Image description

একটি জন্মনিবন্ধন সনদ নাগরিকের প্রথম আইনি পরিচয়। ১৯টি অত্যাবশ্যকীয় সেবা পেতে প্রয়োজন এই পরিচয়। অথচ দেশে এ পরিচয় নিশ্চিত করতে পড়তে হচ্ছে যারপরনাই ভোগান্তিতে। ঘুরতে হচ্ছে দপ্তর থেকে দপ্তরে। জোগাড় করতে হচ্ছে একের পর এক কাগজপত্র। তবু মিলছে না জন্মনিবন্ধন সনদ। অন্যদিকে টাকা দিলেই তৈরি হয়ে যাচ্ছে অস্তিত্বহীন শিশুর জন্মনিবন্ধন, বদলে যাচ্ছে বয়স-পরিচয়। এমনকি রোহিঙ্গারাও পাচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিকের পরিচয়। এতে প্রশ্ন উঠেছে নাগরিক সেবা এবং জাতীয় তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে। জন্মনিবন্ধনের তথ্যেই যদি ভুল ও জালিয়াতির অবাধ সুযোগ থাকে, তাহলে সেই তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হওয়া এনআইডি, পাসপোর্ট ও অন্যান্য সরকারি নথি কতটা নির্ভরযোগ্য-উঠছে সেই প্রশ্নও। এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ দেশে পালিত হচ্ছে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস।

মেয়ের স্কুলে ভর্তির জন্য জন্মনিবন্ধন করতে গিয়ে সাতঘাটের পানি খেতে হয়েছে সাবরিনা জান্নাত আরাকে। মেয়ের সনদের জন্য স্বামীর জন্মনিবন্ধন করতে গেলে ঢাকার অফিস তাঁকে পাঠায় স্বামীর জন্মস্থানে। সেখানে বলা হয়, স্বামী ঢাকার ভোটার-আগে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করতে হবে। ভোটার এলাকা বদলাতে গেলে চাওয়া হয় ১৬ বছর আগে মারা যাওয়া শ্বশুরের মৃত্যু সনদ। একের পর এক জটিলতায় শেষ পর্যন্ত সামনে আসে ‘টাকা দিলে সব হয়ে যাবে’ প্রস্তাব। নিজের জন্মনিবন্ধনের তথ্য সংশোধনেও একই ভোগান্তির শিকার হন তিনি। পরে দালালের মাধ্যমে বাড়তি টাকা দিয়ে কাজ করাতে হয় তাঁকে। ১৭ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে নিজের ভুলে ভরা জন্মনিবন্ধন সনদ প্রকাশ করে ক্ষোভ জানান সাবরিনা। তাঁর অভিযোগ, পুরোনো মূল সনদে নামের তথ্য সঠিক থাকলেও সরকারি অনলাইন ব্যবস্থায় তাঁর ও বাবার নামের বাংলা বানান ভুলভাবে যুক্ত করা হয়েছে। সুবর্ণার জায়গায় লেখা হয়েছে সুর্বনা, এনায়েতের জায়গায় লেখা হয়েছে এনায়েম। তাঁর প্রশ্ন, ভুলটি যখন তিনি করেননি, তখন সংশোধনের জন্য সময়, অর্থ ও ভোগান্তির দায় তাঁকে কেন নিতে হবে?

জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের তথ্যে দেখা গেছে, জন্মনিবন্ধনের আবেদনের পাশাপাশি সংশোধনের আবেদনও বিপুল। গত ১১ মে জন্মনিবন্ধনের আবেদন করেন ৩০ হাজার ৪১ জন। একই দিনে সংশোধনের আবেদন করেন ২৫ হাজার ৩৩৭ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ জন্মনিবন্ধনের ভুল তথ্য সংশোধনের জন্যও আবেদন করছেন। শুধু ভুল-ত্রুটি নয়, জালিয়াতির চিত্রও ভয়াবহ। ঢাকার ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হাশেম আলীর (ছদ্মনাম) সন্তান একজন। কিন্তু জন্মনিবন্ধন সার্ভারে তাঁর সন্তানের তথ্য রয়েছে দুবার-একটির বয়স ১৮, অন্যটির ২১ বছর। গত বছর ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে বয়স বাড়িয়ে দ্বিতীয় জন্মনিবন্ধন করেন তিনি। এজন্য দালালকে দিতে হয় ১৫ হাজার টাকা। স্কুলে ভর্তির সময় ভুয়া টিকা কার্ড ব্যবহার করে দ্বিতীয় বা তৃতীয় জন্মনিবন্ধন করার ঘটনাও ঘটছে। বাল্যবিয়ের জন্য হরহামেশা ভুয়া জন্মনিবন্ধন করা হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সাদেকপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের ১৯ বছর বয়সি রোমান বিয়ে না করলেও জাতীয় জন্ম-মৃত্যুনিবন্ধন তথ্যভান্ডারে মৌসুমী নামে ১৮ বছর বয়সি এক স্ত্রী রয়েছে। তাঁদের সন্তান সংখ্যা ১৯। অর্থাৎ, বিয়ে না করেও জন্মের পর থেকেই রোমান প্রতি বছর একটি করে সন্তানের বাবা হয়েছেন! আর মৌসুমী ১৮ বছরে হয়েছেন ১৯ সন্তানের মা। গত বছরের শেষ দিকে বিষয়টি সামনে আসে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাঁচটি ইউনিয়নের ৫০৯টি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন যাচাই করে ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়। বাস্তবে জন্ম না নেওয়া শিশুর জন্ম এবং পরে তার মৃত্যুর তথ্য, মৃত মায়ের সন্তান জন্ম এবং একই নারীর একাধিক স্বামী দেখিয়ে সন্তান জন্মের তথ্যও পাওয়া যায়। জানা গেছে, ২০১৩ সালের পর জন্ম নেওয়া শিশুর জন্মনিবন্ধনে মা-বাবার জন্মনিবন্ধন প্রয়োজন। এই সুযোগে ইউপি কার্যালয়ের ডেটাবেজে থাকা প্রকৃত ব্যক্তিদের তথ্য ব্যবহার করে শিশুর নামে ভুয়া জন্মনিবন্ধন করা হচ্ছে। কখনো অর্থের বিনিময়ে, আবার কখনো নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও এমন জাল নিবন্ধনের অভিযোগ রয়েছে।

২০২৩ সালে চট্টগ্রামে একটি জালিয়াতচক্র গ্রেপ্তারের পর পুলিশ জানতে পারে, তারা সাত-আট মাসে টাকার বিনিময়ে ৫ হাজারের বেশি জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়েছে। এর আগে ২০২১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আপগ্রেডেশনের জন্য দেশের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের অফিশিয়াল সার্ভার বন্ধ থাকার সময়ও ১৮টি জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হয়। এর মধ্যে ১২টি ছিল রোহিঙ্গাদের নামে। তদন্তে জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের এক কর্মীসহ চারজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। কক্সবাজারের চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সচিব মো. নূরুল আলমকে চার রোহিঙ্গার নামে জন্মনিবন্ধন দেওয়ার দায়ে গত আগস্টে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে বাংলাদেশের। বিবিএসের হিসাবে দেশে বছরে প্রায় ৩২ লাখ শিশুর জন্ম হয়। এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ভুয়া ও ‘গায়েবি’ শিশুর জন্মনিবন্ধনের মতো অনিয়ম হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জন্মের সঙ্গে শিশুর পরিচয় নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক তথ্য যুক্ত করা হলে জালিয়াতি কমানো সম্ভব। জন্মের আগে ২৪ সপ্তাহের মধ্যে ফিঙ্গারপ্রিন্টের মৌলিক গঠন তৈরি হয় এবং জন্মের পর তা আজীবন অপরিবর্তিত থাকে। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেল ড. আবু নছর মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জন্মনিবন্ধনের সঠিকতা নাগরিক সেবা প্রাপ্তি এবং ডিজিটাল সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকে বিদেশ যাওয়ার সুবিধা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির উদ্দেশে ইচ্ছাকৃতভাবে বয়স ও নাম পরিবর্তন করে ভুয়া জন্মনিবন্ধন তৈরি করেন। সরকার এনআইডি ও পাসপোর্টের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করায় এ ধরনের জালিয়াতি দ্রুত ধরা পড়ছে। একাধিক জন্মনিবন্ধন থাকার কারণে নাগরিকদের পরবর্তীতে পাসপোর্ট ও এনআইডি তৈরিসহ নানা আইনি জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। এই জালিয়াতি রোধ করতে বর্তমান সরকার শিগগির দ্বৈত নিবন্ধন বাতিল করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ছাড়া, জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থাকে আরও সুরক্ষিত করতে এবং জালিয়াতি কমাতে নতুন সফটওয়্যারে ফিঙ্গারপ্রিন্ট যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জনপ্রতিনিধি না থাকায় ভোগান্তি চরমে : ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বেশির ভাগ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ইউপি চেয়ারম্যান পালিয়ে যান। জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা পেতে ভোগান্তি বেড়ে যায় কয়েক গুণে। বিশেষ করে ওয়ার্ড পর্যায়ে জন্মনিবন্ধনের আবেদন, তথ্য সংশোধন ও সনদ সংগ্রহে দীর্ঘসূত্রতা শুরু জয়। মিরপুরের বাসিন্দা ইয়াসির আরাফাতের অভিযোগ, আগে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়কেন্দ্রিকভাবে নাগরিকদের বিভিন্ন সেবা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও এখন বাড়তি সময় লাগছে।

জন্মনিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সনদ নিতে গিয়ে দিনের পর দিন কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে, বিভিন্ন দালাল ও কর্মচারীকে দিতে হচ্ছে টাকা। রাজধানীর কয়েকটি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইনে আবেদন করার পরও কাগজপত্র যাচাই, তথ্য সংশোধন ও সনদ সংগ্রহের জন্য সরাসরি কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে। ধানমন্ডির সামিয়া আরেফিন বলেন, সন্তানের জন্মনিবন্ধনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও দ্রুত সনদ পাওয়া যায়নি। স্কুলে ভর্তির তারিখ চলে যাওয়ার পরও কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে কয়েকবার যেতে হয়েছে। পরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার হস্তক্ষেপে সমাধান হয়েছে। 

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচিত কাউন্সিলর না থাকলেও জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন কার্যক্রম চালু রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়মিত সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্য সঠিক থাকলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় আবেদন নিষ্পত্তির কথা জানান তাঁরা।গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের বলেন, ‘সুশাসন নিশ্চিত করার প্রথম শর্তই হলো নাগরিকদের নির্ভুল ও সর্বজনীন তথ্য সংরক্ষণ। জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ সংস্কার করে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধনের বাধ্যতামূলক দায়িত্ব দিলে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।

স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে জন্মনিবন্ধনের দায়িত্ব দিতে হবে : মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি লিড মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেছেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ মানুষের জন্মনিবন্ধন নিশ্চিত করতে হবে। তবে বাংলাদেশে নানা কারণে তা ব্যাহত হচ্ছে। জন্মনিবন্ধনের হার বাড়াতে ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’ এর সংস্কার প্রয়োজন। পরিবারের ওপর একক দায় না রেখে সব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রকে সরাসরি নিবন্ধনের দায়িত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশ প্রতিদিনকে গতকাল মুহাম্মদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের গড় হার যথাক্রমে ৫০ এবং ৪৭ শতাংশ। এখনো অর্ধেক মানুষ নিবন্ধনের বাইরে। এ ছাড়া এই নিবন্ধনের মধ্যে দ্বৈত নিবন্ধনের বিষয়ও আছে। বাল্যবিয়ে, স্কুলে ভর্তি, বিদেশযাত্রা এমন নানা কাজে মানুষ একাধিক বয়স কমিয়ে-বাড়িয়ে একাধিক জন্মনিবন্ধন করছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে ৬৭ শতাংশ শিশুর জন্ম হয়। আইন সংশোধন করে স্বাস্থসেবা কেন্দ্রগুলোকে জন্মনিবন্ধনের দায়িত্ব দিলে প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশু স্বয়ংক্রিয় ও নির্ভুল নিবন্ধনের আওতায় আসবে। এতে তথ্য বিকৃতি কমবে, ভুয়া বা ভুল নিবন্ধনের সুযোগ বন্ধ হবে। যেহেতু হাসপাতালগুলোতে রেজিস্ট্রার থাকবে, ফলে তারা একাধিক নিবন্ধন করতে পারবে না। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সব নাগরিকের একক আইডি করার পরিকল্পনা করছে। এটা বাস্তবায়ন হলে পরিচয় সংক্রান্ত অনেক জটিলতা কমে যাবে।