একটি দেশের মানচিত্রের ভেতরেই এমন এক টুকরো ভূমি, যেখানে রাষ্ট্রের নিজস্ব চড়া শুল্ক, ট্যাক্স আর আমলাতান্ত্রিক লাল ফিতার দৌরাত্ম্যকে আইন করে অচল করে দেওয়া হয়—অর্থনীতির ভাষায় একেই বলে ‘ফ্রি ট্রেড জোন’ বা মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র। কিন্তু এর মূল জ্যামিতি হলো— বিনিয়োগকারীদের কর মওকুফ আর শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির টোপ দিয়ে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ করা, কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং লজিস্টিকস হাব হিসেবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মহাসড়কে যুক্ত হওয়া।
কিন্তু এই মুক্তবাণিজ্যের চমৎকার ধারণার গভীরে একটি মারপ্যাঁচে ভরা ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা লুকিয়ে থাকে। এই জোন যখন একটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে পিঠাপিঠি যুক্ত হয়, তখন তা শুধু আর স্থানীয় উৎপাদন কেন্দ্র থাকে না; পরিণত হয় পরাশক্তিগুলোর অর্থনৈতিক যুদ্ধ এবং ট্রানজিট বাণিজ্যের এক তীব্র টানাপোড়েনের নোঙরে।
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ী দ্বীপে বাংলাদেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন ও গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকদের যে গদগদ উচ্ছ্বাস, তার নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ জরুরি। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসনের সেই নিদারুণ সত্যটি এখানে ভীষণ প্রাসঙ্গিক—‘পুঁজিবাদের দ্বারা শোষিত হওয়ার চেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, শোষিত হওয়ার সুযোগটুকুও না পাওয়া।’ আমরা এখন প্রথম ট্র্যাজেডি থেকে বাঁচতে গিয়ে দ্বিতীয় ট্র্যাজেডির দিকে হাঁটছি কি না—সেই প্রশ্ন এড়ানো যাবে না।
মোটাদাগে এই জোনে লাভবান বেশি হবে ভারত—এ কথা বলতে কোনো দ্বিধা বা রাখঢাক রাখার প্রয়োজন নেই। নিরেট মানচিত্র এবং ভারতের নিজস্ব ‘লজিস্টিকস কস্ট’ বা পরিবহন ব্যয়ের খতিয়ান সামনে রাখলে এই সত্য দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যগুলোর অর্থনীতি এতদিন শুধু একটি সরু ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর জিম্মি ছিল। কলকাতা থেকে আগরতলায় পণ্য পাঠাতে তাদের যে সময় আর অর্থ ব্যয় হয়, মাতারবাড়ী ফ্রি ট্রেড জোন চালু হলে তা এক ধাক্কায় প্রায় অর্ধেক হয়ে যাবে। মাতারবাড়ীতে সস্তায় কাঁচামাল এনে, এখানকার সস্তা শ্রম ব্যবহার করে পণ্য ফিনিশড গুডসে রূপান্তর করে ভারত খুব সহজেই তা আসিয়ান বাজারে রপ্তানি করতে পারবে। সুতরাং, মাতারবাড়ী আসলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অর্থনীতির এক অবিশ্বাস্য ‘করিডোর’ বা লাইফলাইন।
মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলের এই মডেল ব্যবহার করে দুনিয়ার বহু দেশ নিজেদের ভাগ্য বদলেছে, আবার কেউ কেউ নিজেদের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিয়েছে।
বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফ্রি ট্রেড জোনের উদাহরণ দেখতে হলে আমাদের তাকাতে হবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী ফ্রি জোনের দিকে। দুবাইয়ের এই জোনটি শুধু তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যের রি-প্যাকিং, লজিস্টিকস ও ট্রানজিট হাবে পরিণত হয়েছে। তারা সফল হয়েছে, কারণ তাদের কাস্টমস পুরোপুরি ডিজিটাল এবং সেখানে কোনো ভূরাজনৈতিক শক্তির একাধিপত্য ছিল না। একইভাবে চীন ১৯৭৯ সালে শেনজেন অঞ্চলকে বিশেষ অর্থনৈতিক জোন ঘোষণা করে হংকংয়ের পুঁজি ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিকে নিজের দেশে টেনে এনেছিল, যা আজকের আধুনিক টেক-চীন গড়ে ওঠার মূল ভিত্তি। ইউরোপের প্রবেশদ্বার ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে রটারড্যাম বন্দর এবং ফ্রি জোন ব্যবহার করে নেদারল্যান্ডস পুরো ইউরোপের বাণিজ্যের চালকের আসনে বসেছে।
কিন্তু এর ঠিক উল্টো পিঠও আছে। আমরা যদি পানামার কোলন ফ্রি ট্রেড জোনের দিকে তাকাই, তবে দেখব এই জোনটি আমেরিকার বিশাল বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে পানামার মূল অর্থনীতি থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপে পরিণত হয়েছিল। সেখান থেকে বিপুল অর্থ পাচার ও কাস্টমস ফাঁকির ঘটনা ঘটেছে, যার মাশুল দিতে হয়েছে স্থানীয় অর্থনীতিকে। আর মেক্সিকোর মার্কিন সীমান্তঘেঁষা ম্যাকিলাডোরা জোনগুলোর ইতিহাস তো আরো নির্মম। সেখানে মার্কিন কোম্পানিগুলো সস্তায় মেক্সিকান শ্রম ব্যবহার করে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমেরিকায় নিয়ে গেছে; কিন্তু মেক্সিকোর নিজস্ব কোনো শিল্প-সক্ষমতা বা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ তৈরি হতে দেয়নি। দিনশেষে মেক্সিকো পেয়েছে শুধু সস্তা শ্রমের মজুরি আর মারাত্মক পরিবেশ দূষণ। মাতারবাড়ীর ক্ষেত্রে আমরা দুবাই বা শেনজেন হব, নাকি কোলন বা ম্যাকিলাডোরার মতো অন্যের সস্তা আড়তদার হব—সেটার জন্যই বেশি সাবধান হতে হবে।
যেভাবে মেঘ জমেছে : অতীত থেকে বর্তমান
মাতারবাড়ী রাতারাতি গজিয়ে ওঠা কোনো প্রকল্প নয়। মহেশখালীর এই উপকূলে ২০১৪ সালে জাপানি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা বা জাইকার অর্থায়নে মূলত শুরু হয়েছিল একটি আলট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প। কিন্তু সাগরের বিশাল প্রাকৃতিক গভীরতাকে (প্রায় ১৮ দশমিক ৫ মিটার) বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে হাসিনা সরকার একে একটি পূর্ণাঙ্গ গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরের মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়। মাতারবাড়ীকে ঘিরে ‘মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ’ (MIDA) গঠন করে ৩৭টি মেগা প্রকল্প নেওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু তাদের মূল সমস্যা ছিল—অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার চেয়ে রাজনৈতিক চটক এবং ভূরাজনৈতিক কার্ড খেলা। তারা এই প্রকল্পকে এমনভাবে সাজিয়েছিল, যাতে ভারত ও জাপানকে বঙ্গোপসাগরের এই স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে জায়গা দিয়ে পশ্চিমাদের খুশি রাখা যায়। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি ও সার্বভৌম দরকষাকষির ক্ষমতাকে এক ধরনের আড়ালেই ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।
এখানেই প্রবেশ ঘটে বঙ্গোপসাগরের অদৃশ্য দাবার চালের। শুরুতে এই মাতারবাড়ী বা কাছাকাছি সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর করার জন্য সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ও তৎপর ছিল চীন। কিন্তু ভারতের তীব্র আপত্তির কারণে এবং বঙ্গোপসাগরে বেইজিংয়ের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ (চীন কর্তৃক ভারতকে ঘিরে ফেলার সামুদ্রিক কৌশল) রুখে দিতে হাসিনা সরকার চীনকে বাদ দিয়ে ঢাকাকে জাপানের ফর্মুলায় ঠেলে দেয়। জাপানের ‘বিগ-বি’ (Bay of Bengal Industrial Growth Belt) উদ্যোগের অংশ হিসেবে মাতারবাড়ীকে বেছে নেওয়া হয়।
চীন এখানে সরাসরি না থাকলেও, তারা এই অঞ্চলের ওপর কড়া নজর রেখে আসছে। চীনের ঝুঁকি হলো—মাতারবাড়ী যদি পুরোপুরি ভারত-জাপান অক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI)-এর আওতাধীন পায়রা বা মোংলা বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব কমে যাবে। বাংলাদেশ এখানে একটি ভূরাজনৈতিক স্যান্ডউইচে পরিণত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে, যেখানে এক ইঞ্চি ভুল চালে যেকোনো বড় পরাশক্তি আমাদের অর্থনীতিতে বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা সিন্ড্রোম এবং আমাদের ঋণের অঙ্ক
মাতারবাড়ী নিয়ে কথা বললেই শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের উদাহরণ সামনে আসে। এখানটায় পুরোটাই ব্যর্থতা। শ্রীলঙ্কার সেই ঐতিহাসিক ব্যর্থতার ব্যবচ্ছেদ করলে যা পাওয়া যায়, তা মাতারবাড়ীর জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা। হাম্বানটোটা বন্দরটি তৈরি করা হয়েছিল কলম্বো বন্দরের বিকল্প হিসেবে, কিন্তু আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো কলম্বো ছেড়ে সেখানে যায়নি। ফলে বন্দরটি কোনো ‘কার্গো ট্রাফিক’ বা পর্যাপ্ত জাহাজ পায়নি। শ্রীলঙ্কা চীনের কাছ থেকে ৬ শতাংশের বেশি চড়া সুদে ‘কমার্শিয়াল লোন’ বা বাণিজ্যিক ঋণ নিয়েছিল, যা শোধ করার মতো রাজস্ব বন্দর থেকে আসেনি। ঋণ শোধ করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা বন্দরটি চীনের কাছে ৯৯ বছরের জন্য লিজ দিতে বাধ্য হয়।
মাতারবাড়ী প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি হলো, আমরা অনেকেই ভাবি ১৭ বা ২৪ হাজার কোটি টাকায় একটি বন্দর হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, সমুদ্রের মাঝখানে একটি দ্বীপকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র বানাতে যে বিপুল আনুষঙ্গিক অবকাঠামো তৈরি করতে হচ্ছে, তার খরচের অঙ্ক মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো।
মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১৭ হাজার কোটি টাকা। গত কয়েক বছরে প্রকল্পের পরিধি বৃদ্ধি, ভূমি অধিগ্রহণের বাড়তি খরচ এবং সবচেয়ে বড় কারণ—ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের ফলে প্রকল্পটির ব্যয় অনেকটাই বেড়ে যায়। এর প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা আসছে জাইকা থেকে জাপানি ঋণ হিসেবে। বাকি টাকা বাংলাদেশ সরকার, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর কাছ থেকে জোগান দেওয়া হবে বলা হচ্ছে।
কিন্তু বন্দরের বাইরেও যে বিপুল সাপোর্টিং ব্যাকবোন বা অবকাঠামো তৈরি করতে হবে, সেটির খরচ মূল বন্দরের চেয়েও বেশি। মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ‘মহেশখালী-মাতারবাড়ী সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ’র (MIDI) সার্বিক মাস্টারপ্ল্যানে আগামী ৩০ বছরে আনুমানিক ৬০ থেকে ৬৫ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার ওপরে) বিনিয়োগের প্রাক্কলন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রধানত কয়েকটি অতিকায় সমান্তরাল প্রকল্প রয়েছে। বন্দরকে সচল করতে এবং ফ্রি ট্রেড জোনের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জোগান দিতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট আলট্রা-সুপারক্রিটিক্যাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, কানেকটিভিটির জন্য মাতারবাড়ী থেকে চকরিয়ার মেইন হাইওয়ে পর্যন্ত চার লেনের ‘এক্সেস রোড’ এবং দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনকে মাতারবাড়ী পর্যন্ত সম্প্রসারণ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ।
জাপানি ওডিএ (ODA) ঋণের সুদের হার দৃশ্যত কম (সাধারণত ০.৬৫ থেকে ১.২ শতাংশ, আর কনসালট্যান্সি সেবার জন্য ০.০১ শতাংশ) এবং এর ১০ বছরের রেয়াতকাল (Grace Period) ও ৩০ বছরের দীর্ঘ পরিশোধের মেয়াদ রয়েছে। প্রথাগতভাবে একে ‘নরম ঋণ’ (Soft Loan) বলা হলেও, বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি একপ্রকার টাইম-বোম। কোনো কাজ না বাড়লেও শুধু ডলারের তেজের কারণেই আমাদের ঋণের প্রকৃত দায়ভার ক্রমাগত বাড়ছে।
আর ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অনেকগুলো মেগা প্রকল্পের (রূপপুর, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল) গ্রেইস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাবে। ফলে ওই সময়ে ডলারে ঋণ পরিশোধের যে সম্মিলিত চাপ তৈরি হবে, তাতে মাতারবাড়ী যদি প্রথম দিন থেকেই ডলারে নিট রেভিনিউ জেনারেট করতে না পারে, তবে ডলারে সুদের কিস্তি টানতে গিয়ে আমাদের এক্সচেঞ্জ রেট এবং রিজার্ভের ওপর চরম বিপর্যয় নেমে আসবে।
নতুন সরকারের সমীকরণ এবং সক্ষমতার আসল পরীক্ষা
১৬ জুন ২০২৬ সরকারের মন্ত্রিসভা কমিটি (Cabinet Committee on Economic Affairs) একটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কোল ঘেঁষে ৩০০ একর জমিতে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ফ্রি-ট্রেড জোন’ (FTZ) বা শুল্কমুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। বলা হয়েছে, পাশাপাশি চট্টগ্রাম বন্দরের কাছাকাছি আরো ৩০০ একর জমিতে আরেকটি জোন হবে। দেশের ইতিহাসে ফ্রি ট্রেড জোনের আওয়াজ এই প্রথম। একই সঙ্গে দুটো ফ্রি ট্রেড জোন বানানোর পরিকল্পনা নেওয়া হলো। সংসদে আলোচনা কবে হবে?
নতুন সরকার এই প্রকল্পকে কৌশলগত বাধ্যবাধকতা থেকে একে এগিয়ে নিতে চাচ্ছে। জাইকার বিশাল বিনিয়োগ থেকে মাঝপথে ব্যাকআউট করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এটাকে ‘ইকোনমিক গেম-চেইঞ্জার’ প্রজেক্ট হিসেবে নিতে হবে।
বিগত সরকারের মতো রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে বেরিয়ে একটি বাণিজ্যিক ও বিনিয়োগ অধিক্ষেত্র হিসেবে দেখা অপরিহার্য। প্রণিধানযোগ্য যে, যদি মাতারবাড়ী দ্রুত চালু করা যায়, তবে মাদার ভেসেল সরাসরি আসার কারণে পোশাক খাতের পরিবহন খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং লিড-টাইম প্রায় ১০-১৫ দিন কমে আসার কথা। দ্বিতীয়ত, হাসিনা আমলের বিলাসী আবাসন এবং অপ্রয়োজনীয় ও অবাস্তব প্রকল্পগুলো ছেঁটে ফেলে শুধু কোর পোর্ট এবং ফ্রি ট্রেড জোনের ওপর ফোকাস করলে ব্যয় সাশ্রয় হবে। সর্বোপরি, ভারতের সঙ্গে কানেকটিভিটি ও ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
এই জোন চালাবে কারা
কাগজে-কলমে এটি পরিচালনা করবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (BEZA) বা একটি বিশেষায়িত গভর্নিং বডি। কিন্তু ভেতরের আসল সত্যটি হলো—প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক, যার হাতে থাকে, অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ তারই থাকে। জোন পরিচালনার মূলনীতি, কাস্টমস সফটওয়্যার, মেরিটাইম ট্রাফিক কন্ট্রোল এবং বন্দর ব্যবস্থাপনার সিংহভাগ অদৃশ্য সুতো থাকবে জাপানি কনসোর্টিয়াম এবং আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনাকারী সংস্থাগুলোর হাতে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ভারতের বিশাল বাণিজ্যিক লবি। বাংলাদেশ এখানে মূলত একজন ‘ল্যান্ডলর্ড’ বা জমিদাতার ভূমিকায় থাকবে, যে প্রতি মাসে বা বছরে শুধু একটা নির্দিষ্ট ভাড়া বা পোর্ট ফি গুনবে।
আমাদের সক্ষমতা এখানে বড় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন। একটি আন্তর্জাতিক মানের ফ্রি ট্রেড জোন চালানোর জন্য যে ধরনের ‘স্মার্ট আমলাতন্ত্র’, শতভাগ ডিজিটাল ও দুর্নীতিমুক্ত কাস্টমস এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি প্রয়োজন, আমাদের প্রচলিত প্রশাসনে তা অনুপস্থিত। আমাদের কাস্টমস এখনো একটি কনটেইনার খালাস করতে দিনের পর দিন ফাইল আটকে রাখে। মাতারবাড়ীতে যদি এই একই আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি চালু থাকে, তবে বৈশ্বিক শিপিং লাইনগুলো এই বন্দর এড়িয়ে সিঙ্গাপুর বা কলম্বোকেই বেছে নেবে। আর ব্যবসা হাতানো রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়িত সিন্ডিকেট ঢুকলে তো কথাই নেই।
দিনশেষের খেরোখাতা
মাতারবাড়ী ফ্রি ট্রেড জোন নিয়ে আমাদের মুগ্ধতার ঘোর কাটাতে হবে। বাণিজ্যের এই করপোরেট দাপটের বিশ্বে রাজনৈতিক আবেগ দিয়ে হয়তো পিঠ চাপড়ানো যায়, কিন্তু দিনশেষে ঋণের কিস্তি শোধ করতে হয় ডলার দিয়েই। ভারত এই জোন থেকে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সুবিধাটি তুলে নিতে চাইবে তা নিশ্চিত। কিন্তু বাংলাদেশকে যদি দিনশেষে টিকে থাকতে হয়, তবে ভারতকে দেওয়া প্রতিটি সুবিধার বিপরীতে একটি নিরেট ‘ইকোনমিক রিটার্ন’ নিশ্চিত করতে হবে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আমাদের পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, এই জোনের কারখানায় অন্তত ৪০ শতাংশ দেশীয় কাঁচামাল (Backward Linkage) ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা রাখা এবং বন্দর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের জনবলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
তা না হলে, ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না। আমরা যেন নিজেদের ঘরের ভেতর অন্যের সস্তা বাণিজ্যের গোডাউন আর করিডোর তৈরি করে, দিনশেষে ঋণের খেরোখাতা নিয়ে বসে থাকা এক দেউলিয়া জাতিতে পরিণত না হই। মাতারবাড়ী আমাদের ‘সোনার খনি’ হতে পারে, কিন্তু সঠিক সক্ষমতা ও দেশপ্রেমের পলিসি না থাকলে এটি অন্যের স্বার্থের ‘হোয়াইট এলিফ্যান্ট’ বা শ্বেতহস্তী হয়ে ওঠার ঝুঁকিই বেশি।
- সাজ্জাদ পারভেজ