ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির গৌরবোজ্জ্বল নগরী হিসাবে যে শহরকে মানুষ এতকাল চিনে আসছে, সেখানে বর্তমানে শুধুই ঘটছে খুনাখুনি। শিক্ষা ও সভ্যতার নিদর্শন বিজড়িত ইতিহাসের সেই সমতট তথা আজকের কুমিল্লা খুনের জনপদে পরিণত হয়েছে। এ জেলায় গত ১০ মাসে ১১০টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ছিনতাইকারীদের হাতে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী, কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অপ্রতিম, সিএনজি চালকের হাতে কিশোরী হত্যা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। সর্বশেষ শুক্রবার যুবদল নেতা মো. আবু কাউছার হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
আতঙ্কিত বাসিন্দাদের প্রশ্ন-বুলেট, অপ্রতিম, কাউছারের পর এবার কার পালা? একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে শান্ত নগরী হিসাবে পরিচিত কুমিল্লা রীতিমতো আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে। ঘটনাগুলোর পরপরই পুলিশ অভিযুক্তদের গ্রেফতার ও রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারলেও খুনখারাবি কমছে না। আইনশৃঙ্খা বাহিনী বলছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে বিশ্লেষজ্ঞরা বলছেন, এখন আর সনাতন পদ্ধতিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি মাস পর্যন্ত কুমিল্লা জেলায় ১১০টি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, এ জেলায় জানুয়ারিতে ১৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ১২টি, মার্চে ১১টি, এপ্রিলে ১০টি, মে মাসে ১৭টি, জুনে ১০টি, জুলাইয়ে ১০টি, আগস্টে ১১টি ও সেপ্টেম্বরে ৯টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া চলতি মাসে অন্তত ছয়টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। সব মিলিয়ে এ সংখ্যা ১১০।
চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ী আইরিশ হিল হোটেলের পাশ থেকে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর (৩৫) রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গভীর রাতে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়ায় নির্ধারিত স্টপেজে নামতে না পেরে ঝাগুরঝুলি বিশ্বরোডে নামেন তিনি। সেখানে ছিনতাইকারীচক্রের কবলে পড়ে অটোরিকশায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হন এবং চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।
এরপর আলোচনায় আসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যাকাণ্ড। ১৭ সেপ্টেম্বর নিখোঁজ হয় সে। পরদিন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। আইফোন ছিনিয়ে নিতেই কিশোর গ্যাং চক্রের সদস্যরা তাকে হত্যা করে।
এরপর লালমাইয়ে কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়। ৭ অক্টোবর সে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা শহরে নেমে বাসায় যাওয়ার উদ্দেশে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে। ৮ অক্টোবর লালমাইয়ের একটি ধানখেত থেকে তার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সেই অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছে, সে ওই কিশোরীকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেছে।
সর্বশেষ শুক্রবার কুমিল্লা শহরতলীর ছত্রখিল এলাকায় যুবদল নেতা আবু কাউছারকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এসব ঘটনায় স্থানীয়দের মাঝে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাঞ্চল্যকর এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে উদ্ঘাটন এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতার করতে সক্ষম হলেও জনমনে আশঙ্কা বেড়েই চলছে।
জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুমিল্লায় অপরাধ চিত্র ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী। পুলিশের হিসাবেই ৯ মাসে ১০৪টি খুনের ঘটনা নথি হয়েছে, যা বর্তমানে ১১০ ছাড়িয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গত কয়েকদিনে আড়াই হাজার কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেফতার করেছে।
বিশ্লেষকরা এই অপরাধ প্রবণতার পেছনে মূল কারণ হিসাবে কুমিল্লার ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্ত লাগোয়া পরিবেশ ও সামাজিক অবক্ষয়কে চিহ্নিত করেছেন।
কুমিল্লা নাগরিক অধিকার ফোরামের সাধারণ সম্পাদক শাহজাদা এমরান বলেন, কুমিল্লা একটি সীমান্তঘেঁষা জেলা হওয়ায় এখানে মাদকের আগ্রাসন সবচেয়ে বেশি। মাদক নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অপরাধ কমানো সম্ভব নয়। এজন্য জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ, বিজিবি ও প্রশাসনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রেজাউল করিমের মতে, সনাতন পদ্ধতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এখন কঠিন। অনেক সময় অপরাধী গ্রেফতার হলেও আতঙ্কের কারণে আদালতে সাক্ষী পাওয়া যায় না। এতে অপরাধীরা খালাস পেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে অপরাধে জড়ায়।
কুমিল্লা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি মোহাম্মদ শামছুল আলম শাহ বলেন, সবকটি চাঞ্চল্যকর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, জনমনের আশঙ্কা দূর করতে আমরা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টহল টিম বাড়ানো হয়েছে এবং নিয়মিত চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে মাদক ও কিশোর গ্যাং সংশ্লিষ্টতায় ২ হাজারেরও বেশি অভিযুক্তকে আটক করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এতে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করছি।