Image description

দীর্ঘ ১৭ বছরের লড়াই-সংগ্রামের পর গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। এর ফলে স্বস্তি ফিরেছে বিএনপি নেতাকর্মীসহ দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে। হামলা-মামলা, নির্যাতনের শিকার হয়ে ঘরবাড়ি ছাড়া নেতাকর্মীরাও এখন ফিরেছেন নিজ নিজ এলাকায়। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যে নিয়ন্ত্রণ, আধিপত্য বিস্তারে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। যা নিয়ে একের পর এক সংঘর্ষ, অস্ত্রের মহড়া ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। নির্বাচন ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ের মাত্র ৫ মাসেই দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রাণ হারিয়েছেন ২৪ জন।

সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর কাফরুলে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ। একই ঘটনায় থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুর রহমানও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। একই দিনে রাজধানীর কদমতলীতে শামসুদ্দিন খান নামে বিএনপির এক স্থানীয় নেতাকে ছরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা। বিএনপি নেতাকর্মীদের অভিযোগ, এসব ঘটনার প্রত্যেকটির সঙ্গেই স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ নেয়া, আধিপত্য বিস্তারের মতো বিষয় জড়িত। তাদের আশঙ্কা সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন রয়েছে- এই নির্বাচনে প্রার্থী যারা হতে চান এবং হতে পারেন এমন পক্ষ বিপক্ষের মধ্যে ইতোমধ্যে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার ঘটনা ঘটছে এবং সামনের দিনে আরো বড় আকার ধারণ করতে পারে। আবার এর কোন কোনটিতে বাইরের ইন্ধনও থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। এজন্য এখনই দল এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর অবস্থান নেয়ার দাবি জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, একই দল এবং একই নেতৃত্বের অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও সংঘাতের পেছনে ব্যক্তিস্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার, অর্থনৈতিক প্রভাব, চাঁদাবাজি এবং অবৈধ সুবিধা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতাই বেশি ভূমিকা রাখছে। রাজনৈতিক পরিচয় অনেক ক্ষেত্রে আড়াল হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে স্বার্থের দ্বন্দ্ব। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, তার বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দিতে হবে। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগেই সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার রোধ করে নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব।

সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনা বিশ্লেষণ ও খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানী কিংবা রাজধানীর বাইরে যেসব এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কারখানা কিংবা আবাসন ব্যবসা রয়েছে এমন এলাকাতেই বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের প্রবণতা বেশি রয়েছে। এসব এলাকার ব্যবসা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, দখল ও আধিপত্য বিস্তার থেকেই সংঘাতের ঘটনা ঘটছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পদ-পদবি নিয়েও দ্বন্দ্ব-কোন্দল হচ্ছে। এই সংঘাত সামলাতে গিয়ে চরম উদ্বেগে পড়েছে দলটির হাইকমান্ড।

সহিংসতার মাত্রা ও প্রাণহানি মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন ও নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১১৯টিরও বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এই সময়ে শুধু নিজেদের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও বলয়কেন্দ্রিক কোন্দলেই দলটির ২৪ জন নেতাকর্মী ও সমর্থক প্রাণ হারিয়েছেন। এসব সংঘর্ষে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ১ হাজার ৫৮৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

এইচআরএসএসের রিপোর্ট অনুযায়ী, নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতার প্রায় ৯৪% ঘটনাই সংঘটিত হয়েছে বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- শিল্পাঞ্চলভিত্তিক এলাকাগুলোয় (গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, চট্টগ্রাম) পোশাক কারখানার ঝুট ব্যবসা এবং স্ক্র্যাপের নিয়ন্ত্রণ নেয়া নিয়ে সবচেয়ে বেশি সশস্ত্র মহড়া ও সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। বালুমহাল, অটোস্ট্যান্ড, পশুর হাট ও ফুটপাতের চাঁদাবাজি নিজের বলয়ে রাখতে অনুসারীদের নিয়ে মহড়া দেয়া ও অস্ত্র প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা গেছে। বিগত দিনে রাজপথে থাকা ত্যাগী নেতাদের পাশাপাশি নতুন পদপ্রার্থীদের বলয়কেন্দ্রিক বিভাজন থানা ও উপজেলা পর্যায়ের সংগঠনে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ডেকে এনেছে। রাজনৈতিক প্রভাব জাহির করতে ককটেল হামলা ও আগ্নেয়াস্ত্রের উন্মুক্ত প্রদর্শনী সহিংসতাকে দ্রুত প্রাণঘাতী রূপ দিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর মিরপুরে। আর বেশিরভাগ ঘটনার পক্ষে-বিপক্ষে সংশ্লিষ্টতা মিলছে জাতীয়তাবাদী যুবদলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের।

এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না বলেন, যেসব এলাকায় এসব ঘটনা ঘটছে সেগুলো বেশিরভাগই ব্যবসানির্ভর। এখানে ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকে, প্রভাব বিস্তারের বিষয় কাজ করে। তবে অন্যায় যে করবে তার বিরুদ্ধে পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যেই বলেছেন যে, দলের পদ-পদবী ব্যবহার করে কোন ধরনের অন্যায়-অপকর্ম করার সুযোগ নেই এবং করলেও পার পাবে না। যুবদল সভাপতি বলেন, এখানে পুলিশ ও প্রশাসনকে হার্ড লাইনে যেতে হবে। দল যেহেতু পদ-পদবী ব্যবসার করে এমন কাজ অনুমোদন করে না, সেখানে তাদের উচিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আর দলের পক্ষ থেকে আমরা সব সময়ই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকি।

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা : গত ২৫ জুলাই ফেনীর ছাগলনাইয়ায় আধিপত্য বিস্তার ও বালু ব্যবসার বিরোধকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে উপজেলা বিএনপির নেতা রিয়াজ উদ্দিন মজুমদার টিপু গুলিবিদ্ধ হন। ৭ জুলাই রাজধানীর মিরপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম সিজু গুরুতর আহত হন। গত ১৩ জুন চট্টগ্রামের রাউজানে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে। ৮ জুন রাজধানীর মৌচাক আনারকলি মার্কেটের সামনে ছুরিকাঘাতে রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন তালুকদার নিহত হন।

যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম ও তার অনুসারীদের সঙ্গে একটি মারামারির ঘটনা সালিশ করতে গেলে তারা স্বেচ্ছাসেবক দলের ওই নেতাকে ছুরিকাঘাত করে। ২১ মে খুলনা ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ে ঢুকে যুবদল নেতা মাসুম বিল্লাহসহ দুজনকে গুলি করা হয়। গত ২৮ এপ্রিল নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হন সাইফুল ইসলাম শাকিল ও বিএনপি নেতা এম আলাউদ্দিন। গত ৩ এপ্রিল রাজধানীর কোতোয়ালি থানাধীন পুরান ঢাকার নয়াবাজার পার্ক এলাকায় গুলিতে আহত হন যুবদল নেতা রাসেল। ১৬ মার্চ খুলনায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন যুবদল নেতা রাশিকুল আনাম রাশু। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর রামপুরা বনশ্রী এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জুয়েল সরদার আহত হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর রাজনীতির মাঠে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে দলীয় শৃঙ্খলা পুরোপুরি ফিরিয়ে আনতে কেবল সাময়িক বহিষ্কারই যথেষ্ট নয়, বরং অপরাধের জন্য কঠোর আইনি বিচার নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় অর্থনীতি ও চাঁদাবাজির উৎসগুলো বন্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ভূমিকা রাখা জরুরি। তা না হলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এটি আরো বড় আকার ধারণ করবে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, দল কিংবা দলের কারো নাম ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, কোন ধরনের অন্যায় বিএনপি কখনোই অনুমোদন করে না। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে বিএনপি সরকার গঠনের পর যত ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে সেগুলো যাচাই-বাছাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আগামীতেও যারাই অন্যায়-অপকর্মে জড়িত হবে তাদের বিরুদ্ধেও দল কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।