৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা টু চট্টগ্রাম লংমার্চ কর্মসূচিতে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী একটি প্রাডো গাড়ি ব্যবহার করেন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ওই কর্মসূচিতে একটি পথসভায় পাটোয়ারীর দামি গাড়ি ঘিরে ধরেছিল কয়েকজন যুবক। তাদের একজন জানতে চান কালো চকচকে গাড়িটি কিনেছেন নাকি অন্য কারো? জবাবে স্বভাবসুলভ শয়তানি হাসি দিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী বলেন, ‘গাড়ির মালিকের নাম বললে আপনারা ভেঙে ফেলবেন’। হুড খোলা গাড়িতে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী লংমার্চে যাচ্ছেন এমন ছবিসহ একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।
অতঃপর অনুসন্ধিসুর দল ওই প্রাডোর মালিককে খুঁজে বের করে। দেখা যায় প্রাডো গাড়ির মালিক মাদারীপুর সদর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুল ইসলাম তুষার ভুঁইয়া। এই তুষার সাবেক মন্ত্রী শাহজাহান খানসহ কয়েকজন নেতার সঙ্গে তার ছবি ভাইরাল। কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতের এমপি আমির হামজার একাধিক ওয়াজের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাসছে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘আমার দাদা ২৫ বছর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিল। বাবা আওযামী লীগ করেছে। আমার চৌদ্দগুষ্ঠী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত’।
এনসিপি ও জামায়াতের এই দুই নেতার বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্ক চললেও বাস্তব চিত্র হচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির নেতারা পরিত্যক্ত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পুনর্বাসনে প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতা ও ব্যবসায়ী মহলকে নিজেদের দলে ভিড়াচ্ছেন। কেউ আওয়ামী লীগের নেতাদের দলে ভিড়ানোর পাশাপাশি সম্পদ রক্ষা করার শর্তে তাদের সম্পদ ভোগ করছেন; কেউ ব্যবসা দেখভাল করছেন। ফলে সম্পদ রক্ষাই বলেন এবং মামলা মোকদ্দমা থেকে রক্ষা পেতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাদের মধ্যেও শুরু হয়েছে ‘দল পাল্টানোর’ অলিখিত প্রতিযোগিতা।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ ৭ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে বলেছেন, ‘মাদারীপুরের আওয়ামী লীগ নেতা তুষারের গাড়ি লংমার্চে এনসিপি নেতা নাসীরউদ্দীন পাটোয়ারী ব্যবহার করেন। শুধু তাই নয়, সারজিস আলম ও আখতার হোসেন নারায়ণগঞ্জের আওয়ামীপন্থি এক বড় ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫০ লাখ নিয়েছেন। কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শ্যামলকে এনসিপিতে নেয়া এবং পার্টি চালানোর জন্য মোটা অংকের টাকা নেয়া হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির কয়েকজন নেতা দেশের আওয়ামী লীগপন্থি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে গাড়িসহ আর্থিক উপহার পেয়েছেন এবং এখনো পাচ্ছেন এমন খবর এনসিপির অভ্যন্তরে ভাসছে।
ক্ষমতাসীন বিএনপি, জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াত এবং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনায় প্রতিষ্ঠিত এনসিপির নেতারা মুখে প্রতিদিন ভারতবিরোধী এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের বিচারের দাবিতে বক্তব্য দিচ্ছেন। তারা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায় কার্যকরের দাবিও করছেন। একই সঙ্গে আইন করে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিও জানাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ বিরোধী প্রকাশ্যের এই অবস্থানে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সমানতালে জানাচ্ছে। আবার পর্দার আড়ালে তিন রাজনৈতিক দলই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নেতাদের নিজ নিজ দলে ভিড়াচ্ছেন। তাদের ব্যবসা, ধন সম্পদের লোভ এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের নিজেদের দলে ভিড়াতে তৎপর হয়ে উঠেছেন ওই সব নেতা।
গত কয়েক মাস ধরে প্রচারণা ছিল বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রেজওয়ানা হাসানের স্বামী ও পুত্র ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের গার্মেন্টস ও হাউজিং ব্যবসা দেখভাল করছেন। বর্তমানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ভারতের শিলং থেকে ৮ বছর পর দেশে ফিরে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের কাছে আর্থিক সুবিধা নিয়ে গাড়ির বহরে ঢাকা থেকে শোডাউন করে কক্সবাজার গিয়েছিলেন। সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া রূপায়ণ টাওয়ারে আওয়ামী লীগ নেতার ফ্ল্যাট দখল করে নিয়ে বসবাস করছেন। এ চিত্রগুলো ওপেন সিক্রেট। কিন্তু মুখে আওয়ামী লীগের বিচার দাবি করলেও পর্দার আড়ালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ অনুসারী ব্যবসায়ী, শিল্পপতি এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সম্পদশালী নেতাদের নিজ নিজ দলে ভিড়ানোর প্রতিযোগিতা চলছে।
কিছুদিন আগে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা মনজুর আলমকে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে এনসিপির মেয়রপ্রার্থী করতে এনসিপির সিনিয়র কয়েকজন নেতা তার সঙ্গে বৈঠক করেন। এনসিপি নেতাদের খানাপিনা করানোর পর মনজুর আলম জানান, ‘তিনি বৈঠক করলেও আওয়ামী লীগ ছেড়ে এনসিপিতে যোগদান করবেন না; তবে বিএনপি ডাকলে অন্য কথা’। কয়েক দিন আগে এনসিপির নেতা নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সাবেক এমপির বাসায় রাত্রি যাপন করেন। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। এনসিপি নেতারা তখন বলেছিলেন, তারা জানতেন না ওই বাড়ির মালিক দুই ভাই জাতীয় পার্টি ও আওযামী লীগের এমপি ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনা পালানো এবং অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রশাসন থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের নেতাদের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, মিডিয়া হাউজ এবং বিভিন্ন কর্পোরেট হাউজে জামায়াত ও এনসিপির নেতারা বসেন এবং নিজেদের ছায়াতলে আওয়ামী লীগ নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে আর্থিকভাবে লাভবান হন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর একই পথ অনুসরণ করে বিএনপি। এটা শুধুই রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং আর্থিক লাভালাভ ও এক প্রকার রাজনৈতিক পুনর্বাসনের খেলা। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে একটি বড় অংশের মধ্যম ও তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতাদের টার্গেট করছে বিএনপি।
ইতোমধ্যে ক্লিন ইমেজের ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অনেক এমপি-, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌর চেয়ারম্যান ও নেতারা দলটির সঙ্গে যোগাযোগ করছে। অভিযোগ আছেÑ মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অনেক নেতা বিএনপির ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন, নিচ্ছেন। একই অভিযোগ জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধে। এনসিপির কয়েকজন সিনিয়র নেতা ‘জুলাই চেতনা’ পুঁজি করে আওয়ামী লীগ ব্যবসায়ীদের কব্জা করছেন; কোনো কোনো ব্যবসায়ী নিজেদের অর্থ-সম্পদ রক্ষা এবং মামলা থেকে বাঁচতে এনসিপির নেতাদের অর্থের বিনিময়ে নিরাপত্তা নিচ্ছেন। ফলে জুলাই অভ্যুত্থানের আগে এনসিপির যাদের রিকশায় চলাচলের অর্থ ছিল না; তারা এখন প্রাডো, নিশাল পেট্রোল গাড়িতে চলাচল করেন। মেসবাসী ও হলে যারা বসবাস করতেন তারা এখন রাজধানীতে মোটা অংকের টাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।
আওয়ামী লীগের নেতাদের বিএনপি ও জামায়াতের পুনর্বাসন আবার এনসিপির মতো নয়। হাসিনা পালানোর পর সারাদেশে আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিএনপির স্থানীয় নেতারা। ফলে জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বেশির ভাগ প্রভাবশালী নেতার মধ্যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিএনপির কিছু নেতা ‘মামলা বাণিজ্য’ করলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিরোধ রয়ে গেছে। এ সুযোগ নিয়েছে জামায়াত। দলটি কার্যত এখন রাজনৈতিক চেতনার শত্রুর সঙ্গে মোলাকাত করেছে। এক সময় যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধ তুঙ্গে ছিল। যুদ্ধাপরাধ মামলায় সংগঠনটির ডজন নেতাকে ফাঁসি দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার।
হাসিনা পালানোর তিন দিন আগে জামায়াত নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল। সেই জামায়াত রাজনৈতিক সুবিধা নিতে এখন চমকপ্রদভাবে আগ বাড়িয়ে আওয়ামী লীগ ঘরানার নেতাদের দলে ভিড়াচ্ছেন। গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নিলফামারী, কুমিল্লা, জামালপুর, গাইবান্ধা, শেরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতা জামায়াতে যোগদান করেছেন। বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে জান্নাতের টিকিট বিক্রি করে এবং ঘরে ঘরে গিয়ে মহিলাদের ভোট কিনে নির্বাচনী ফলাফলে জামায়াত রংপুর বিভাগে অভাবনীয় সাফল্য এনেছে। আসন্ন স্থানীয় নির্বাচনেও একই কৌশল নিয়েছে জামায়াত। আওয়ামী লীগ পুনর্বাসনে অবস্থা বুঝে কৌশল নিচ্ছে জামায়াত। আর বিভিন্ন হাটবাজার ইজারা, দখল, মাঠ-ঘাটের ইজারা, বাসস্ট্যান্ড, টেম্পোস্ট্যান্ড, বালু মহাল ইজারা নিয়েছে বিএনপির নেতারা।
এদিকে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গায় লালনভক্ত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ১০২ জন নেতা-কর্মী আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগদান করেন। যোগদান অনুষ্ঠানে জেলা জামায়াতের আমির রুহুল আমিন তার বক্তব্যে বলেন, ‘আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠা ও শান্তিময় সমাজ গড়ার লক্ষ্যে ওরা জামায়াতে যোগদান করেন’।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনী প্রচারণায় আওয়ামী লীগের লোকজনকে জামায়াতে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়ে দলটির কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের এমপি প্রফেসর লতিফুর রহমান বলেছেন, আওয়ামী লীগ নেতারা জামায়াতে যোগ দিলে তাদের দায়দায়িত্ব তারা নেবেন। আইন-আদালত, থানা-পুলিশ সবকিছুই তারা দেখবেন। একই সঙ্গে তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকেও জামায়াতে যোগদানের আহ্বান জানিয়েছেন। এরপর থেকে মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা ও ব্যবসায়ীদের জামায়াতে যোগদানের প্রক্রিয়া শুরু হয় সেটা এখনো চলছে। একই সঙ্গে বিএনপি ও এনসিপি নিজেদের মতো করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতাদের দলে ভিড়াচ্ছেন। অথচ মুখে তিন রাজনৈতিক দলই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বক্তব্য-বিবৃতি দিচ্ছেন।
আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা ও তাদের ভোট ব্যাংক নিজেদের পক্ষে টানার প্রতিযোগিতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং নবগঠিত এনসিপির মধ্যে ব্যাপক পারস্পরিক কাদা ছোড়াছুড়ি ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলছে। জামায়াতে ইসলামীর সাধারণ সম্পাদক মিয়া গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেছেন যে, বর্তমান প্রশাসন ও বিএনপি বড় বড় কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং নমনীয় অবস্থান দেখিয়ে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিচ্ছে। এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ এবং আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও সতর্ক করেছেন যে, আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার চেষ্টা করলে বিএনপি নিজেই বড় সংকটে পড়বে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী মো. রাশেদ খাঁন অভিযোগ করেছেন যে, জামায়াত ও এনসিপি দল দু’টি ভোটের রাজনীতির জন্য পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসিত করছে। বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে কিংবা ভোট ব্যাংক বাড়াতে জামায়াত এনসিপিতে যোগ দিচ্ছেন।