Image description

ইয়েমেনের হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই বাড়ছে। এ অবস্থায় ইয়েমেনের অভ্যন্তরে নতুন এলাকা দখল ও পুনর্দখল নিয়েও চলছে ব্যাপক লড়াই। সোমবার দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজে ব্যাপক হামলা চালায় সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনী। শহরটির কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে চলেছে হুথি বিদ্রোহীরা। শিগ্গিরই পুরো শহর সরকারি বাহিনীর হাতছাড়া হতে পারে।

আল জাজিরা জানায়, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী সোমবার তাইজ বিমানবন্দরের আশপাশের অঞ্চলে অন্তত চারটি বিমান হামলা চালায়। শহরটি হুথিদের হাতে চলে গেলে তা হবে সরকারি বাহিনীর জন্য বড় ধাক্কা। এছাড়া ইয়েমেনের অন্য অঞ্চলগুলোতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নড়েচড়ে বসেছে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলো। এরই মধ্যে তেহরানের হামলার আশঙ্কায় নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে উদ্যোগী হয়েছে কাতার। দেশটি শিগ্গিরই একটি প্রতিরক্ষা উৎপাদনকেন্দ্র গড়ার ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। এতে আঞ্চলিক অংশীদারদের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সেরও সহযোগিতা নেওয়া হবে। সোমবার দোহায় গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে এ তথ্য জানান কাতারের প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আবদুর রহমান আল থানি।

সূত্র জানায়, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সাইবার হামলা মোকাবিলায় নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। সেই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ইরানের হামলায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ রাস লাফান গ্যাস স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দেশটির জ্বালানি খাত চাপে পড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। এ পথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি আরোপের বিরোধিতা করেছে কাতার।

এদিকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে ইরান সহায়তা করছে বলে নতুন অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হুথিদের প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, ড্রোনের যন্ত্রাংশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। তবে ইরান ও হুথিরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, উন্নত অস্ত্র ব্যবহারে হুথিদের সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে ইরানের ভূমিকা থাকতে পারে। অস্ত্র ও সামরিক বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা বাড়ানোর প্রযুক্তিও পাচারের মাধ্যমে পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে। এতে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ইয়েমেনের ৫০ সেনা নিহত

ইয়েমেনে দক্ষিণাঞ্চলীয় শাবওয়া প্রদেশে সরকারি বাহিনীর একটি সামরিক শিবিরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। এতে ৫০ জনের বেশি সেনা নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ১০০ জন। সোমবার প্রশিক্ষণ চলার সময় এ হামলার ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে চলমান লড়াইয়ের মধ্যে এ হামলা ঘটল।

সামরিক ও চিকিৎসা সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য নিউ আরব জানিয়েছে, শাবওয়া প্রদেশের আতাক শহরের কাছে আল-আলাম সামরিক শিবিরে হামলাটি হয়। ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র মাজেদ আল-নুজাইলি জানান, হুথিরা শিবির লক্ষ্য করে তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।

ইরান-রাশিয়া একসঙ্গে কাজ করছে : আরাঘচি

আঞ্চলিক বিভিন্ন সংকট ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে নিয়মিত আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তিনি বলেন, পারস্য উপসাগর, পশ্চিম এশিয়া, ইউক্রেন যুদ্ধ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনা নিয়ে দুদেশের মধ্যে মতবিনিময় হয়েছে।

রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আরাঘচি বলেন, আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতে ইরান ও রাশিয়ার সহযোগিতা সবসময়ই অব্যাহত রয়েছে। এছাড়াও আরাঘচি ইসরাইলের ‘বিপজ্জনক সম্প্রসারণ’ থামানোর আহ্বান জানান। এছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি ইউরোপও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে ভুল করছে বলে মন্তব্য করেন আরাঘচি। তার মতে, ইউরোপের নীতিগত ভুলের প্রভাব এখন দেশগুলোকে ভোগ করতে হচ্ছে।

এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি বলেন, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন যুদ্ধে জড়াতে চাইছেন। তার দাবি, নিজের আইনি সংকট থেকে মনোযোগ সরাতেই নেতানিয়াহু এমন পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সামাজিক মাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে আরাঘচি বলেন, নতুন সংঘাতের পরিণতি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র-উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক হতে পারে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, আগের সংঘাতের পরও ইরানের সক্ষমতা শেষ হয়নি।

সৌদি-ইরানে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কা

২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি হয়েছিল। তবে ইয়েমেনসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে দুদেশের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তির মাধ্যমে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা হলেও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ে সৌদির উদ্বেগ দূর হয়নি। ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিতে ২০১৫ সালের মার্চে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। কিন্তু হুথিদের কাছ থেকে রাজধানী সানা পুনর্দখল করা সম্ভব হয়নি।

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এখনো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি : কাতার

কাতার সতর্ক করেছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এখনো তার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়নি। এ পরিস্থিতি জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর আরও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সোমবার দোহায় আয়োজিত ‘গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরাম’-এ বক্তৃতাকালে কাতারের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং প্রতিরক্ষাবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ সৌদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি কাতার ও বৃহত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলের সামনে থাকা বিভিন্ন ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা।