Image description
গাজী নজরুল কেলেঙ্কারি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের দলীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। এরপরই রাজনৈতিক অঙ্গন ও আইনজ্ঞ মহলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে একটি প্রশ্ন- দল থেকে বহিষ্কার হলে কি একজন সংসদ সদস্যের পদও স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়?

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন বলছে, শুধু দলীয় বহিষ্কারের কারণে কোনো সংসদ সদস্যের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয় না। অন্যদিকে, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনিরের দাবি, সংবিধান অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকার সুযোগ নেই।

এদিকে বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সাংবাদিকদের বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার হলেই সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায় না। বিষয়টি সংবিধান ও আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। সংসদ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় রেফারেন্স বা সিদ্ধান্ত এলে নির্বাচন কমিশন আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে। তার ভাষ্য, নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব উদ্যোগে কোনো সংসদ সদস্যের পদ শূন্য ঘোষণা করার সুযোগ নেই।

অন্যদিকে এডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দলত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে ঘটেছে দল থেকে বহিষ্কার। দলীয় সিদ্ধান্ত এবং বহিষ্কারের কারণ বিবেচনায় গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকার সুযোগ নেই। তিনি আরও জানান, জামায়াত আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশন ও স্পিকারকে বহিষ্কারের বিষয়টি অবহিত করেছে।

আইনজ্ঞদের ভিন্নমত: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দল থেকে পদত্যাগ করলে অথবা সংসদে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হতে পারে। তবে দল কর্তৃক কোনো সদস্যকে বহিষ্কার করা হলে সেই ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে কি না, সে বিষয়ে সংবিধানে স্পষ্ট কোনো ভাষা নেই। এ কারণেই বিষয়টি নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে।

সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ এবং দল কর্তৃক বহিষ্কারÑ দু’টি পৃথক বিষয়। তাই সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হওয়ার প্রশ্নে সংবিধানের ব্যাখ্যা, সংসদের অবস্থান এবং প্রয়োজন হলে আদালতের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু একজন সংসদ সদস্যের বহিষ্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা, দলীয় শৃঙ্খলা এবং সংসদ সদস্যদের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির সৃষ্টি করতে পারে।

সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, জামায়াত তাকে দল থেকে বহিষ্কার করলেও তার এমপি পদের কিছু হবে না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দল থেকে বহিষ্কারের জন্য তার এমপি পদ যাওয়ার কথা নয়। একই মত দেন নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু। তিনি মানবজমিনকে বলেন, দল থেকে বহিষ্কার হওয়ায় গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্যপদ চলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের স্পিকার কিংবা নির্বাচন কমিশনেরও তেমন কিছু করার সুযোগ নেই। কারণ, সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে কোন কোন পরিস্থিতিতে একজন সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হবে।

শুধু দলীয় সিদ্ধান্ত বা বহিষ্কারের ভিত্তিতে তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার প্রশ্নই আসে না।” তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দল কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সেই সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্যপদ বাতিলের কারণ হয় না। সংসদ সদস্যপদ বহাল থাকা বা শূন্য হওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সংবিধান ও প্রচলিত আইনের বিধান দ্বারা নির্ধারিত হয়।

তবে এ বিষয়ে ভিন্নমত দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এডভোকেট মামুন মাহবুব। তিনি বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কারের পর গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকার সুযোগ নেই। তার ভাষ্য, “জামায়াতে ইসলামী তাদের সিদ্ধান্তে বলেছে, গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। একইসঙ্গে দলটি নির্বাচন কমিশন ও জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে। সে বিবেচনায় আমি মনে করি, তার আর সংসদ সদস্য হিসেবে বহাল থাকার সুযোগ নেই।” তিনি আরও বলেন, “জাতীয় সংসদ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। এর মর্যাদা ও পবিত্রতা অক্ষুণ্ন রাখতে বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল করা উচিত।”

ব্যবস্থা নিতে স্পিকার- সিইসিকে জামায়াতের চিঠি:
এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত স্পিকার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে চিঠি দিয়েছে জামায়াত। চিঠিতে দলটি জানিয়েছে, সাংগঠনিক তদন্তে তার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পরিপ্রেক্ষিতে পরিচালিত সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ২২শে জুলাই আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি অবগতির জন্য জানানো হলো এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হচ্ছে।