Image description

অস্ত্র হাতে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ নেমে বিতর্কের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিষয়টি পরিণত হয়েছে টক অব দ্যা কান্ট্রিতে। ঘটনার পক্ষে-বিপক্ষে নানা মতামত পাওয়া যাচ্ছে বিভন্ন মহলের। আসছে মিশ্র প্রতিক্রিয়াও। সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বলছে, পদত্যাগ নয় তাকে বরং মন্ত্রিসভা থেকে বহিষ্কার করা উচিৎ ছিল। আর একজন প্রতিমন্ত্রী হয়েও কেন ইশরাক হোসেনকে অস্ত্র হাতে মাদকের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে হলো, সরকারের কাছে তার জবাব চেয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।

ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ নিয়ে সরব হয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। সোমবার (১৯ অক্টোবর) সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ইশরাক হোসেন কেনো পদত্যাগ করলেন, সরকারকে ব্যাখ্যা দিতে হবে। ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের মাধ্যমে দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মাদক ব্যসায়ীদের ধরতে হবে। জড়িতরা বিএনপির সঙ্গেই যুক্ত।

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ বলেন, ইশরাক হোসেন ফৌজদারি অপরাধ করলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এখন পর্যন্ত নিজের এলাকা থেকেই মাদক প্রতিরোধ করতে পারেননি। অথচ এর জন্য বলি হতে হয়েছে ইশরাক হোসেনকে। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে যথাযথ জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। দেশবাসী তাকিয়ে আছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কবে পদত্যাগ করবেন।

বিএনপি সরকারের কড়া সমালোচনা করে এনসিপি প্রধান বলেন, দেশ কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অনুরোধ বা নির্দেশনায় চলতে পারে না; এটি গণতন্ত্র বা আইনের শাসনের কোনো উদাহরণ হতে পারে না। রাষ্ট্রে প্রত্যেকে যার যার নিজ দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার কাজ বাদ দিয়ে সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত আছেন। আবার যার দায়িত্ব মাদক অভিযানে যাওয়া নয়, তিনি অস্ত্র নিয়ে মাদক অভিযানে যাচ্ছেন এবং পরবর্তীতে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মনে করেন, অপরাধ হিসেবে পদত্যাগ নয় ইশরাক হোসেনকে বহিস্কার করা উচিৎ ছিলো। পদত্যাগের ব্যাপারটিকে ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র মতো কাজ হয়েছে বলেও অভিমত তার।

সোমবার রাতে এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, যে কাজটা ইশরাক হোসেন করেছে সেটা আইনের দৃষ্টিতে অবশ্যই অপরাধ। উনি যেভাবে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন, এতে স্বপদে বহাল থাকার যোগ্যতা তিনি হারিয়েছেন। সমস্ত দুনিয়ার মানুষ দেখলো একজন মন্ত্রী পিস্তল উচিয়ে পাড়ার মাস্তানের মতো কাজ করছেন, যেটা মোটেও শোভনীয় হয়নি। কোনো ভদ্রলোক এই কাজ করতে পারে না বলেও মন্তব্য তার।

এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, বিশাল সাইজের একটা মন্ত্রীসভা বসানো হয়েছে, যাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

জণগনের ট্যাক্সের ঘাম ঝরানো টাকায় মন্ত্রীপরিষদের ব্যায়ভার বহন করা হচ্ছে, ফলে জাতির প্রতি তাদের দায়বোধ থাকা উচিৎ।

এদিকে পদত্যাগের ‘নাটকীয়তা’র মধ্য দিয়ে আইনগত-ফৌজদারী অপরাধকে আড়াল করা হচ্ছে কী না, সে বিষয়ে প্রশ্ন রেখেছেন জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি।

এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, পদত্যাগের ঘটনা একটা আইওয়াশ। এটি সরকারের অপরিপক্কতারও একটি দৃষ্টান্ত। এতো কম সময়ে তিনজন মন্ত্রী পরিবর্তন ও একজন এমপিকে পদত্যাগ করাতে হয়েছে। এতোটা অস্থিরতা নিয়ে যেই সরকার পরিচালিত, তারা দেশের অস্থিরতা দূর করবে কিভাবে? এর মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় স্থিরতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশ ও সরকার পরিচালনা পরের কথা, বিএনপি নিজ দলও পরিচালনা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

জুলাই সনদ ও গণভোটসহ জাতীয় মৌলিক ইস্যুগুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ আনেন ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য বা জাতীয় সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বিএনপির ইশতেহারে ছিল, তারা সেটা অগ্রাহ্য করছে। বিরোধী দলকে অন্ধকারে রেখে তারা একপাক্ষিক দেশ পরিচালনা করছে। এমপিদের বরাদ্দে চরম বৈষম্য করা হচ্ছে বলেও মনে করেন তিনি।

একজন প্রতিমন্ত্রী হয়েও কেন ইশরাক হোসেনকে অস্ত্র হাতে মাদকের বিরুদ্ধে রাস্তায় নামতে হলো, তা নিয়ে সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। সোমবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ প্রশ্ন তোলেন।

মাদক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উল্লেখ করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যর্থ হলে সেই দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ওপরও বর্তায়। শুধু ইশরাক হোসেনকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; বরং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ ইস্যুতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, একটি বিতর্কের প্রেক্ষিতে ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করেছেন। আমাদের দেশে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের নজির তেমন নাই। যদি তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগের করে থাকেন তাহলে তিনি নজির সৃষ্টি করেছেন।

এশিয়া পোস্টের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, অস্ত্র নিয়ে অভিযানে যাওয়া আবেগপ্রবণ কাজ। এটি করা ঠিক হয়নি। আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা তার নিরাপত্তার জন্য থাকা দরকার ছিলো।

দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনির নিস্ক্রিয়তার বড় সমস্যা ইশরাক হোসেন সামনে তুলে ধরেছেন বলে মন্তব্য করেছেন এনিসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, এই ঘটনায় যদি ফৌজদারি অপরাধ হয়ে থাকে তাহলে ফৌজদারি অপরাধের শাস্তি কোথায়? তিনি তো এলাকার সংসদ সদস্য হিসেবে ওখানে গিয়েছিলেন। অথচ প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করতে বলা হলো।

তিনি আরও বলেন, তার সঙ্গে থাকা ছাত্রদল নেতার হাতে অত্যাধুনিক রাইফেল দেখা গেছে। ওই ছাত্রদল নেতাকেও আইনের আওতায় নেওয়া হয়নি। মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের ব্যর্থতার দায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।