Image description

২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে সংঘটিত নির্মম গণহত্যার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে।  দাখিলকৃত চার্জশিট আমলে নিয়ে শেখ হাসিনাসহ পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।

গতকাল সোমবার ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের দফতরে দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। অভিযোগপত্রে তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালিন বিজিবি প্রধান (পরবর্তীতে সেনা প্রধান) জেনারেল আজিজ আহমেদ, তৎকালিন র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরসহ ৪১ হেভিওয়েট ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এক সঙ্গে এই সংখ্যক হেভিওয়েট আসামি আর কোনো মামলায় নেই। প্রসিকিউশন বলছে, এ চার্জশিট দাখিল এবং আমলে নেয়ার মধ্য দিয়ে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতের মহাসমাবেশে নির্মম হত্যাকা-ের বিচারের বড় অগ্রগতি।     

এই গণহত্যাটি ছিলো ২০১৪ সালে হাসিনার ভোটারবিহীন নির্বাচনের আগের বছর। যা দিয়ে শেখ হাসিনা  দেশবাসীকে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার নিষ্ঠুর বার্তা দিয়েছিলেন। ২০০৯ সালে পিলখানা ‘বিডিআর বিদ্রোহ’র নামে সেনাহত্যার মধ্য দিয়ে দেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে প্রথম দুর্বল করা হয়। এ ঘটনার ৪ বছরের মাথায় দেশের শান্তিপ্রিয় ধর্মপ্রাণ মানুষ, মাদরাসা ছাত্র,শিক্ষক আলেম-ওলামাদের রক্তে রঞ্জিত করে শেখ হাসিনা স্বীয় দানবীয় দু:শাসনের জানান দেন। পরবর্তীতে জঙ্গি দমনের নামে বহু নিরীহ মানুষ হত্যা করা হলেও শাপলা চত্বরের নিষ্ঠুরতা ছিলো অকল্পনীয়।

বিষয়টিকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ গণ্য করে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ দাখিলের জন্য প্রসিকিউশন ফর্মাল চার্জ দাখিল  করে। এই  চার্জশিট শাপলা চত্বরে হেফাজতের মহাসমাবেশে সংঘটিত বর্বর গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।  

প্রসিকিউশন জানায়, দীর্ঘ তদন্ত  শেষে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা  দেন তদন্ত কর্মকর্তা। এরপর যাচাই-বাছাই  শেষে রেজিস্ট্রারের দফতরে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়।এদিকে চার্জশিট দাখিলের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। তিনি ২০১৩ সালের ৫ মে  রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে সংঘটিত হত্যাকা-কে ‘ জেনোসাইড’ (গণহত্যা) হিসেবে উল্লেখ বলেন, হেফাজতে ইসলামকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তৎকালিন সরকারের পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ মিলে একটি নারকীয় গণহত্যা চালায়।  তবে ঘটনার পর এ নিয়ে করা মামলাটির  কোনো তদন্ত হয়নি। বহু  চেষ্টা করা সত্ত্বেও এই হত্যাকা-ের  কোনো তদন্ত বা বিচার পায়নি  হেফাজতে ইসলাম। অবশেষে এ ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়েছে। 

তিনি বলেন, কিছু ব্লগার বা নাস্তিকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে একটি ইসলামিক  গোষ্ঠী বা একটি ইসলামিক গ্রুপকে নির্মূল করে  দেয়ার জন্য  হেফাজতে ইসলামের মতো একটি সংগঠনের  নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ চালায় তৎকালিন সরকার। আমরা মোট ৬১ জন শহীদের তালিকা  পেয়েছিলাম। এর মধ্যে ৫৮ জনের নাম-ঠিকানা শনাক্ত করা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে  দুটি ঘটনার ওপর আমরা চার্জ দিয়েছি। একটি হলো শাপলা চত্বরে ৫  মে মধ্যরাতে নারকীয় ঘটনায় ৩২ জন শহীদ, আরেকটিতে ৬  মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জন মানুষকে হত্যা করার ঘটনা আনা হয়। আর এ সবকিছুই  জেনোসাইড ছিল।

এই দুটি চার্জে আমরা ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।  শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ চার্জশিট আমলে নিয়েছেন। চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে ৯ জন অন্য মামলায়  গ্রেফতার রয়েছেন। শেখ হাসিনাসহ বাকিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। 
কী ঘটেছিলো সেই রাতে : ২০১৩ সালের ৫ মে। রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে  হেফাজতে ইসলাম মহাসমাবেশ ডাকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শাপলা চত্বরে জমায়েত হন আলেম ওলামা, মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, মুসল্লিসহ ধর্মপ্রাণ লাখ লাখ মান্ষু। দাবি ছিলো ১৩ দফা।

গুরুত্বপূর্ণ দফাগুলো হচ্ছে: সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং  কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা। আল্লাহ রাসুল (সা:) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসা  রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ-ের বিধান  রেখে  আইন পাস। কথিত ‘শাহবাগী আন্দোলন’এ  নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর শানে জঘন্য কুৎসা রটনাকারী ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তি দানের ব্যবস্থা করা। ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব  বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর  থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।

মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং  দেশব্যাপী রাস্তার  মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করা। জাতীয় মসজিদ বায়তুল  মোকাররমসহ  দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘেœ নামাজ আদায়ে বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করা। রেডিও- টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে দাড়ি-টুটি ও ইসলামি কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসিঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায়  নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয়  লেবাস- পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ  প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করা। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ  দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী কর্মকা-ে জড়িত এনজিও এবং খ্রিস্টান মিশনারিগুলোর ধর্মান্তরকরণসহ সব অপতৎপরতা বন্ধ করা।

রাসূলপ্রেমিক প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র ও  তৌহিদি জনতার ওপর হামলা, দমন-পীড়ন, নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং গণহত্যা বন্ধ করা। সারা  দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ ও মসজিদের ইমাম-খতিবকে হুমকি-ধমকি, ভয়ভীতি দানসহ তাদের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করা এবং  অবিলম্বে  গ্রেফতারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাছাত্র ও  তৌহিদি জনতাকে মুক্তিদান, দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আহত ও নিহত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণসহ দুষ্কৃতকারীদের বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি প্রদান।এসব দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আহুত মহাসমাবেশে মতিঝিল শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন লাখো ধর্মপ্রাণ জনতা। হেফাজতের এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে দিনভর উত্তেজনা ও সহিংসতা ছড়ায় শেখ হাসিনার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শাপলা চত্বর ঘিরে সৃষ্টি করা হয় এক ভীতিকর পরিবেশ। হাসিনার নির্দেশে বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেয়া হয় ওই এলাকার। মহাসমাবেশস্থলে নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শাপলা চত্বরে অবস্থানকারীদের সরিয়ে দিতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির শত শত সদস্য পল্টনের  তোপখানা  মোড়, ফকিরাপুল ও দিলকুশা এলাকায় প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। 

গভীর রাতে ঘুমন্ত আলেম ওলামা, মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকসহ ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর হঠাৎ সশস্ত্র  তাণ্ডব শুরু করে পুলিশ-র‌্যাব ও বিজিবি,ছাত্রলীগ,যুবলীগের সন্ত্রাসীরা। ভোর অবধি চলে নিরীহ আলেম-ওলামা, মাদরাসা ছাত্র ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের ওপর বর্বরতা।  হাসিনার ঠ্যাঙ্গারে বাহিনী  মুহুর্মূহ গুলি ছোড়ে। কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড  গ্রেনেড ব্যবহার করে।  আতঙ্কে মতিঝিলের বিভিন্ন ভবন, সিঁড়ি ঘর এবং আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিংয়ে আশ্রয় নেন সমবেতরা। পুলিশ তাদের টেনে হিঁছড়ে বের করে এনে হত্যা করে। ভোর চারটার দিকেও থেমে থেমে গুলি চালায় র‌্যাব-পুলিশ। গণহত্যার প্রমাণ মুছে দিতে সূর্য ওঠার আগেই রক্ত¯œাত রাজপথ ও বিভিন্ন ভবনের সিঁড়ি পানি ঢেলে ধুয়ে ফেলা হয়। মিটি ট্রাকে করে সরিয়ে নেয়া হয় বহু লাশ।

পরদিন আ’লীগের তৎকালিন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম শাপলা চত্বর গণহত্যা প্রসঙ্গে বলেন,  হেফাজতে ইসলাম বিড়ালের মতো  লেজ গুটিয়ে চলে  গেছে।’ পরে মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ হেফাজত গণহত্যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে হেফাজতের মহাসমাবেশে আওয়ামী তা-বে শহীদ ৬১ জনের নাম-তালিকা তুলে ধরা হয়।  ১৩ বছর পর শুরু বিচার : শাপলা চত্বরে  হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ‘গণহত্যা’ চালানোর ঘটনায় মামলা হয় চব্বিশের জুলাই বিপ্লবের পর। ওই বছর ১৮ আগস্ট  আন্তর্জাতিক অপরাধ  ট্রাইবু্যূনালে অভিযোগ করা হয়। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।