প্রশাসন সংস্কার ও মেধাভিত্তিক পদোন্নতির প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে বাড়ছে আন্তঃক্যাডার বৈষম্য, ওএসডি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দেওয়া এবং মেধাবী কর্মকর্তাদের বঞ্চিত করার অভিযোগের পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ঘটনা ঘটছে। এতে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কাজী আনোয়ার হোসেনকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের সচিব এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রায়হান কাওছারকে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব করা হয় গত ২৫ মার্চ। পরে তাদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত (ওএসডি) করা হয়। বিএনপি সরকারের গত সাড়ে পাঁচ মাসে নানা কারণে ১১ জন সচিবকে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করা হয়েছে। পদোন্নতি পেলেও তাদের কোথাও কাজে লাগাতে পারছে না সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ জুলাই উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব করা হয় ১৭৯ জনকে। তাদের মধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তারাও রয়েছেন। কিন্তু ২৪ ও ২৫ ব্যাচে মেধা তালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চার কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়নি।
২৪ ব্যাচের দুই কর্মকর্তা দুই দফায় বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যান্য ক্যাডার কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিবে পদোন্নতির ক্ষেত্রেও জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হযেছে। মেধা তালিকা মানা হয়নি। আন্তঃক্যাডার কর্মকর্তাদের বৈষম্য আরও বেড়েছে। আগের চেয়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও বেড়েছে। নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপির নেতাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব পদ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হওয়া কর্মকর্তা মো. ওবায়দুর রহমান সমকালকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গত ১৭ বছর কোনো পদোন্নতি পাইনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সচিব হিসেবে পদোন্নতির পর কেন জনপ্রশাসনে সংযুক্ত হলাম– কিছুই বুঝতে পারছি না।’
সাবেক সচিব, জনপ্রশাসন সংস্কার ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া সমকালকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে মেধাভিত্তিক জনপ্রশাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে। বিএনপির ইশতেহারে বলা হয়েছে, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাকে একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এটা অনেক ভালো দিক। কিন্তু এই সংস্কারে আমলাতন্ত্রই প্রধান বাধা। কারণ তারা নতুন কিছু চায় না।
তিনি বলেন, সরকারের এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আমলাদের আন্তরিকতার সঙ্গে ফাইল উপস্থাপন করতে হবে। এর পর মন্ত্রী-এমপিরা সিদ্ধান্ত দেবেন। কিন্তু আমলারা সংস্কারের সেই প্রস্তাব উপস্থাপনই করেন না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যেসব সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ ছিল, সেগুলোর মধ্যে অনেক প্রস্তাব তারা বাদ দিয়েছে। তিনি বলেন, প্রশাসনকে পরিবর্তন করতে হলে সরকারপ্রধানকে সরাসরি তদারক ও সমন্বয় করতে হবে।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নেই
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশে মেধাভিত্তিক নিয়োগ-পদোন্নতি, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন এবং জবাবদিহিমূলক কাঠামোর কথা বলা হয়েছিল। একই ধরনের অঙ্গীকার রয়েছে জুলাই ঘোষণাপত্র, ৩১ দফা এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও। কিন্তু প্রশাসনের বর্তমান চিত্রে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনপ্রশাসন বিশ্লেষকদের মতে, কেবল সরকার পরিবর্তন করলেই প্রশাসনের চরিত্র বদলায় না। পদোন্নতি, পদায়ন, মূল্যায়ন ও জবাবদিহির কাঠামোয় মৌলিক সংস্কার ছাড়া একই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘মেরিটোক্রেসির বাংলাদেশ’ বিনির্মাণ: মেধা, সততা, সৃজনশীলতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ, বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসনে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে যোগ্যতাই একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। কেউ যাতে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত না হয়, সেটাও নিশ্চিত করা হবে।
এদিকে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের কম সময়ে বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশের অগ্রগতি নেই। জনপ্রশাসন সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের রোডম্যাপ; সরকারি কর্মচারীর জন্য নতুন আচরণবিধি প্রণয়ন; সরকারি চাকরিতে যোগদানের সময় হলফনামায় সই করার মতো সুপারিশের বাস্তবায়ন নেই।
দণ্ডপ্রাপ্তরা পেলেন পদোন্নতি
আন্তঃক্যাডার বৈষম্য নিরসন পরিষদের সমন্বয়ক মুহম্মদ মফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আন্তঃক্যাডার বৈষম্য কমেনি বরং আরও বেড়েছে। কারণ শিক্ষা ক্যাডারের বদলি নীতিমালা-২০২৬ এ প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষমতা বেড়েছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে এডিসি শিক্ষা কর্মকর্তাকে বদলির ক্ষমতায় যুক্ত করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরেও শিক্ষা ক্যাডারের বদলিতে প্রশাসন ক্যাডারের হস্তক্ষেপ রয়েছে।
যুগ্ম সচিবের পদোন্নতির তালিকায় থাকা দণ্ডপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত উপসচিব মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। ডেমরার সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালে অসদাচরণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। তাঁকে তিন বছরের জন্য বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতির কাছে আপিল করলেও তাঁর দণ্ড বহাল রাখা হয়েছিল।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের উপসচিব মো. শাহীনুর ইসলামকে বালুমহাল কেলেংকারিতে লঘুদণ্ড দেওয়া হয়। নীলফামারীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) থাকাকালে তিস্তা নদীর বালুমহালের ইজারা গ্রহীতার চেক ব্যাংকে জমা না দিয়ে অর্থপ্রাপ্তির ভুয়া চুক্তি করার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে এক বছরের জন্য বেতন গ্রেডের সর্বনিম্ন ধাপে অবনমিতকরণের দণ্ড দেওয়া হয়। তিনিও পদোন্নতি পেয়েছেন।
স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের উপসচিব মুহাম্মদ মকবুল হোসেনকে ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে দুর্নীতির দায়ে শাস্তি দেওয়া হয়। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডে কর্মরত থাকাকালে নির্মাণকাজে দুর্নীতি ও অসদাচরণের দায়ে তাঁকে দুই বছরের জন্য দুটি বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রাখার দণ্ড দেওয়া হয়। পরে প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল তাঁর এ দণ্ড বাতিল করেন। তিনিও আছেন পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে।
কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি, মেধাভিত্তিক প্রশাসন গঠন এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত জনপ্রশাসনের অঙ্গীকার— এসব প্রত্যাশা নিয়ে প্রশাসনে পরিবর্তনের অপেক্ষায় ছিলেন কর্মকর্তারা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে আগের সরকারের সময়কার বিতর্কিত ধারা বহুলাংশে বহাল রয়ে গেছে।
মেধা ও কর্মদক্ষতার বদলে নানা বিবেচনায় পদোন্নতির অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। এতে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ আবারও বঞ্চিত। অনেকে দ্বিতীয় দফায় ওএসডি হয়েছেন।
অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগ থাকা বা বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তার যুগ্ম সচিবে পদোন্নতি প্রশাসনের ভেতরে নতুন অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্রশাসনের সংস্কার নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাড়ছে
একদিকে নিয়মিত পদোন্নতি ও পদায়নে জটিলতা, অন্যদিকে অবসরে যাওয়া কর্মকর্তাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংখ্যা বাড়ছে। বর্তমানে শুধু সচিব পদে ২২ জন কর্মকর্তা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। এতে অপেক্ষমাণ কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়ছে। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, অবসরোত্তর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ব্যতিক্রম হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা অনেক ক্ষেত্রেই নিয়মে পরিণত হচ্ছে।
এসএসবির কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে
পদোন্নতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কমিটি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বোর্ডের কার্যক্রম যথেষ্ট স্বচ্ছ নয়। মূল্যায়নের সুস্পষ্ট মানদণ্ড প্রকাশ না হওয়ায় পদোন্নতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তাকে যুগ্ম সচিবে পদোন্নতি দেওয়ার পর তা বাতিল করা হয়।
প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, মেধা, জ্যেষ্ঠতা, কর্মদক্ষতা, সততা ও পেশাগত সাফল্যের ভিত্তিতে মূল্যায়নের পরিবর্তে অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পাচ্ছে— এমন ধারণা প্রশাসনের ভেতরে জোরালো হচ্ছে। বাড়ছে বঞ্চনাবোধ।