Image description

আবারও মুখরোচক বিতর্কিত মন্তব্য করে রাজনৈতিক পাড়ায় তুমুল আলোচনার জন্ম দিলেন সড়ক, রেল ও নৌপথের দণ্ডমুণ্ডর কর্তা শেখ রবিউল আলম রবি। নির্বাচনের আগে দেওয়া বড় বড় প্রতিশ্রুতির বেলুন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে নিজের মুখেই ফুটো করে দিয়ে তিনি প্রমাণ করলেন, ভোটের মাঠে ‘ওয়াদা’ আর ক্ষমতার মঞ্চে ‘ফায়দা’ এক জিনিস নয়।

মাঠের গরম বক্তৃতা যে ক্ষমতার মসনদে যাওয়ার স্রেফ ‘মনোহরণী অভিনয়’ হতে পারে, তা তার চেয়ে সাবলীলভাবে আর কেই-বা স্বীকার করতে পারতেন!

জল, স্থল আর রেলপথের এই বিশাল ত্রিমাত্রিক সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে যে সত্যটি অবলীলায় উগরে দিলেন, তা শুনে রসিকজনদের মুখে চওড়া হাসি ফুটলেও সচেতন মহলে তা রীতিমতো এক মুখরোচক কৌতুকের জন্ম দিয়েছে। নির্বাচনী মাঠে গরম গরম যে ‘ওয়াদা’ তিনি অকাতরে বিলিয়েছিলেন, ক্ষমতার মসনদে বসে এখন তা স্রেফ জনমত গঠনের কৌশল বলে উড়িয়ে দিতে তার ঠোঁট কাঁপেনি। সংসদে দাঁড়িয়ে অবলীলায় জানিয়ে দিলেন, নির্বাচনের আগে কত কথাই তো বলতে হয়!

এর আগে মন্ত্রী হয়েই পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজির নতুন তত্ত্ব হাজির করেছিলেন এই শেখ রবিউল আলম। বলেছিলেন, লোকজন নাকি সমঝোতা করেই চাঁদা দেয়! এরপর থেকে চাঁদাবাজির আরেক নাম হয়েছে ‘সমঝোতার চাঁদাবাজি’।

এই রবিউল আলমের মন্ত্রিত্ব পাওয়ার গল্পটাও রূপকথার চেয়ে কম রোমাঞ্চকর নয়। তিনি একাধারে ক্ষমতাসীন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং দলের চেয়ারম্যানের বৈদেশিক নীতি সংক্রান্ত পরামর্শক কমিটির সদস্য। বিএনপি ক্ষমতায় আসার আগেই এক হত্যাকাণ্ডে আলোচনায় আসেন তিনি। তার ব্যক্তিমালিকানাধীন আবাসন প্রতিষ্ঠান ‘প্লিজেন্ট প্রপার্টিজে’র নির্মাণ করা একটি ভবনের ফ্ল্যাট সংক্রান্ত বিরোধের জেরে প্রাণ হারান জমির মালিক, যিনি আবার ছিলেন বেসরকারি টেলিভিশন দীপ্ত টিভির এক কর্মকর্তা। চাঞ্চল্যকর সেই হত্যা মামলার ৩ নম্বর আসামি হিসেবে নাম আসতেই ঝড়ের বেগে দলে তার দলীয় পদ স্থগিত করে বিএনপি। কিন্তু ক্ষমতার অলৌকিক হাওয়ায় ঢাকা-১০ আসনের টিকিট পেতে তার কোনো বেগ পেতে হয়নি। এমনকি জাতীয় নাগরিক পার্টির আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এই আসনে প্রস্তুতি নিয়েও রবিউলের ভয়েই নাকি আর নির্বাচনের পথে পা বাড়াননি।

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীকে হারিয়ে রবিউল আলম পৌঁছে গেলেন সংসদে। এরপর রীতিমতো লটারি জেতার মতো এক হাতে তিন মন্ত্রণালয়ের চাবি চলে এলো তার পকেটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে পড়াশোনা করা রবিউল আলমের এই অভাবনীয় যোগাযোগ দেখে অনেকেই তখন চমকে গেছেন। সমালোচকরা টিপ্পনী কেটে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গণযোগাযোগ’ আর সড়ক, রেল বা নৌপথের ‘পরিবহণ যোগাযোগ’ যে এক জিনিস নয়, তা সম্ভবত প্রধানমন্ত্রীকে বোঝানোর ফুসরত মেলেনি।

তবে পড়াশোনার বিষয়টিতে যে রবিউল আলম বেশ ‘দক্ষ’ তা তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন। অনর্গল কথা বলার পারদর্শিতায় টেলিভিশনের টক শোতে তথ্য-উপাত্তের তুবড়ি ফুটিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করায় তার জুড়ি মেলা ভার। এই বাকপটুতার জাদুতে তিনি এতটাই বুঁদ হয়ে থাকেন যে, মাঝে মাঝে বেফাঁস কথা বলে নিজের জালেই নিজে জড়িয়ে পড়েন।

মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েই নিজের সেই ‘দক্ষতা’ দেখাতে গিয়ে হাজির করেছিলেন ‘চাঁদাবাজি তত্ত্ব’।  চাঁদার ওপরেও যে এমন ‘নান্দনিক’ প্রলেপ দেওয়া যায়, তা সম্ভবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের সিলেবাসেও ছিল না।

সেই একই ‘যোগাযোগের জাদুতে’ এবার সংসদে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিলেন তিনি। নির্বাচনের আগে মাঠের জনসভায় গলা কাঁপিয়ে বলেছিলেন, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশের বড় বড় সেতুর টোল পুরোপুরি মওকুফ করে দেওয়া হবে। ঘটনাচক্রে দল ক্ষমতায় এলো এবং সেই সেতু বিভাগের দেখভালের দায়িত্বও তার নিজের কাঁধেই বর্তালো। কিন্তু টোল মওকুফের তো কোনো নামগন্ধই নেই, উল্টো আগের মতোই নিয়ম করে টাকা উসুল চলছে।

সোমবার সংসদের ভেতরে এক সংসদ সদস্য যখন সেই প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন, তখনই বেরিয়ে এলো তার আসল ‘কমিউনিকেশন স্কিল’। একটুও না ঘাবড়ে, মিষ্টি হেসে রবিউল আলম জানিয়ে দিলেন, ‘নির্বাচনের আগে টোল মওকুফের কথা বলেছি। হয়তো জনমত গঠনের জন্য বলেছি, নির্বাচিত হওয়ার স্বার্থে বলেছি।’

নির্বাচনের আগে জনমত গড়তে, নির্বাচিত হতে কত সত্য-মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিতে হয়, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ওসব ধরে বসে থাকলে কি আর সরকার চলে?

শেখ রবিউল আলমের এমন অদ্ভুত রাজনৈতিক রসায়নে জনগণ এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে—ভোটের সময় নেতার মুখের মিষ্টি কথা আসলে সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় তিতা ওষুধ!