Image description
বিচারক সংকট আপিল বিভাগে

দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে প্রধান বিচারপতিসহ দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র চারজন বিচারপতি। অথচ বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার। ফলে একজন বিচারপতির কাঁধে গড়ে সাড়ে ৯ হাজারেরও বেশি মামলার চাপ পড়েছে।

আপিল বিভাগে কতজন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করবেন সে ব্যাপারে সাংবিধানিক বা আইনগতভাবে কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলেও এ বিভাগে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারপতির দায়িত্ব পালনের নজির রয়েছে। 

মাত্র একটি বেঞ্চ দিয়ে আপিল বিভাগের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক, ফৌজদারি, দেওয়ানি ও রিভিউ আবেদন নিষ্পত্তি দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে। আইনজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়বে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা ছিল ৩৮ হাজার ৭১৩টি। এর মধ্যে ফৌজদারি মামলা ১৭ হাজার ৬১টি এবং দেওয়ানি মামলা ২১ হাজার ৬৫২টি। গত সাড়ে তিন মাসে এ সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বর্তমানে আপিল বিভাগে চারজন বিচারপতি দায়িত্ব পালন করায় একজন বিচারপতির ওপর গড়ে প্রায় ৯ হাজার ৬৭৮টি মামলার চাপ রয়েছে।

বর্তমানে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি মো. রেজাউল হক, বিচারপতি এস এম এমদাদুল হক এবং বিচারপতি ফারাহ মাহবুব। সংবিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ায় গত ১৫ জুলাই আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম অবসরে গেছেন। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি অবসরে যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার মাত্র দুই সদস্যের আপিল বেঞ্চ বসেছে। ফলে সেদিন অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিই গ্রহণ করা যায়নি। ২০২৫ সালের ২৪ মার্চ বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি ফারাহ মাহবুবকে আপিল বিভাগে নিয়োগ দেওয়া হয়। এদিকে আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যা বাড়ানো এবং বিশেষায়িত বেঞ্চ গঠনের দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

গত বুধবার আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবের মাধ্যমে তিনি এ চিঠি পাঠান। আইনজীবীদের মতে, আপিল বিভাগে একটি মাত্র বেঞ্চ থাকায় গুরুত্বপূর্ণ মামলা দ্রুত শুনানির সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক মোহাম্মদ আলী বলেন, একটি বেঞ্চ দিয়ে বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। ফলে বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। আপিল বিভাগে দ্রুত বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মামলাজট কমাতে দ্রুত আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে আপিল বিভাগে একটি বেঞ্চ বসছে, যেখানে একসময় তিন বেঞ্চেও বিচারকাজ পরিচালিত হতো। ফলে বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। চূড়ান্ত বিচার পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

১১ বিচারপতি ও তিন বেঞ্চের নজির : সংবিধানে আপিল বিভাগে বিচারপতির কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে সর্বোচ্চ ১১ জন বিচারপতি দায়িত্বরত ছিলেন। ২০২২ সালের ১২ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আপিল বিভাগের আটজন বিচারককে নিয়েই তিনটি বেঞ্চ পুনর্গঠন করে বিচারকাজ পরিচালনা করেছিলেন। তখন তিনটি বেঞ্চে বিচারকাজ পরিচালিত হওয়ায় মামলা নিষ্পত্তিতে গতি পেয়েছিল বলে জানান আইনজীবীরা। সুপ্রিম কোর্টের ২০২৪ সালের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি ছিলেন।

তখন বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৬০টি। ২০১১ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ১০ জন। বিচারাধীন মামলা ছিল ১২ হাজার ৪৪১টি। ২০১৩ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ১০ জন। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৩৩৮টি। ২০১৭ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ৯ জন। সে সময় বিচারাধীন মামলা ছিল ১৬ হাজার ৫৬৫টি। ২০২২ সালে বিচারপতির সংখ্যা ছিল ৯ জন। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৯ হাজার ৯২৮টি। ২০২৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৩১ হাজার ১২০টিতে দাঁড়ায়। এখন এ সংখ্যা ৩৮ হাজার ছাড়িয়েছে।