Image description
পর্যাপ্ত মজুত, মাঠে কেন কৃষকের হাহাকার

পর্যাপ্ত সার মজুত থাকা সত্ত্বেও কিছু অসৎ ডিলারসহ মহল বিশেষ সরকারকে বিব্রত করতে কৃত্রিমভাবে সার সংকট সৃষ্টি করছে। এ কারণে কিছুদিন থেকে সার নিয়ে দেশের কয়েকটি জেলায় ডিলারের গোডাউন ভেঙে ক্ষুব্ধ কৃষকদের সারের বস্তা লুট করে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অথচ যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারের হাতে চাহিদার বিপরীতে পর্যাপ্ত সার মজুত আছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব ধরনের সারের চাহিদা ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। বিপরীতে সরকারের সংগ্রহে রয়েছে ৫১ লাখ ৮৩ লাখ টন সার। অর্থাৎ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারের সংগ্রহে উদ্বৃত্ত রয়েছে প্রায় ১৬ লাখ ৬৩ হাজার টন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির পেছনে এক শ্রেণির ডিলার, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত। এজন্য ইতোমধ্যে ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে শোকজ করা হয়েছে। এছাড়া চারজন জেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার এবং আরও চারজনকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ফয়সল ইমাম এবং যুগ্ম সচিব ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সেলিম খান যুগান্তরকে বলেন, ‘কার্যত সারের কোনো সংকট নেই। সম্প্রতি যেসব ঘটনা ঘটেছে তার পেছনে রয়েছে সার ইস্যুতে সরকারকে বিব্রত করার গভীর ষড়যন্ত্র। যে কেউ অনুসন্ধান করলে প্রকৃত সত্য জানতে পারবেন। মূলত হীন উদ্দেশ্যে একশ্রেণির লোকজন কৃত্রিমভাবে নানা ঘটনা তৈরি করছে। কিছু অসৎ ডিলারসহ মহল বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা করছে।’ তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের চাহিদা নিরূপণ করে দেশের প্রতিটি জেলায় সার সরবরাহ করেছি। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্যাপ্ত সার মজুত আছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেলা পর্যায় ছাড়াও মন্ত্রণালয় থেকে সারসংক্রান্ত প্রতিটি বিষয় কঠোরভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।

পর্যাপ্ত মজুত তারপরও কেন হাহাকার : কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউরিয়া সার দরকার ১৪ লাখ ২৯ হাজার টন। এর মধ্যে টিএসপি ৪ লাখ ৬৭ হাজার টন, ডিএপি ১০ লাখ ২৩ লাখ টন এবং এমওপি সারের চাহিদা ৬ লাখ টন। সারের এই পরিমাণ চাহিদার বিপরীতে মোট জোগান রয়েছে ৩৫ লাখ ২০ হাজার টন। এই জোগানের মধ্যে রয়েছে-ইউরিয়া সার ১৭ লাখ ৪৬ হাজার টন, টিএসপি ৯ লাখ ৪৫ হাজার টন, ডিএপি ১৩ লাখ ৮৪ হাজার টন এবং এমওপি ১১ লাখ টন। এতে দেখা যায়, মজুতের পরিমাণ প্রায় ৫১ লাখ ৮৩ হাজার টন।

তারপরও কেন সংকট : সারের মুজত পর্যাপ্ত। তারপরও কেন সারের এত সংকট? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, সার নিয়ে সরকারের নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে সাড়ে ১৫ বছরের অবৈধ সুবিধাভোগী আওয়ামী দোসররা। পরিকল্পিতভাবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত তারা। ডিলারশিপ বাতিল হওয়ার ভয় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসরদের। এ ছাড়া কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে সার পাচারের চেষ্টাও করছে। এছাড়া নতুন নীতিমালার আলোকে বিসিআইসি ডিলারদের একচেটিয়া ব্যবসা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা ও কৃষকদের কাছ থেকে কিছু খুচরা বিক্রেতার সারের অতিরিক্ত মূল্য নেওয়া। মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা জানান, দেশের উত্তরাঞ্চলে সারের কৃত্রিম সংকটের নেপথ্যে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ইন্ধন জোগাতে পারে। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা : সার সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে কৃষি মন্ত্রণালয় ২৮ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১০ দিনে ২০৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে। এ সময় ৩৪ লাখ ৬৮ হাজার ৮২৪ টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। লুট হওয়া ১ হাজার ৭০০ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ৪ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ৫ জনের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে ৬৪ জেলায় একজন করে মনিটরিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতি কীভাবে সৃষ্টি হলো, উত্তরণের উপায় কী-তা খতিয়ে দেখতে ২ জন যুগ্ম সচিব ও ২ জন উপসচিবের সমন্বয়ে চার সদস্য বিশিষ্ট তদারকি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এছাড়া সব জেলায় কৃষি কর্মকর্তাদের (উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক মনিটরিং অফিসার) সমন্বয়ে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খোলা হয়েছে। এই গ্রুপে দেশের সারসংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন।

বরাদ্দের অর্ধেক উত্তোলন করেন ডিলাররা : কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জুলাই এবং আগস্টে ডিলাররা ইচ্ছে করে সরকারি গুদাম থেকে বরাদ্দের অর্ধেক সার উত্তোলন করেন। ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তারা এ ঘটনাটি কৃষি মন্ত্রণালয়কে অবহিত না করে গোপন রাখেন। পরপর দুই মাস সার অর্ধেক উত্তোলন করায় বাজারে সারের সংকট সৃষ্টি হয়। পরে কৃষি মন্ত্রণালয় অনুসন্ধান করে দেখেছে, পরিকল্পিতভাবে সরকারি গুদাম থেকে বরাদ্দকৃত সার উত্তোলন না করে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চালানো হয়েছে। সে কারণে জেলা কৃষি কর্মকর্তাদের শোকজ, প্রত্যাহার ও স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।

অপপ্রচার : কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সার নিয়ে জেলা পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর নানা অপ্রচারও রয়েছে। সার নেই এমনটি প্রচার করে তারা কৃষকদের উত্তেজিত করে তুলেছে। এছাড়া আসন্ন রবি মৌসুমকে কেন্দ্র করে কৃষকরা অধিক পরিমাণ সার মজুত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিসিআইসি এবং বিএডিসির ডিলাররা নতুন সমন্বিত নীতিমালায় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার ফলে সরকারের সার নীতিমালা কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তথ্যানুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় ২০২৫-২৬ সালে ইউরিয়া সার বরাদ্দ ছিল ৭ লাখ ২৭ হাজার ৪০০ টন, টিএসপি ২ লাখ ৫২ হাজার ৭০৯ টন, ডিএপি ৫ লাখ ৮২ হাজার ৩৬৫ টন, এমওপি ছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ২৬২ টন সার। অপরদিকে, চলতি অর্থ বছরে ওই ১৬ জেলায় ইউরিয়া সারের বরাদ্দ ৭ লাখ ৪১ হাজার ৪০০ টন, টিএসপি ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭০৯ টন, ডিএপি ৬ লাখ ৫ হাজার ৩৭১ টন এবং এমওপি সার ৪ লাখ ১১ হাজার ২৬২ টন। প্রাপ্ত হিসাবে দেখা যায়, গত অর্থ বছরের তুলনায় চলতি অর্থ বছরের ২ হাজার টন টিএসপি সারের বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ডিএপির বাড়ানো হয় ২৩ হাজার ৬ টন, এমওপি সারের বরাদ্দ বাড়ানো হয় ৪ হাজার টন।

ডিলার সিন্ডিকেট : কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগে একটি ইউনিয়নে একজন ডিলার ছিল। ডিলারের কাছ থেকে নিয়ে খুচরা বিক্রেতারা সার বিক্রি করত। এটা আওয়ামী লীগ আমলের সিস্টেম। এ প্রক্রিয়ায় একই ডিলার একাধিক ইউনিয়নে নিজের মা, বাবা, ছেলে, মেয়ের নামে ডিলারপিশ নিয়ে এক চেটিয়া ব্যবসা করেছে। বিগত সরকারের সময় বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি করপোরেশনের (বিসিআইনি) সারের ডিলার এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজের ডিলারদের সারের ডিলারপিশ দেওয়া হয়। তবে পার্থক্য ছিল বিএডিসির সার বিসিআইসির ডিলাররা বরাদ্দ পেয়ে বিক্রি করত। কিন্তু বিসিআইসি থেকে বরাদ্দ দেওয়া সার বিএডিসির ডিলারা কখনও পায়নি। নীতিমালায় এ ধরনের বৈষম্য থাকায় বর্তমান সরকার নতুন করে ডিলার নিয়োগ নীতিমালা প্রণয়ন করে এবং সার বরাদ্দের এখতিয়ার কৃষি মন্ত্রণালয়ের হাতে নিয়ে আসে। এতে ডিলারদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ হয় এবং সার সংকট সৃষ্টিতে তৎপর হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। নতুন নীতিমালায় একটি ইউনিয়নে ৩ জন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া ৬ জন খুচরা বিক্রেতা নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছে। আগে থেকে যারা খুচরা বিক্রেতা ছিলেন, তাদের মধ্যে থেকে দুইজন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আর ৬ জন খুচরা বিক্রেতা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ফলে একজনের স্থলে তিনজন ডিলার ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ পাচ্ছে। এ কারণে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ঠিকাদারা ক্ষুব্ধ হয়েছে। এছাড়া ৬ জন খুচরা বিক্রেতা ব্যবসার সুযোগ পাওয়ায় অনেকের লাভে ভাগ বসেছে। ফলে তারও ক্ষুব্ধ হয়েছে সার সংকট তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের গত এক সপ্তাহের ঘটনা : সার পেতে দেরি হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে এক পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুর করেন ক্ষুব্ধ কৃষকরা। একই দাবিতে জেলার ভূরঙ্গামারীতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন তারা। পর্যাপ্ত সার সরবরাহ ও কথিত সার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে লালমনিরহাটেও মহাসড়ক অবরোধ করা হয়। গত রোববার নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারের কাশেম ট্রেডার্সের সামনে সার নিতে সকাল থেকেই জড়ো হন কৃষকরা। স্থানীয়দের ভাষ্য, সকাল আটটার পরও পরিবেশকের লোকজন না আসায় অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে সেখানে প্রায় ২’শ জন কৃষক জড়ো হন। সকাল নয়টার দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে কয়েকজন গুদামের টিনের বেড়া ভাঙচুর করেন। তবে অন্য কৃষকদের বাধায় গুদাম থেকে কেউ সার নিয়ে যেতে পারেননি। কৃষকদের অভিযোগ, গুদামে সার থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘসময় পরিবেশকের লোকজন না আসায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে সেখানে ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কিও হয়।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, এখন থেকে উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের সার প্রাপ্তির বিষয়টির ওপর বিশেষভাবে নজর রাখা হবে।

চলতি মাসেই বন্দরে ভিড়ছে বিএডিসির ৭ জাহাজ : এদিকে কৃষকদের কাছে সময়মতো ও নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছে দিতে নন-ইউরিয়া সারের সরবরাহ ও নিরাপদ মজুত নিশ্চিত করছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এরই ধারাবাহিকতায় চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ডিএপি ও টিএসপি সারবাহী বিএডিসির ৭টি জাহাজ দেশের বন্দরে ভিড়বে। সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় বিভিন্ন দেশ থেকে নন-ইউরিয়া সার আমদানি, সংরক্ষণ ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করছে বিএডিসি।

রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় মানসম্মত ডিএপি, টিএসপিসহ বিভিন্ন ধরনের নন-ইউরিয়া সার আমদানি করে পর্যাপ্ত মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে বৈশ্বিক বাজারে সম্ভাব্য সংকট বা সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও দেশের কৃষকদের প্রয়োজনীয় সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।