Image description

রাজধানীর শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ডকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে উল্লেখ করে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার ৪১ আসামির বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, নির্যাতন, ষড়যন্ত্র, জেনোসাইডের (গণহত্যা) মতো অপরাধের দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব আসামির মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ পলাতক ৩০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

আর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন এমন ১১ আসামিকে আগামী ১৬ আগস্ট ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশনের আবেদনে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল এ আদেশ দেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ১৯ জুলাই চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে এ মামলার ‘খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন’ দেয়। যাচাইবাছাইয়ের পর গতকাল ‘আনুষ্ঠানিক অভিযোগ’ আকারে দাখিল করা হয়। পরে তা ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

আদেশের পর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা আজকে মূলত দুটি ঘটনার ওপর চার্জ দিয়েছি। একটি হচ্ছে শাপলা চত্বরে ৫ তারিখ (২০১৩ সালের ৫ মে) মধ্যরাতে যে নারকীয় ঘটনা ঘটল সেখানে ৩২ জন শহীদ হয়েছেন। এটি আমাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনের ৩(গ) ধারা মোতাবেক জেনোসাইড ছিল। পরের দিন (২০১৩ সালের ৬ মে) যেটা নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আরও ২০ জন মানুষকে একত্রে শহীদ করা হলো। সেটাও একটা জেনোসাইড ছিল। এ দুটি জেনোসাইডের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দুটি চার্জ আমরা ৪১ জন আসামির বিরুদ্ধে এনেছি।’ চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনার মূল নায়ক হিসেবে কাজ করেছেন।

ম্যাটিকুলাস প্ল্যানের মধ্যে তার প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল এবং তিনি পরবর্তীতে বিভিন্ন মিডিয়াতে বলেছেন, তার বিভিন্ন রেকর্ড আছে। তিনি বলেছিলেন যে, হেফাজতের কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটে নাই। রং মেখে তারা অভিনয় করেছে। এরকম কথা তিনি নিজ মুখে বলেছিলেন।’ ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের সমাবেশে নির্বিচার গুলি চালিয়ে শতাধিক কর্মী হত্যার কথা উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ দেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক। অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। গত বছর ১৪ মে ১২ জন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলার তদন্তে নেমে ঢাকাসহ দেশের চার জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৮ জনকে হত্যার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।গত ৫ মে এক ব্রিফিংয়ে এ ৫৮ জনেরই পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন চিফ প্রসিকিউটর। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এ মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, আবদুর রাজ্জাক, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, সাংবাদিক মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রুপা। বিভিন্ন বাহিনীর কর্মকর্তাদের মধ্যে আসামি করা হয়েছে র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান, মো. মজিবুর রহমান, পুলিশের সাবেক আইজি এ কে এম শহীদুল হক ও ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল।

এ মামলায় পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, জাহাঙ্গীর কবির নানক, হাছান মাহমুদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মৃণাল কান্তি দাস, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক এমপি সালাউদ্দিন মাহমুদ, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজীর আহমেদ, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মো. মোখলেছুর রহমান, শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন, মনিরুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন, আশরাফুজ্জামান, এস এম মেহেদী হাসান, হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, এস এম শিবলী নোমান ও বি এম ফরমান আলী এবং গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ইমরান এইচ সরকার।