অনেকদিন ধরেই টানাপড়েন চলছিল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে। কিন্তু আচমকা এই সম্পর্ক তলানিতে পৌঁছেছে। কেন এই পরিস্থিতি? বলা হচ্ছে, হাসিনাকে নিয়েই যত বিরোধ, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বৈরথ। ঢাকার সন্দেহ, নয়াদিল্লি হাসিনাকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে। তা নাহলে তারা কথা দিয়ে কেন বরখেলাপ করলো। নয়াদিল্লি কথা দিয়েছিল, তাদের ভূখণ্ড থেকে শেখ হাসিনাকে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দেয়া হবে না। গত এপ্রিলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সফরের সময়ও এ বিষয়ে ভারত আশ্বস্ত করেছিল। কিন্তু কথা রাখেনি। ৫ই আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে শেখ হাসিনা কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কথা বলেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রচার হয়েছে। নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত অনুষ্ঠানে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেই অনুষ্ঠানে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দেন। হাসিনা এই অনুষ্ঠানে যুক্ত হবেন তা জানার পর এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূতকে আগেই বিশেষ বার্তা দেয়া হয়েছিল। ঢাকার তরফে অনুরোধ করা হয়, হাসিনাকে যাতে ভারত সরকার এই সুযোগ না দেয়। কিন্তু হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে ভারতের নির্বিকার অবস্থানে ক্ষুব্ধ ঢাকা। শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের পরই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণলায়। কড়া বিবৃতিতে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়।
এই বিবৃতির ভাষাতেই ফুটে উঠে কতোটা সংক্ষুব্ধ সরকার। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতকে উদ্দেশ্য করে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এত কঠোর ও সরাসরি প্রতিক্রিয়া আর দেখা যায়নি।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তাকে দেশে ফিরিয়ে বিচারের মুখোমুখি করতে নয়াদিল্লিকে একাধিক চিঠি দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি ভারতের মাটি ব্যবহার করে হাসিনা এবং বাংলাদেশে নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের নেতাকর্মীরা যাতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন সে বিষয়েও নয়াদিল্লিকে তাগাদা দেয়া হয় দফায় দফায়।
ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ঢাকা ছেড়ে নয়াদিল্লি পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হতে শুরু করে। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে একের পর এক ঘটনায় পরিস্থিতি অনেকটা জটিল আকার ধারণ করে। ভারতের তরফে বাংলাদেশে অবস্থিত ভিসা সেন্টারগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখায় ঢাকা। ভারতে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভিসা কার্যক্রমও সীমিত করা হয়। দুই দেশের বাণিজ্যেও স্থবিরতা দেখা দেয়। সীমান্তে একের পর এক পুশইনের চেষ্টা উত্তেজনা ছড়ায়। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি’র নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ দেখায় ভারত। সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন দেশটির লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সরকারের শুভেচ্ছা বার্তা ও দেশটি সফরের আমন্ত্রণপত্রও পৌঁছে দেন তিনি।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ভারত সরকারের শোক বার্তা নিয়ে ঢাকায় আসেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর চলাকালে ভারত ঢাকার ভিসা কার্যক্রম চালুর ঘোষণা দেয়। এতে অনেকে ধারণা করেছিলেন পরিস্থিতির ক্রমে উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু সম্প্রতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নানামুখী আলোচনা ছড়ায়। এমন আলোচনার মধ্যেই তাকে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেয়ায় ঢাকায় নানা সংশয় সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
হাসিনা যেন বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে ভারতের মাটি ব্যবহার করতে না পারেন সে বিষয়ে গত ৩রা আগস্ট ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীকে স্পষ্টবার্তা দেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। ওই দিন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে উপদেষ্টার সঙ্গে ত্রিবেদীর সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাতে ভারতীয় দূতকে বলা হয়েছিল, পলাতক শেখ হাসিনাসহ কার্যক্রম নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের কেউ যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন। হুমায়ুন কবির সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের কার্যক্রম দুই দেশের সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। জবাবে ভারতের হাইকমিশনার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় খোঁজখবর নেয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু ওই সাক্ষাতের মাত্র দুই দিনের মাথায় দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্য সেই ইতিবাচক বার্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। একইসঙ্গে ভারত সরকারের প্রতিশ্রুতিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে কূটনীতিক মহল মনে করছে।
শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ দেয়ার ঘটনায় বুধবার রাতে কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিবৃতিতে বলা হয়, আত্মগোপনে থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে সরাসরি আলাপচারিতার অনুমতি দেয়ায় বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগেই এ ধরনের আয়োজনের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ভারত সরকারকে অবহিত করা হয়েছিল। তারপরও অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হওয়ায় ঢাকা গভীরভাবে মর্মাহত।
বিবৃতিতে বলা হয়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির দিনে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার এই কার্যক্রম বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অসম্মান। একইসঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলী নিয়ে জাতিসংঘ-সমর্থিত অনুসন্ধানের বাস্তবতাকে অস্বীকারেরও চেষ্টা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বিবৃতির শেষাংশে বাংলাদেশ স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, ২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে একাধিকবার ভারতের কাছে অনুরোধ জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি; বরং তাকে গণমাধ্যমে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের জনগণের অনুভূতিতে আঘাত করেছে এবং দুই দেশের সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের বিকাশের জন্যও ক্ষতিকর বলে মনে করছে ঢাকা।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রশ্নে ভারতের অবস্থান নিয়ে গত কয়েক মাস ধরেই পরস্পরবিরোধী বার্তা পাওয়া যাচ্ছে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটিতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অনুমতি দেয়া হয়নি এবং প্রত্যর্পণের বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে। কিন্তু ওই প্রতিবেদনের কয়েক দিনের মধ্যেই দিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন সেই অবস্থানের সঙ্গে দৃশ্যমান অসামঞ্জস্য তৈরি করেছে।
এর আগেও ২৩শে জানুয়ারি একই ধরনের একটি অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার ধারণ করা ভিডিও বক্তব্য প্রচার করা হয়। সেখানে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক বার্তা দেন। পরে ১৮ই মে একযোগে পাঁচটি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেন। সর্বশেষ ১০ই জুলাই রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন।
শেখ হাসিনা এমন এক সময়ে এই ঘোষণা দেন যখন বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে চীনের সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে তিস্তা প্রকল্পসহ বিভিন্ন কৌশলগত বিষয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা বাড়ায় নয়াদিল্লির উদ্বেগও বেড়েছে। যদিও এ বিষয়ে এ নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা নেই।
শেখ হাসিনার দিল্লিতে বক্তব্য দেয়ার আগে বাংলাদেশ সরকারের উদ্বেগের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেছিলেন, ৫ই আগস্টের অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন। এতে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং ওই অনুষ্ঠানে প্রকাশিত কোনো মতামতকেও ভারত সরকার সমর্থন করে না। একইসঙ্গে তিনি বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের অবস্থানকে এক করে দেখা উচিত হবে না। তার ওই বক্তব্যের পরই ভারত সরকারের অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
এদিকে শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেয়ায় ভারত সরকারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শেখ হাসিনাকে কেন গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেয়া হলো- সেটিই আমাদের প্রশ্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেয়া হলো।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে সেই সিদ্ধান্ত ভারতকেই নিতে হবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য এক ধরনের উস্কানি। পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে তিনি এটি করছেন।
এই অবস্থায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বাংলাদেশ-ভারতের এই টানাপড়েনে কার লাভ, কার ক্ষতি? ওয়াকিবহাল মহল মনে করেন, এতে দুই দেশের কারও লাভ হবে না। তৃতীয় পক্ষ এ থেকে ফায়দা তুলবে।