এক ব্যক্তি, ২৯টি অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি করছিলেন ভুয়া সব সংবাদ। তা করছিলেন বাংলাদেশের গাইবান্ধা থেকে, উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচার।
ভুয়া বাংলা সংবাদ তৈরির এমন একটি স্বয়ংক্রিয় নেটওয়ার্ক শনাক্তের পর বন্ধ করার কথা জানিয়েছে মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক। এআই অপব্যবহার প্রতিরোধ নিয়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্য জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যানথ্রোপিকের চ্যাটবট ক্লড ব্যবহার করে নেটওয়ার্কটি বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে বাংলা ভাষায় ভুয়া খবর তৈরি করত। এসব কনটেন্টের উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত তৈরি করতে দলটির রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের আক্রমণ করা।
অ্যানথ্রোপিকের দাবি অনুসারে, ওই ব্যক্তি ‘ফেক নিউজ ৩’ নামে একটি নিজস্ব সফটওয়্যার তৈরি করেছিলেন। এটি ক্লডের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ করে নির্দিষ্ট কাঠামোয় কনটেন্ট তৈরি করত। প্রতিবার ১৫টি করে ভুয়া শিরোনাম, তিনটি বিস্তারিত বানানো সংবাদ এবং ছবি তৈরির জন্য ১৫টি নির্দেশনা বা প্রম্পট তৈরি করা হতো।
অ্যানথ্রোপিকের হিসাবে ওই নেটওয়ার্ক থেকে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা বর্ণনা এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করা হয়েছে।
২৯টি ক্লাউড অ্যাকাউন্ট
অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে থাকা ওই একক ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যবহার করেছেন। অ্যাকাউন্টগুলোর সীমা ও শনাক্তকরণ এড়াতেই এভাবে অ্যাকাউন্ট পরিবর্তনের কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
এই কাজে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছিল সীমিত। ক্লডের এপিআই ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলা শিরোনাম ও সংবাদ তৈরি করা হতো। এরপর কনটেন্টগুলো ক্লড স্টোরেজের নির্দিষ্ট ফোল্ডারে রাখা, অডিও ও ভিডিওতে রূপান্তর এবং ইউটিউবে প্রকাশের জন্য আরেকটি স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করা হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউটিউবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও প্রকাশের জন্য আলাদা আপলোড স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করা হয়েছিল। ভিডিও প্রকাশের সময়সূচি এক মাস আগেও নির্ধারণ করা যেত।
তদন্তের পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করেছে অ্যানথ্রোপিক। ভবিষ্যতে একই ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্টরা নতুন অ্যাকাউন্ট খুলে কার্যক্রম চালানোর চেষ্টা করতে পারে, এমন আশঙ্কায় নতুন ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রচারের লক্ষ্য গ্রামের মানুষ
অ্যানথ্রোপিক বলছে, ভুয়া এই কনটেন্টগুলো মূলত কম সাক্ষরতার হার রয়েছে, এমন এলাকা বা গ্রামের মানুষদের লক্ষ্য করে বানানো হতো। কনটেন্টগুলো ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে ভিডিও আকারে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নেটওয়ার্কটির অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে এসব কনটেন্টকে নিজেরাই ‘ফেক নিউজ’ বলত। ভাষা ও উপস্থাপন এমনভাবে তৈরির নির্দেশনা ছিল, যাতে সেগুলো ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ ও ‘আক্রমণাত্মক’ হয় এবং গ্রামের মানুষও সহজে বুঝতে পারেন।
অ্যানথ্রোপিকের তদন্তে দেখা গেছে, এই কার্যক্রমের ভিডিও বাংলাদেশকেন্দ্রিক বিভিন্ন চ্যানেল ও প্রোফাইলে ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক—তিনটি প্ল্যাটফর্মেই দেখা গেছে।
তবে এসব কনটেন্ট প্রকাশকারী সব নির্দিষ্ট চ্যানেল শনাক্ত করতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে এসব ভিডিও সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলোর বাইরে কতসংখ্যক দর্শকের কাছে পৌঁছেছিল, তা-ও নিশ্চিত হতে পারেনি।
আক্রমণ বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও অন্তর্বর্তী সরকার
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেটওয়ার্কটি বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি, অন্তর্বর্তী সরকারকে লক্ষ্য করে নানা ধরনের অপতথ্য ছড়াত।
কোনো কোনো প্রচারণায় বিরোধীদের বিদেশি এজেন্ট হিসেবে তুলে ধরা হতো এবং তাদের বিরুদ্ধে ‘তালেবান-ধাঁচের শাসন’ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ তোলা হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা, নির্দেশনা বা অর্থায়ন করেছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে অ্যানথ্রোপিক।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু কনটেন্টের বয়ান ভারতপন্থী ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তবে এর পেছনে কোনো রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই ঘটনাকে কেবল রাজনৈতিক প্রচারণার ঘটনা হিসেবে নয়, অপতথ্যের বিস্তারে এআইনির্ভর স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার প্রভাবের নতুন ধরনের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।