যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে একের পর এক হামলা-পাল্টা হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো এলাকা। মার্কিন বাহিনী টানা তিন রাতের ভারী বিমান হামলার জবাবে পাল্টা আঘাত হেনেছে ইরান। কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং নৌবহর লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, গত শনিবার ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় নৌ-অবরোধ আরোপের নির্দেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হওয়া এই অবরোধের ফলে ইরানের বন্দরে কোনো জাহাজ প্রবেশ বা বের হতে পারবে না।
অবরোধ ঘোষণার পাশাপাশি মার্কিন বিমানবাহিনী ইরানের উপকূলীয় সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে দেশজুড়ে ব্যাপক হামলা চালায়। বুশেহর, চাবাহার, জাস্ক, কোনারাক, আবু মুসা, বন্দর আব্বাসসহ ইরানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। প্রথমবারের মতো এবার ইরানের নৌঘাঁটিতে অত্যাধুনিক সি-ড্রোন ব্যবহার করেও হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের পাল্টা আঘাত ও ট্রাম্পের টোল বিতর্ক
মার্কিন হামলার জবাবে আইআরজিসি জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এ ছাড়া বাহরাইনের জুফাইর সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন স্থাপনা ও উপগ্রহ যোগাযোগ কেন্দ্র এবং কুয়েতে মার্কিন নৌবহরে ড্রোন ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। হরমুজ প্রণালিতে ওমানের উপকূল ঘেঁষে যাওয়ার সময় আমিরাতের দুটি সুপারট্যাঙ্কার স্টল্ট ম্যাগনেসিয়ামসহ অন্য একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। হামলায় এক ভারতীয় নাবিক নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন।
এদিকে হরমুজ দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প। তিনি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র হবে হরমুজ প্রণালির অভিভাবক। এই জলপথ দিয়ে যাতায়াতকারী সব পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে টোল বা ফি দিতে হবে।
ট্রাম্পের এই হুমকির জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক্সে লিখেছেন, ‘হরমুজের অভিভাবক ইরানই ছিল এবং চিরকাল থাকবে। আর ২০ শতাংশ ফি বড্ড বেশি, আমরা হলে ন্যায্য ফি নিতাম।’
অন্যদিকে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘মার্কিন আগ্রাসনের মাধ্যমে হরমুজ কখনোই উন্মুক্ত করা যাবে না।’
পারমাণবিক কেন্দ্রে হামলার হুমকি
সংঘাতের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরানের মাটির নিচে অবস্থিত গোপন পরমাণু কেন্দ্র পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে খুব শিগগিরই হামলা চালানো হবে। এর জবাবে তেহরানের এক শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে আঘাত করে, তবে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক।
এদিকে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক ধাক্কায় ৯ থেকে ৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৭ ডলার ৪৯ সেন্টে গিয়ে ঠেকেছে, যা গত এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। যুক্তরাষ্ট্রেও হু-হু করে বাড়ছে গ্যাসের দাম।
যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধাস্ত্রের সংকট ও অভ্যন্তরীণ চাপ
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যুদ্ধে পেন্টাগন বড় ধরনের সামরিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়েছে। সামরিক বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মার্ক ক্যানসিয়ান জানিয়েছেন, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে তাদের মজুত প্যাট্রিয়ট ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের এক-তৃতীয়াংশ থেকে অর্ধেক পর্যন্ত ব্যবহার করে ফেলেছে। প্রতিবছর মাত্র ৬০০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি হয়, যার ফলে নতুন অর্ডারের জন্য চার-পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে।
এখন পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং চারশর বেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ট্রাম্প কংগ্রেসকে চিঠি দিয়ে এই সামরিক অভিযানকে সীমিত ও স্থলবাহিনী ছাড়া চলছে বলে জানিয়েছেন। তবে নভেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কংগ্রেসে ট্রাম্পের এই যুদ্ধংদেহী নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ তীব্র হচ্ছে।