Image description

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাদক কারবার থেকে অর্জিত অর্থ জমি, বাড়ি, ভুয়া কোম্পানি ও একাধিক ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বৈধ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একাধিক অনুসন্ধান ও তদন্তে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সিআইডির মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মাদক কারবার শুরুর আগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের উল্লেখযোগ্য কোনো স্থাবর সম্পত্তি ছিল না। একই ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের নামে ৯-১০টি পর্যন্ত পৃথক ব্যাংক হিসাব খুলে অল্প অল্প করে কোটি কোটি টাকা জমা ও উত্তোলন করা হয়েছে। যাতে কোনো একক হিসাবে বড় অঙ্কের সন্দেহজনক লেনদেন নজরে না পড়ে। এন্টারপ্রাইজ বা ট্রেডার্স নামে প্রতিষ্ঠান খুলে আয়কর রিটার্নে ব্যবসার মুনাফা দেখিয়ে অবৈধ আয়কে বৈধ রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।

পুলিশের তদন্তে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কার্যক্রমের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। জমি-বাড়ি নিজের নামে না রেখে স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রী বা শ্যালিকার নামে কেনা হয়েছে, এটি সম্পদের উৎস আড়াল করার একটি সাধারণ কৌশল। মাদক কারবারিরা আয়ের একটি বড় অংশ প্রাইভেট কার, গয়না ও ব্যক্তিগত ভোগবিলাসে ব্যয় করে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নুরুল ইসলাম (৪১) ও তার স্ত্রী রাজিয়া ইসলাম (৩৮)। নুরুল ইসলামের মূল বাড়ি ভোলা এবং রাজিয়ার বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফে হলেও থাকেন রাজধানীর আদাবরে। সিআইডি অনুসন্ধান করে দেখে, ২০১২ সালের আগস্ট থেকে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নুরুল ইসলাম ‘আল নাহিয়ান এন্টারপ্রাইজ’, ‘মিফতাহুল এন্টারপ্রাইজ’ ও ‘অরকা এন্টারপ্রাইজ’ নামে প্রতিষ্ঠান খুলে আয়কর রিটার্নের আড়ালে মাদক কারবারের অর্থ বৈধ করার চেষ্টা করেছেন তারা।

মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যানে নুরুল ইসলামের নামে তিনটি বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। একটিতে ৪৩টি কক্ষ এবং অন্যটিতে ১২টি ইউনিট। আদাবরে রয়েছে আরও একটি তিনতলা বাড়ি, এর ৮টি কক্ষ। স্ত্রী রাজিয়া ইসলামের নামে মোহাম্মদপুর, সাভার ও কক্সবাজারের টেকনাফে একাধিক প্লট রয়েছে। আয়কর নথির তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ সালে নুরুল ইসলামের নিট সম্পদ ছিল মাত্র ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০২০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকায়। স্ত্রী রাজিয়ার নামে ২০২১ সালে নিট সম্পদ দেখানো হয় প্রায় ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। জানতে চাইলে সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, এ দম্পতির প্রকৃত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং ব্যাংক হিসাব খোলার সময় দেওয়া ঠিকানাও ভুয়া পাওয়া গেছে। তাদের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ রাজধানীর আদাবর থানায় মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেন পুলিশ পরিদর্শক মনিরুজ্জামান।

এদিকে পাবনার আতাইকুলার গণেশপুর গ্রামের শাহিন আলমের ব্যাংক হিসাবে এক দশকে ৭ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। আতাইকুলার গণেশপুর গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১০ সালের আগে শাহিন আলমের কোনো জমি বা সম্পদ ছিল না। তার বাবার মৃত্যুর পর পরিবার মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। ২০১০ সাল থেকে তিনি ইয়াবা কারবারে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।তার নামে পুলিশের রেকর্ডপত্রে পাঁচটি মাদক মামলার তথ্য পাওয়া যায়। যেগুলো আদালতে বিচারাধীন। পুলিশের সিডিএমএসের মাধ্যমে দেখা যায় ২০২৩ সালের ১৪ মার্চ তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে একটি মামলা করেছেন সিআইডির তৎকালীন সহকারী পুলিশ সুপার আল মামুন। তিনি বর্তমানে সংস্থাটির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার।

ওই মামলার সূত্র ধরে জানা যায়, পাবনার আতাইকুলায় শাহিন আলমের নামে পূবালী ও ইউনিয়ন ব্যাংকে ১০টি ব্যাংক হিসাব পাওয়া গেছে। এসব হিসাবে মোট জমা পড়ে প্রায় ৬ কোটি ৬২ লাখ টাকা। অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন জানিয়েছেন, ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তিনি স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৫১ লাখ টাকার সম্পদ গড়েছেন। বাকি প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা মাদক কারবার পরিচালনা ও ভোগবিলাসে ব্যয় করেছেন। মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে ইয়াবা এনে টেকনাফ এলাকার স্থানীয় বাহকদের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন শফিক আলম ওরফে শফি। তার বাড়ি কক্সবাজারের টেকনাফ সদরের ডেইলপাড়ায়। থানার রেকর্ডপত্রে তার বিরুদ্ধে ১০টি মাদক মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্র্যাক ব্যাংকের চট্টগ্রাম সিডিএ অ্যাভিনিউ শাখায় ‘সাফিক ট্রেডার্স’ ও ‘সাফিক এন্টারপ্রাইজেস’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ৯টি হিসাবের মাধ্যমে ২০১৭-২০১৯ পর্যন্ত, এই তিন বছরে প্রায় ৩৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে। এই সন্দেহজনক লেনদেনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেছেন সিআইডির তৎকালীন এসআই অলক চন্দ্র হালদার। টেকনাফের ডেইলপাড়ায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শফিক আলমের দুই ভাই মনির আলম ও রফিক আলম এবং বাবা আবদুল গফুরও মাদক কারবারের টাকায় অবৈধ সম্পদ গড়েছেন। শফিক আলমের সেখানে একতলা একটি বাড়ি এবং নান্দনিক গেট। পাশে ডেইলপাড়া মার্কেট। ডেইলপাড়া বায়তুর রব জামে মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণে একটি নান্দনিক দোতলা বাড়ি। পূর্ব পাশে আরেকটি টিনশেড বাড়ি রয়েছে। যদিও বাড়িতে শফিক আলম থাকেন না। সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন তার দুই ভাই। জানা যায়, টেকনাফ ছাড়াও চট্টগ্রাম বন্দর, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, নারায়ণগঞ্জের বন্দর, ঢাকার খিলগাঁওসহ বিভিন্ন থানায় তার বিরুদ্ধে আরও অন্তত আটটি মাদক মামলা রয়েছে। অবৈধভাবে বিদেশি মদ, বিয়ার, ভদকা, হুইস্কি, জিন, ব্র্যান্ডি ও ইয়াবা সরবরাহ করতেন খুলনার লবণচরা উপজেলার সাচিবুনিয়া এলাকার শাহজাহান হাওলাদার।

২০০১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত একটি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা জমা ও প্রায় সমপরিমাণ উত্তোলন হয়েছে। তার বড় স্ত্রীর নামে সাচিবুনিয়া বাজারের পাশে ৫ কাঠা জমিতে চার তলা ‘সোনালী কটেজ’ নামে বাড়ি রয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য ১ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে আড়াই কাঠা জমিতে আরেকটি চার তলা ‘গোলাপ কটেজ’ নামে বাড়ি রয়েছে। এর আনুমানিক মূল্য ৬০ লাখ টাকা। শ্যালিকা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে বিশ্বরোড মোড়ে ও অন্যত্র আরও জমি রয়েছে, এসবের আনুমানিক মূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকা।

পুলিশ জানায়, তার ব্যক্তিগত একটি প্রাইভেট কার জব্দ করা হয়েছে। একটি মাদক মামলায় আলামত হিসেবে সংরক্ষিত। খুলনার লবণচরা, সোনাডাঙ্গা ও খুলনা সদর থানায় তার বিরুদ্ধে অন্তত ছয়টি মাদক মামলা রয়েছে। ২০২১ সালের ৫ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে একটি মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করে সিআইডি। আরও কয়েকটি মামলার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সীমান্তবর্তী বা মাদক-প্রবেশপথসংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু হওয়া মাদক কারবারের অর্থ ধাপে ধাপে ঢাকা ও চট্টগ্রামে স্থানান্তরিত হয়ে জমি-ফ্ল্যাটে রূপান্তরিত হয়েছে। সিআইডি কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে তদন্তে ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, আয়কর নথি ও সম্পত্তির দলিল পর্যালোচনা করে আয়ের সঙ্গে সম্পদের অসামঞ্জস্যতা দেখা যায়। যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ধারায় অপরাধযোগ্য।

পল্লবীর প্যারিস রোডে মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে জড়িত ইমরানের বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় ২০২৩ সালের ১৫ অক্টোবর মানি লন্ডারিং আইনে একটি মামলা হয়। গত বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি মামলাটির চার্জশিট দেন সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম। তিনি এ প্রতিবেদককে জানান, বিদেশি মদ বিক্রির মাধ্যমে ৬ কোটি ৮৬ লাখ ৭২ হাজার টাকা তিনি গাড়ি, জায়গা, জমি, ফ্ল্যাট, স্বর্ণালংকার ক্রয়বিক্রয়ের মাধ্যমে লন্ডারিং করেছেন। ভোলা, রাজধানীর গুলশান, ভাটারা, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে।

সম্প্রতি মাদক কারবারি ল্যাংড়া রুবেলকে গ্রেপ্তারের পর ডিবি জানায়, তার ব্যবহৃত দুটি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। গাড়ি দুটি অন্য দুই ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত। হেমায়েতপুরে রুবেলের একটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে, যা প্রাসাদের মতো। তবে তার দৃশ্যমান কোনো বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া যায়নি। মাদকের টাকা নিয়ে সে আলমগীরকে গত ৭ আগস্ট বাউনিয়াবাঁধ এলাকায় গুলি করে। আলমগীরও একজন চিহ্নিত মাদক কারবারি। আলমগীরের স্ত্রী রিনা আক্তার এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমার স্বামী রাজনীতি করে সে কখনোই মাদকের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। পুলিশ টাকা খেয়ে তাকে ফাঁসিয়ে দিচ্ছে।’

সিআইডি সূত্র জানায়, কবির গাজীর ভাটারার নূরেরচালা ও গাজীপুরে একাধিক বাড়ি রয়েছে। বাড্ডায় একটি ১০ তলা বাড়িও আছে তার। কবির গাজীর বিরুদ্ধে ২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বনানী থানায় মাদকের মামলা হয়। ৯ ও ১১ মার্চ আরও দুটি মামলা হয়। ২০১৮ সালের ২১ মার্চ একই থানায় আরেকটি মামলা হয়। ২০ জুন আরেকটি মামলা হয়। একই থানায় একই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর আরেকটি মামলা হয়। একই বছরের ৩০ জুন মিরপুর মডেল থানায় আরেকটি মামলা হয়। ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় একটি মামলা হয়। একই বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি গুলশান থানায় একটি মামলা হয়। ১০ সেপ্টেম্বর একই থানায় আরেকটি মামলা হয়। ২০২০ সালের ৯ জুন বনানী থানায় একটি মামলা হয়। ২০২২ সালের ২৯ জানুয়ারি ভোলা সদর থানায় আরেকটি মামলা হয় এবং ২৬ মে রাজধানীর গুলশান থানায় একটি মামলা হয়। তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের অনুসন্ধান করছে সংস্থাটির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমের এসআই মনির হোসেন।