Image description

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারী প্রায় সবাই ছিল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মী। হামলায় ১৬ থেকে ১৭ জন জড়িত থাকলেও প্রকাশিত ছবি ও ভিডিওতে আটজনকে শনাক্ত করা গেছে।

শনাক্ত হওয়া ছাত্রদল নেতারা হলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহসভাপতি এম আহসান হাবীব, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহসভাপতি শরিফুল ইসলাম, ফারুক হোসেন, তাকদির আল ইমন এবং সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম। এ ছাড়া ছাত্রদল কর্মী বিশাল চক্রবর্তী ও ইমনের পরিচয়ও নিশ্চিত হওয়া গেছে।

হামলাকারীরা ছাত্রশিবিরের নেতাদের মারতে এসে শেষ পর্যন্ত পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে আসা সাংবাদিকদের পিটিয়ে আহত করে। এতে অন্তত পাঁচজন সাংবাদিক আহত হয়েছেন।

ছাত্রদল নেতাদের মধ্যে আহসান হাবীব ও হাসিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে আগে থেকেই মামলার ভয় দেখিয়ে চাঁদা দাবি, বহিরাগত নিয়ে শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাত এবং মাদকসহ পুলিশের হাতে আটকের মতো একাধিক অভিযোগ রয়েছে। চাঁদাবাজির অভিযোগে তাদেরকে ছাত্রদল থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তা প্রত্যাহার করে কেন্দ্রীয় কমিটি।

অস্ত্র নিয়ে মহড়া ও হামলার সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিশ্চুপ থাকায় এবং পুলিশের উপস্থিতি সত্ত্বেও ব্যবস্থা না নিয়ে চলে যাওয়ায় প্রশাসন ও পুলিশের তীব্র সমালোচনা চলছে।

ঘটনার সূত্রপাত শনিবার রাতে ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে ছাত্রদল নেতা আহসান হাবীবের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মারকে নিয়ে কটূক্তি করা হলে মন্তব্যের ঘরে তার প্রতিবাদ জানান রাকসুর সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক ও শিবির নেতা রাকিবুল ইসলাম।

এর জের ধরে মেসেঞ্জারে পাল্টাপাল্টি হুমকির পর রোববার পরিবহন মার্কেট এলাকায় দলবল নিয়ে অবস্থান নেন আহসান হাবীব। উত্তেজনার বিষয়টি আগেভাগেই প্রক্টরকে জানানো হলেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি।

রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলে শিবির নেতা আরিফুল ইসলামের কক্ষ ভাঙচুর করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাদের হাতে রামদা, চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাট দেখা যায়। ঘটনার খবর পেয়ে প্রক্টর মাহবুবুর রহমান ঘটনাস্থলে গেলে ছাত্রদল নেতারা অস্ত্র লুকানোর চেষ্টা করেন।

সে সময় ভিডিও ধারণ করতে গেলে সমকালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মাঈনুল ইসলাম রাজু, আজকের পত্রিকার দীন ইসলাম এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের আরিফ উজ্জামান কোরবানকে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়। পরে অন্য সাংবাদিকেরা এগিয়ে এলে দ্য ডেইলি স্টারের নূর আহসান মৃদুল এবং আগামীর সময়ের প্রতিনিধি জাহিদুল ইসলামকেও পিটিয়ে আহত করা হয়।

হামলায় জাহিদুলের মাথা ফেটে যায়। অন্য সাংবাদিকদের পুঁতে ফেলার হুমকি দেওয়া হলে প্রক্টর তাদের হলের ভেতরে নিয়ে রক্ষা করেন।

ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মাহবুবুর রহমান নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করে টাইমসকে বলেন, ‘আমরা ব্যর্থ, আমাদের দ্বারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।’ একই সঙ্গে সাংবাদিকদের পেটানোর সময় পুলিশ এলেও তারা ভয়ে পালিয়ে যায় বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরজুন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পুলিশের এমন ভূমিকার সমালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘ব্যর্থ হলে প্রক্টরের পদত্যাগ করা উচিত। প্রশাসনিক চেয়ারে কোনো আঠা লেগে আছে কি না তা দেখা দরকার।’

সাংবাদিকদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে ‘বাংলাদেশ জার্নালিস্টস ইন ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া’র প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক সাম জাহান বলেন, বাকস্বাধীনতার শত্রু সবসময়ই থাকে, শুধু চেহারা বদলায়। ক্ষমতায় এলে ইতিহাস ভুলে নিপীড়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার এই চর্চা বন্ধ হওয়া দরকার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা স্বৈরতন্ত্র থেকে মবোক্রেসির দিকে যাচ্ছি। এখানে সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো পুলিশও মবোক্রেসিকে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। রাষ্ট্র সাংবাদিকদের নিরাপত্তা দিতে না পারলে বলার কিছু থাকে না।’

ঘটনার সত্যতা গোপন করতে হলের সিসিটিভি ফুটেজ মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছে। যদিও হলের প্রাধ্যক্ষ মাহবুবুর রহমান দাবি করেছেন, সংস্কার কাজের জন্য সিসিটিভি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক আবদুল আলীম টাইমসকে জানান, সব তথ্য ও ডকুমেন্ট সংরক্ষিত রয়েছে।

এ ঘটনায় শহীদ জিয়াউর রহমান হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা হলেও তাতে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি।

এদিকে, হামলাকারী ছাত্রদল নেতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহত সাংবাদিকদের ‘গুপ্ত শিবির’ আখ্যা দিয়ে পোস্ট দিয়ে নিজেদের কর্মকাণ্ডকে জায়েজ করার চেষ্টা করছেন। তবে কেন্দ্রীয় ছাত্রদল এই ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী দাবি করেন, কোনো সাংবাদিকের ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা করা হয়নি। এটি শিবির ও ছাত্রদলের মধ্যে দূরত্ব তৈরির অপচেষ্টা।