্রেস ক্লাব প্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে যান ইশরাক। এর আগে দুপুরে নিজ বাসা থেকে প্রেস ক্লাবে যাওয়ার পথে তিনি নিজের গাড়ি থেকে সরকারি লোগো ও স্টিকার সরিয়ে ফেলেন।

শনিবার রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে নামেন ইশরাক হোসেন। তার সঙ্গে থাকা লোকজনের হাতেও অস্ত্র ছিল। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এ নিয়ে বিএনপি এবং সরকারের ভেতরেও অসন্তোষ ও অস্বস্তি তৈরি হয়। এরই জেরে রোববার বিকালে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে ইশরাক হোসেনকে ডেকে পাঠান প্রধানমন্ত্রী। সেখানেই তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা যায়। যদিও তিনি সেটিকে ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ দাবি করে প্রতিবাদ করেছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়ে প্রকাশিত খবরের সময় ও প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলেও দাবি করেন ইশরাক। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি (পদত্যাগ) নিয়ে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসার কথা ছিল। কিন্তু কোনো সহকর্মী নির্ধারিত সময়ের আগেই বিষয়টি প্রকাশ করে দেওয়ায় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে গুজব বা অসত্য হিসাবে বিবেচনা করতে হবে। সোমবার সকালে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত আসে তার কাছে। তিনি বলেন, ‘গতকাল হইছে, না আজকে হইছে, তাতে কি আসে যায়? হইছে?’

সংবাদ সম্মেলনে পদত্যাগ প্রসঙ্গে ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আমি আজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি চেয়েছি। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি, পুরো সময়টাতে ঢাকা-৬ আসন, পার্শ্ববর্তী এলাকা, পরবর্তীতে আরও যদি এলাকা থাকে, সেখানকার মাদক নির্মূলসহ জাতীয় জীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চাই। তিনি সম্মত হয়েছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, ঠিক আছে যাও, এলাকায় গিয়ে কাজ কর।’

মাদকবিরোধী অভিযানে নিজের অস্ত্র প্রদর্শনের বিষয়ে ইশরাক হোসেন বলেন, আমি বিশ্বাস করি, কোনো ভুল করিনি। নিজের নিরাপত্তার জন্য কিছু সময় অস্ত্র হাতে নিই। জমি দখল করতে কিংবা চাঁদা তুলতে যাইনি। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেই ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে তুলে ধরা হয়; এতে মাদক নির্মূলের মূল ঘটনা ধামাচাপা পড়ে। গণমাধ্যমের ভূমিকায় হতাশা প্রকাশ করে ইশরাক হোসেনের প্রশ্ন-কেন তাকে এভাবে টার্গেট করা হলো? তবে তার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে থাকলে, কাউকে আঘাত দিলে দুঃখ এর জন্য প্রকাশ করেন তিনি।

শনিবারের ওই ঘটনার সূত্র ধরে ইশরাক হোসেন বলেন, রাতে তিনি দেখতে পান একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। গণমাধ্যমে বিভিন্ন শিরোনামে প্রতিবেদন হয়েছে। ঘটনার দিন (শনিবার) প্রধানমন্ত্রী ১৩টি জায়গা পরিদর্শন করেছিলেন, যেটি প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু আমার ঘটনা গণমাধ্যমে যেভাবে এসেছে, তাতে প্রধানমন্ত্রীর ঘটনাগুলো ঢাকা পড়ে গেছে। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তার কাছে এলাকায় মাদকের ভয়াবহতার বিষয়টি তুলে ধরেছি। তখন প্রধানমন্ত্রীকে বলেছি পদত্যাগ করতে চাই। আমার কারণে যাতে প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড স্লান না হয়, সে কারণেই এ কথা বলেছি।

‘মাদকবিরোধী অভিযান’ প্রসঙ্গে ইশরাক বলেন, ঢাকা-৬ আসনের গ্লোরিয়া এলাকার ঘুণ্টিঘর ও মুন্সিরটেক এলাকায় দীর্ঘদিন মাদক কেনাবেচা চলছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার আমার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ করেছেন। মাদক বিক্রির পাশাপাশি এলাকাটি বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। তার দাবি, সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি স্থানীয় থানা-পুলিশের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। ঢাকা-৬ আসনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ও বিএনপির নেতারাও উপস্থিত থাকতেন। তার নির্বাচনি এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যানজটসহ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের লালবাগ ওয়ারী বিভাগের ডিসিসহ ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তাদের নজরে আনি। তাদের সঙ্গে বৈঠক করি। ঘুণ্টিঘর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা-সরকারিপত্র পাঠানো এবং ফাঁড়ির জন্য জায়গা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৮ সেপ্টেম্বরের একটি বৈঠকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এলাকাটিতে ‘সামাজিক প্রতিরোধ’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ১৭ অক্টোবর অভিযান চালানো হয়। অভিযানে যাওয়ার আগে পুলিশকে জানানো হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। অভিযানের বিস্তারিত তথ্য আগেভাগে জানালে তা ফাঁস হয়ে যেতে পারে-এমন আশঙ্কায় শেষ মুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের খবর দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

অভিযানের বর্ণনা দিয়ে ইশরাক বলেন, ঘুণ্টিঘর এলাকায় প্রবেশের পর একদল লোককে ছোটাছুটি করতে দেখেন তারা। এ সময় ‘নিজের নিরাপত্তার জন্য’ লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নেন। তার দাবি, পরে প্রায় ৪৫ মিনিট এলাকায় হেঁটে বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রি ও সেবনের চিত্র দেখতে পান। কাউকে নিজের হাতে শাস্তি দেওয়া তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং অভিযানে যাদের পাওয়া গেছে, তাদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে আইন অনুযায়ী বিচারের মুখোমুখি করাই ছিল লক্ষ্য। কয়েকটি ভবনে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনভর্তি একটি স্কুলব্যাগ, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এসব সামগ্রী কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিরা ‘সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি’ বলে দাবি করেন ইশরাক। অভিযানের পর ৬ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে যায় বলেও তিনি জানান। ইশরাক দাবি করেন, অস্ত্রটি তিনি কাউকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেওয়ার জন্য ব্যবহার করেননি। নিজের নিরাপত্তার জন্য অস্ত্রটি ‘অল্প সময়ের জন্য’ হাতে রেখেছিলেন।

এক প্রশ্নের জবাবে ইশরাক বলেন, তার নামে দুটি আগ্নেয়াস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে-একটি পিস্তল ও একটি রাইফেল। অভিযানের সময় দ্বিতীয় অস্ত্রটি লাইসেন্সধারী এক সহকর্মীর কাছে রাখা হয়েছিল।

রাজনৈতিক দল থেকে কোনো ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন কি না-এমন প্রশ্নের উত্তরে ইশরাক হোসেন বলেন, রাজনৈতিক দল থেকে ষড়যন্ত্রের শিকার হইনি। তবে আমি আজকে প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতার মুখ থেকে একটা উক্তি শুনে ব্যথিত হয়েছি। উনি বলেছেন, ‘আমি সন্ত্রাস করছি অস্ত্র উঁচিয়ে’। ইশরাক বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বাভাবিক কার্যক্রমে পুরোপুরি ফিরতে পারেনি। তার দাবি, পুলিশ সদস্যের সংকট, যানবাহনের অভাব এবং মাদক কারবারিদের হামলার আশঙ্কায় ওই এলাকায় কার্যকর অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। ওইদিনের অভিযানে তার কোনো ব্যক্তিগত, দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল না। মাদক সরবরাহকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনাই ছিল তার লক্ষ্য। শুধু খুচরা বিক্রেতাদের আটক করে মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও মনে করেন তিনি।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মেয়র নির্বাচনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগে আমার মেয়রপ্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা হয়েছে। আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে অংশ নিতে শতভাগ প্রস্তুত আছি। তবে যদি দলের অন্য কাউকেও প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে তাকে বিজয়ী করতে শতভাগ প্রস্তুত আছি।