জ্বালানি তেল ও গ্যাস সংকট, বিদ্যুতের ‘ভুতুড়ে বিল’, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রতিবাদে সচিবালয় অভিমুখে পদযাত্রা করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। গতকাল রাজধানীর মুক্তাঙ্গন থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে সচিবালয়ের সামনে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন জোটের নেতাকর্মীরা। এসময় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হলে জামায়াত আমীর নেতাকর্মীদের শান্ত থাকতে বলেন। একপর্যায়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ও সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদকে শান্ত করতে ধাক্কা দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে দেন বিরোধীদলীয় নেতা। পরে সেখান থেকে আগামী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে চার বিভাগে লংমার্চ এবং ১৪ই নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে ১১দলীয় ঐক্য। ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৫ই সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের পথে লংমার্চ, এরপর ১৯শে সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুরে, ১০ই অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনায় এবং ২৪শে অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে লংমার্চ হবে। আর ঢাকায় মহাসমাবেশ হবে আগামী ১৪ই নভেম্বর।
লংমার্চের ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, লংমার্চের পাশাপাশি রাজপথে বেশ কয়েকটি সভা হবে। খুলনার লংমার্চের পরে যশোর ও কুষ্টিয়া হয়ে ঢাকায় ফিরবে ১১দলীয় ঐক্য। অন্য লংমার্চগুলো বাসযোগে হলেও সিলেটে হবে রেলপথে। সরকারকে ‘ফ্যাসিবাদী কায়দায়’ লংমার্চে বাধা না দেয়ার অনুরোধ জানান জামায়াতের আমীর।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎসহ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবিতে ১১দলীয় ঐক্যের কর্মসূচি চলমান থাকবে জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের আন্দোলন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গণহত্যার বিচারের দাবিতে। আমরা জীবিত থাকতে গণহত্যা ও গুম-খুনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বাংলাদেশে আস্ফালন করতে পারবে না। ইতিমধ্যে এলপিজি’র মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে উল্লেখ করে দাম কমানোর দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দাম না কমালে আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তর ঘেরাও করতে বাধ্য হবো।
জামায়াত আমীর আরও বলেন, আজ শুধু ঢাকা নয়, সারা বাংলাদেশেই একই কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে বিশ্বাসী। জনগণের দাবি জনপ্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছে দিতেই সচিবালয়ের সামনে এসেছি। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, যদি আমাদের এই মিছিল থামাতে চান, তাহলে ভেতর থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী কিংবা তার প্রতিনিধিকে এখানে আসতে হবে। আমরা জনগণের পক্ষ থেকে দাবিগুলো তাদের হাতে তুলে দিতে চাই। তারা যদি জনগণের দাবি বাস্তবায়নে সফল হন, আমরা তাদের ধন্যবাদ দেবো। কিন্তু ব্যর্থ হলে আমরা বসে থাকবো না। আন্দোলনের পর আন্দোলন, কর্মসূচির পর কর্মসূচি চলতেই থাকবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা কাউকে অসম্মান করতে আসিনি। সম্মানের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধির হাতে আমাদের দাবি তুলে দিতে চাই। এজন্য আমরা এখানে ১০ মিনিট অপেক্ষা করবো। এই সময়ের মধ্যে কেউ না এলে আমরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবো।
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনাদের অনুরোধে আমরা আপাতত এখানে থেমেছি। সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের বক্তব্য পৌঁছে দেয়ার জন্য আপনাদের অনুরোধ করছি। গ্যাস-বিদ্যুৎ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকার যেন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন না দেখে: বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, যদি গ্যাস, বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারে, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সরকার যেন ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন না দেখে।
কর্মসূচিতে ১০ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলো হলো- গত তিন মাসে আদায় করা সব ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে অবিলম্বে গণশুনানির আয়োজন করতে হবে। দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারে ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া এবং অন্য সব অযৌক্তিক ও অবৈধ চার্জ অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। গত তিন মাসে ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া ও অন্যান্য খাতে গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায়কৃত অর্থ কোনো আবেদন ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরত দিতে হবে। বিদ্যুৎ বিলিং ব্যবস্থায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পোস্টপেইড বিলের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে মিটার রিডিং লগ সংযুক্ত করতে হবে এবং প্রিপেইড মিটারের ভেন্ডিং সফটওয়্যার ও বিলিং ব্যবস্থার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অডিট পরিচালনা করতে হবে।
‘গ্যাস না থাকলে বিল নয়’-এই নীতি অবিলম্বে কার্যকর করতে হবে এবং সরবরাহহীন সময়ের জন্য কোনো বিল আদায় করা যাবে না। গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি ও আমদানিনির্ভরতা কমাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর জাতীয় জ্বালানি নীতি প্রণয়ন করে জরুরি ভিত্তিতে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও কূপ খননের উদ্যোগ নিতে হবে। মহেশখালী এলএনজি টার্মিনালের ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম এবং পুনরায় চালুর নির্দিষ্ট সময়সূচি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য ব্যাকআপ পরিকল্পনা ঘোষণা করতে হবে।
গ্যাসের সিস্টেম লস, চুরি ও অপচয় বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। অবস্থান কর্মসূচি থেকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করার পাঁয়তারা বন্ধের দাবি জানিয়ে এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারা বন্ধ করতে হবে। গ্যাস নেই, বিদ্যুতের ভুতুড়ে বিল দিতে হচ্ছে। এসব কারণে নারীরা রাস্তাঘাটে নেমে আসছেন, হাঁড়ি-পাতিল নিয়ে মিছিল করছেন। গণভোটের গণরায় যে সরকার মানে না, তারা জনগণের কোনো দাবি-দাওয়া পূরণ করবে না। নির্বাচনের শুরু থেকে সরকার যে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, সেটি তারা পদে পদে করে যাবে। সরকারকে সেটি করতে দেয়া যাবে না।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালে বর্ষাবিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। প্রয়োজনে ২০২৬ সালেও হবে। সরকার পাঁচ মাসে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ দিতে পারছে না, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না। প্রতিশ্রুতি দিয়েও একটি কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি।
কর্মসূচিতে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগের পতনের পরে বিএনপি’র ২০ লক্ষাধিক লোকের কাজের সুযোগ হয়েছে। তারা বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড, রাস্তাঘাটে চাঁদাবাজি শুরু করেছে। দেশ পরিচালনায় যোগ্য লোক লাগে। ঋণখেলাপিদের দিয়ে দেশ চালানো যাবে না। সে জন্য সরকারের ওপর বেশি আশা করা যাবে না। জনগণের দাবি আদায়ের জন্য যা যা করা দরকার, সেটাই করতে হবে।
কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, সহকারী সেক্রেটারি ড. হামিদুর রহমান আযাদ, মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দীন আহমদ, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মাওলানা ফখরুল ইসলাম, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির নায়েবে আমীর মুখলেসুর রহমান কাসেমী, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, ডিপিডিসি শ্রমিক কল্যাণ পরিষদের সভাপতি আনম বজলুর রহমান প্রমুখ।