Image description
ঢাকার আদালতপাড়ায় চাঞ্চল্যকর জাল-জালিয়াতি

ঢাকার আদালতপাড়ায় টাকা ফেললেই মেলে বিচারকের স্বাক্ষর। বিচারকের সিল, স্বাক্ষর আর আদালতের নথি এখন যেন হাতের খেলনা। টাকা দিলেই তৈরি হচ্ছে আদালতের আদলে নথি। গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট), সমন, নোটারি হলফনামা, কাবিননামা, এমনকি মামলার সার্টিফায়েড কপি বা নকলের কপিতেও বসানো হচ্ছে বিচারকের জাল স্বাক্ষর ও সিল। এসব নথি ব্যবহার করে চলছে প্রতারণা, হয়রানি এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করার কারসাজি।

ঢাকার অধস্তন আদালতকেন্দ্রিক এমন একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সন্ধান পেয়েছে যুগান্তর। আদালতের নথি, এজাহার, তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আদালত প্রাঙ্গণের কিছু ফটোকপির দোকান, দালাল, অসাধু আইনজীবী এবং কিছু অসৎ কর্মচারীর যোগসাজশে তৈরি হয়েছে এই নেটওয়ার্ক।

জাল হচ্ছে যেসব নথি : অনুসন্ধানে জানা যায়, চক্রটি বিচারকের স্বাক্ষর ও সিলযুক্ত গ্রেফতারি পরোয়ানা, ভুয়া সমন, মামলার সার্টিফায়েড কপি (নকল), নোটারি হলফনামা, কাবিননামা, জন্ম ও মৃত্যু সনদ, বিভিন্ন আইনি নোটিশ এবং হুবহু জাল মামলার কপি তৈরি করে লাখ লাখ টাকায় বিক্রি করছে। সূত্র জানায়, এসব নথি কখনো মানুষকে ভয় দেখাতে, কখনো মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে টাকা আদায়ে আবার কখনো প্রতিপক্ষকে হয়রানির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিচারকের স্বাক্ষর জাল করে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ : ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ১১ নম্বর আদালতের বিচারক আরিফুল ইসলামের সিল ও স্বাক্ষর জাল করার একটি ঘটনা সম্প্রতি সামনে আসে। আদালতের নথি অনুযায়ী, বরগুনার বামনা উপজেলার একটি সিআর মামলায় একটি নোটারি হলফনামা দাখিল করা হয়। ওই হলফনামায় উল্লিখিত আদালতের বিচারকের কাউন্টার সই ও সিল ব্যবহার করা হয়। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হলে সিএমএম আদালতের নেজারত শাখার হলফনামা রেজিস্টার যাচাই করা হয়। সেখানে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট স্মারক নম্বরে অন্য একজনের হলফনামা নিবন্ধিত রয়েছে। পরে তদন্তে বিচারকের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে ওই নথি তৈরি করার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৬৫, ৪৬৬, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় মামলা হয়েছে।

স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া সমন তৈরি : ঢাকার আদালতে বিচারকের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া সমন তৈরির আরেকটি ঘটনা ধরা পড়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর চার বাসিন্দার ক্ষেত্রে। তাদের কাছে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নামে একটি সমন পাঠানো হয়। সেখানে শাহবাগ থানার একটি মামলার কথা উল্লেখ করে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ভুক্তভোগীরা আদালতে আবেদন করলে নথি যাচাই করে দেখা যায়, ওই মামলায় তাদের নামই নেই। এমনকি প্রসিকিউশন বিভাগের রিসিভ ও ডেসপাস শাখায়ও ওই সমনের কোনো রেকর্ড পাওয়া যায়নি। পরে আদালতের পক্ষ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, বিচারকের সিল ও স্বাক্ষর জাল করে সমনটি তৈরি করা হয়েছে।

ভাড়ায় মেলে আসামি : আদালতকেন্দ্রিক জালিয়াতির আরেক চাঞ্চল্যকর চিত্র উঠে এসেছে উত্তরা পূর্ব থানার একটি প্রতারণা মামলায়। মামলার এজাহারভুক্ত এক নারী আসামির পরিবর্তে অন্য এক নারী আদালতে আত্মসমর্পণ করে কারাগারে যান। জামিন শুনানির সময় বাদীপক্ষের আপত্তির পর বিষয়টি আদালতের নজরে আসে। পরে আদালতের নির্দেশে তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, আত্মসমর্পণকারী নারীর পরিচয় ভিন্ন। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তিনি প্রকৃত আসামির আত্মীয় এবং টাকার বিনিময়ে প্রকৃত আসামির পরিবর্তে আদালতে হাজির হয়েছিলেন। তদন্তে জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি ও তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

যেভাবে চলছে জালিয়াতি কারবার : আদালতসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, আদালতের আশপাশের কিছু ফটোকপির দোকানকে কেন্দ্র করে এই চক্রের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রথমে কম্পিউটারে নথির খসড়া তৈরি করা হয়। এরপর বিভিন্নভাবে সংগ্রহ করা বিচারকের স্বাক্ষর, সিল ও নথির তথ্য ব্যবহার করে তৈরি করা হয় জাল কাগজ। অভিযোগ রয়েছে, আদালতের কিছু অসাধু কর্মচারীর মাধ্যমে আসল নথির নমুনা, স্মারক নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে এসব জাল নথি সরবরাহ করা হয় গ্রাহক বা দালালদের কাছে।

বিচারিক কার্যক্রম ডিজিটাইজেশন করার তাগিদ : বিচারসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আদালতের নথি জালিয়াতি ঠেকাতে দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। প্রতিটি সমন, পরোয়ানা ও আদালতের আদেশে কিউআর কোড যুক্ত করা, অনলাইন ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালু করা এবং আদালত প্রাঙ্গণের ফটোকপির দোকানগুলো নজরদারির আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। তাদের মতে, বিচারকের স্বাক্ষর ও আদালতের সিল জাল করা কোনো সাধারণ প্রতারণা নয়। এটি পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার ওপর আঘাত। তাই এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, আদালতকেন্দ্রিক জালিয়াতি ও প্রতারণা বন্ধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো বিচারিক কার্যক্রমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত (এন্ড-টু-এন্ড) ডিজিটাইজেশন। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও বলছে, প্রযুক্তিনির্ভর ও স্বয়ংক্রিয় সেবা চালু হলে মধ্যস্বত্বভোগী ও প্রতারকচক্রের সুযোগ অনেকটাই কমে যায়।

তিনি বলেন, বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল করা, ভুয়া ওয়ারেন্ট, সমন, হলফনামা বা অন্যান্য আদালতের নথি তৈরি হওয়ার ঘটনা শুধু অপরাধই নয়, এতে পুরো বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব চক্রের কারণে বিচার বিভাগ এক ধরনের জিম্মি অবস্থার মধ্যে আছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এ কারণে বিচার বিভাগকেই উদ্যোগ নিয়ে তাদের সেবা ও কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে যারা এ ধরনের জালিয়াতি চক্রের সঙ্গে জড়িত, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যার টেকসই সমাধান হলো এন্ড-টু-এন্ড ডিজিটাইজেশন।

যা বললেন পিপি : এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী যুগান্তরকে বলেন, বিচারকের সিল-স্বাক্ষর জাল বা আদালতের নথি জালিয়াতির কোনো ঘটনা আমাদের নজরে এলে সঙ্গে সঙ্গে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এ ধরনের ঘটনায় ইতোমধ্যে একাধিক মামলাও হয়েছে।

তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। তদন্তে যদি আদালতসংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সমস্যা নিরসনে নিয়মিত অভিযান চালানো হবে কি না জানতে চাইলে পিপি বলেন, এটি নিয়মিত অভিযান চালিয়ে বন্ধ করার বিষয় নয়। কোনো অভিযোগ বা মামলা হলে তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কঠোর শাস্তিই এ ধরনের অপরাধ কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।