সম্প্রতি ১১ দলীয় ঐক্যের বরিশাল বিভাগীয় সমাবেশে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘‘গণভোট ব্যর্থ হলে এই সরকারকেও ব্যর্থ করে দেওয়া হবে।’’ তার মতে, গণভোটের রায় নিয়ে সরকার ভুল পথে আছে। এ পথ পরিহার করে গণভোটের রায় দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিতে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘‘২৫ জুলাই সিলেটের সমাবেশের আগেই এ দাবি মেনে নিন, অন্যথায় ঢাকায় মহাসমাবেশের জন্য প্রস্তুত থাকুন।’’
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের বিষয়ে একই সমাবেশে জামায়াত আমিরের সুরেই কথা বলেছেন দলটির অন্যতম শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। সরকারের কোনও সিদ্ধান্ত কিংবা কর্মকাণ্ডে অনিয়ম বা ভুলত্রুটি হলে সংসদীয় বিরোধী দল তার যৌক্তিক সমালোচনা করতে পারে। কিন্তু জামায়াত আমিরের এমন বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—তাঁর এই বক্তব্য কতটা যুক্তিসঙ্গত, জামায়াত কীভাবে সরকারকে ব্যর্থ করবে? ২৫ জুলাই সিলেটের সমাবেশের আগে যদি জামায়াতের দাবি মেনে না নেওয়া হয়—তাহলে ঢাকায় দলটির মহাসমাবেশে কী ঘোষণা আসবে? জামায়াত কি বড় কোনও আন্দোলনের পথে যাবে? এক্ষেত্রে জামায়াতের সক্ষমতাই বা কতটুকু? তারা কী সত্যিই সরকারকে বড় কোনও ধাক্কা দিতে পারবে, নাকি আমিরের বক্তব্য কেবল কথার কথা? রাজনৈতিক মহলে এ নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘গণভোটের বিষয়টি পরে আসি। বিরোধী দল হিসেবে সংসদ বাণিজ্যচুক্তি ও বাজেট নিয়ে তেমন জোরালো ভূমিকা রাখতে পারেনি তারা। এখন আবার জুলাই সনদ ও গণভোট নিয়ে মাঠ গরম করতে চায়। আমরা মনে করি, গণভোটে রাষ্ট্রপতির নামে যে ধরনের অধ্যাদেশ দেওয়া হয়েছে, তা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ বিদ্যমান সংবিধান তো স্থগিত করা হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের পর তো এটি বাতিলও করা হয়নি। তাই সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ‘রাজনীতি’ করছে। আর এখানে জামায়াতের যে অবস্থান, সেটিও বিতর্কিত। তবে আমরা মনে করি—তারা যদি হুঙ্কার দিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে পারে, সেটা ভালো কথা। কিন্তু বাস্তবে দলটির সে ধরনের সামর্থ্য আছে বলে মনে হয় না।’’
জামায়াত আমিরের হুঁশিয়ারি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সরকারকে বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘‘সরকার স্বাধীন বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও নির্বাচন কমিশন চায় না। তারা আগের ফ্যাসিবাদী ধারায় সব কিছু রাখতে চায়। এ জন্যই গণভোটের রায় মানতে চায় না। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই—এ রায় বাংলার মাটিতে বাস্তবায়ন হবেই।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘জনগণকে অপমান করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। ৭০ শতাংশ মানুষ যে রায় দিয়েছে, তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। আমরা সংসদে ও রাজপথে লড়াই করবো। সংসদে দাবি আদায় হলে ভালো, আর না হলে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করা হবে। একবিন্দুও ছাড় দেওয়া হবে না।’’
জামায়াত আমির বলেন, ‘‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নে কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। কোনও টালবাহানা মেনে নেওয়া হবে না। আমাদের অনেক লোভ দেখানো হয়েছে, কিন্তু আমরা তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি। জনগণের সঙ্গে আমরা বেইমানি করবো না, তাদের রায়কে অপমান করবো না। যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে জনগণ গণতন্ত্র ও নির্বাচনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা হারাবে। সেই ধিক্কারের পাত্র বিরোধীদল হতে চায় না।’’
সরকারকে কড়া সতর্কতা নাহিদের
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে বরিশালে ১১ দলীয় ঐক্যের একই সমাবেশে সরকারকে কড়া সতর্ক করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘‘গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না হলে আবারও গণঅভ্যুত্থানের মতো কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবেন। এখনও হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়নি। তবে প্রয়োজনে যেকোনও সময় এমন কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হবে।’’ নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপির চেয়ারম্যান গণভোট ও জুলাই সনদের পক্ষে প্রচারণা চালালেও নির্বাচনের পর এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।
প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে এনসিপি'র আহ্বায়ক বলেন, ‘‘দেশের জনগণ আপনাকে ক্ষমতা দিয়েছে, তার মানে এই নয় যে যা খুশি তা-ই করবেন।’’ জাতীয় নির্বাচনের আগ পর্যন্ত বিএনপির আন্দোলন নিয়ে তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি মূলত গণতন্ত্রের জন্য নয়, ক্ষমতার জন্য আন্দোলন করেছে।’’
সরকারকে ব্যর্থ করতে জামায়াতের পরিকল্পনা কী
জামায়াত সরকারকে কীভাবে ব্যর্থ করবে জানতে চাইলে দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যজোটের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ক্ষমতার মালিক জনগণ, আর গণভোটের রায় দিয়েছে জনগণ। এই গণরায় যদি মেনে নেওয়া না হয় তাহলে জনগণ তো কোনোভাবেই মেনে নেবে না। ক্ষমতায় কে আছে সেটা জনগণ দেখবে না। মালিক যদি ইচ্ছে করে তাহলে প্রতিনিধি পাল্টে ফেলতে পারে। ’’
তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি গণভোটের রায়কে প্রত্যাখ্যান করে জাতির সঙ্গে বেইমানি করেছে। জনগণের মূল্যবান রায় বাস্তবায়নের জন্য জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১ দল সংসদের পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলন করে যাচ্ছে। আমরা এ বিষয়ে আগেও বলেছি, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা না হলে আমরা (জামায়াত) জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মাঠে নামবো। সরকারের উচিত কোনও ধরনের টালবাহানা না করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা।’’
জামায়াত আমিরের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘‘জামায়াত আমির তো ভুল কিছু বলেননি। গণভোট যদি ব্যর্থ হয়, জনগণের রায় যদি কার্যকর না হয়—তাহলে জনগণ তো প্রতিরোধ গড়ে তুলবেই। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান তার সাক্ষী। জনগণ চাইলে সবকিছু সম্ভব। সেহেতু সরকারের উচিত সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত সময়ের মধ্যে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা।’’
আমিরের বক্তব্যকে কীভাবে দেখছে বিএনপি?
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্যের বিষয়ে লক্ষীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সরকারদলীয় হুইপ এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘এই সংসদ হলো জামায়াত আমিরের ভাষায় ‘মজলুমের সংসদ’। এখানে যারা আছেন, সবাই গত ১৭ বছরে কোনও না কোনোভাবে নির্যাতিত। এখানে সংসদ সদস্য আরমান সাহেবের মতো মানুষ আছেন, যিনি ৮ বছর গুম ছিলেন। এখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী আছেন, যিনি আয়নাঘরে ছিলেন। এখানে মিনিমাম ১৫ জন এমপি আছেন, যারা গুম হয়েছেন। ওনার কথা ধরেই আমি বলবো, এটা মজলুমের সংসদ। অতএব, উনি জ্ঞানী মানুষ, ওনার একটা বিরাট দায়িত্ব। আমি বিশ্বাস করি, এই দায়িত্ব উনি পালন করবেন।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘রাজনীতির মাঠে অনেকে অনেক কথা বলেন, উনিও অনেক কথা বলেন। কিন্তু অবশ্যই উনি জাতীয় ঐকমত্য যেটা সবাই চাচ্ছেন, উনি চাচ্ছেন, আমরাও চাচ্ছি। উনি নিজেই সুন্দর বনের মধু ঠোঁটে লাগিয়ে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। অতএব, আমি মনে করি এগুলো মাঠের কথা। এগুলো আমাদের সংসদকে কার্যকর করার জন্য যে ভূমিকা, মানুষের আকাঙ্ক্ষার যে সংসদ, সেই সংসদে একজন সত্যিকারের বিরোধীদলের নেতা হিসেবে উনি ভূমিকা রাখছেন এবং আগামী দিনেও রাখবেন, এটাই আমি বিশ্বাস করি।’’
অপরদিকে জামায়াতের আমিরের বক্তব্যকে ভিন্নভাবে দেখছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘বিরোধীদলীয় নেতা নিজেদের দাবি আদায়ে যেকোনও বক্তব্য দিতে পারেন। তবে কোনও কিছুই যেন বাড়াবাড়ির পর্যায়ে না যায়, সেদিকেও খেয়াল রাখা উচিত।’’ তিনি জামায়াত আমিরের বক্তব্যকে রাজনৈতিক হিসেবেই দেখতে চান।
বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘‘গণভোট, জুলাই সনদ সবগুলোর ব্যাপারেই সরকার পজিটিভ। কিন্তু বিরোধী দল কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না যে এগুলো সরকার প্রতিষ্ঠা করবে। এটা বিরোধী দলের সমস্যা।’’ জামায়াত আমিরের বক্তব্যের বিষয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘‘বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান সাহেব একটু আগ বাড়িয়েই কথা বলছেন বলে আমার ধারণা। উনি ধৈর্যহারা হচ্ছেন। আর ওনার যদি এত ক্ষমতা থাকে বা থাকতো, তাহলে তো উনিই সরকারই গঠন করতেন।’’