চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা না ফেরার প্রশ্নটি আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তিনি ‘শিগগিরই’ দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সভাপতি এবং মানবতাবিরোধী মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত শেখ হাসিনার এমন ঘোষণা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা ও নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা এ বক্তব্য ঘিরে এর সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে যুগান্তরের কাছে ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন করছেন। বিশ্লেষকদের কেউ এটিকে রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত হিসাবে দেখছেন। আবার কেউ মনে করছেন, এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থান বা কৌশলগত বার্তা। যার মধ্য দিয়ে তিনি মূলত তার দলের নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে চান। প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে এসে সক্রিয়ভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার বাস্তব কোনো সম্ভাবনা আপাতত নেই।
অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, শুধু বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার জন্যই বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে ফিরে আসতে হবে। কারণ যে পরিস্থিতিতে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল, সেটি ছিল ব্যাপক জনঅসন্তোষ ও গণপ্রতিরোধের প্রেক্ষাপট। ফলে এখন তার দেশে ফিরে রাজনীতি করার বাস্তবতা নেই। যদিও আওয়ামী লীগ নেতাদের দাবি, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রশ্নে মামলা বা বিচারিক প্রক্রিয়া কোনো বাধা নয়। কারণ অতীতেও তিনি নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই দেশে ফিরেছেন। এবারও ‘রাজনৈতিকভাবে’ থামিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়টিকে দুভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সময় যে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল এবং যার ফলে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা ছেড়ে দেশ ত্যাগ করতে হয়েছিল, সেই শক্তিগুলোর মধ্যে বর্তমানে কিছুটা অনৈক্য ও দূরত্ব দৃশ্যমান। বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপিসহ যেসব রাজনৈতিক শক্তি তখন একটি অভিন্ন অবস্থানে ছিল, কিন্তু তাদের মধ্যে এখন মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে। আমার ধারণা, এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সামনে রেখেই এসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না যে শেখ হাসিনার দেশে ফিরে এসে সক্রিয়ভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। বরং এটি একটি রাজনৈতিক অবস্থান বা কৌশলগত বার্তা। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বা এ ধরনের বার্তা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে মনোবল জোগানোর একটি প্রচেষ্টা হিসাবে কাজ করতে পারে। তিনি যখন বলেন, ‘আমি ফিরব’ বা ‘আমি আবার মানুষের কাছে যাব’, তখন তা তার সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশাবাদ বা উদ্দীপনা তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিকভাবে এটিই সম্ভবত এ ধরনের বক্তব্যের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।
লেখক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, যদি শেখ হাসিনা দেশে ফিরে বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন, তাহলে সেটি শুধু একটি আইনি ঘটনা হবে না; বরং বড় ধরনের রাজনৈতিক ঘটনাও হবে। একদিকে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা তার মুক্তির দাবি তুলতে পারেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো কঠোর শাস্তির দাবি জানাতে পারে। ফলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকার একটি জটিল অবস্থার মুখোমুখি হতে পারে। একদিকে তাদের বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বাধীনতা ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক চাপও সামাল দিতে হবে। আবার আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতি নজর বৃদ্ধি পাবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হবে।
তিনি আরও বলেন, যদি এর মধ্যে সরকার জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। কিন্তু জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক ও জনমতের পরিবর্তনের ক্ষেত্রও তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা আমি খুব একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখছি না। কারণ, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই অসংলগ্ন ও বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে আসছেন। দেশের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী কিংবা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন, যিনি কখনো তার বক্তব্যের লক্ষ্যবস্তু হননি। ফলে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য কতটা, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
তিনি আরও বলেন, তবে তিনি যদি সত্যিই দেশে ফিরে রাজনীতি করতে চান, তাহলে একজন রাজনীতিবিদ হিসাবে দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানো উচিত। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে আদালতের মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু ‘ফিরে এসে দেখিয়ে দেব’ এ ধরনের বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেয় না। যদিও এটিই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। এছাড়া তিনি মনে করেন, ভারতেরই উচিত বন্দি বিনিময় চুক্তি মেনে তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দেশের মানুষ শেখ হাসিনাকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে এনে বিচারিক প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর দেখতে চায়। রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, হাসিনা কোন প্রেক্ষাপটে দেশত্যাগ করেছিলেন সেটা নিশ্চয় সবার স্মরণ আছে। জনগণের বিরুদ্ধে তিনি যে অত্যাচার-নির্যাতন করেছেন হাজার হাজার নিরীহ, নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছেন, আহত করেছেন, পঙ্গু করেছেন তার বিচার এখনো হয়নি। এর জন্য তিনি ক্ষমাও চাননি। যে জনরোষে তিনি পালিয়ে গেছেন সেই জনরোষ এখনো বিদ্যমান রয়েছে। কাজেই জনগণ তার প্রত্যাবর্তন নয়, আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত পেতে চায়। মানুষ তার সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর দেখতে চায়। হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, কেউ যদি ভিন্ন উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে, তাহলে জনগণ সেই অপচেষ্টা প্রতিহত করবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনা স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় দেশ ছাড়েননি; তাকে বাধ্য হয়ে দেশ ছেড়ে যেতে হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ছাত্র-জনতা তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। এরপর গত প্রায় দুই বছর ধরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কাছ থেকে আমরা বারবার শুনছি, তিনি শিগগিরই ফিরবেন, দেশে চলে আসবেন। কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে এসব বক্তব্যের খুব একটা মিল দেখা যায় না।
তিনি আরও বলেন, আমার মূল্যায়ন হলো, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আবারও আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দিয়ে সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরে আসার মতো নৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থান বর্তমানে নেই। কারণ যে পরিস্থিতিতে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে, সেটি ছিল ব্যাপক জনঅসন্তোষ ও গণপ্রতিরোধের প্রেক্ষাপটে। ফলে দেশে ফিরে আগের অবস্থানে রাজনীতি করার বাস্তবতাও আমি দেখি না।
এদিকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার শেখ হাসিনাকে ফেরত চায় বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমরা অনুরোধ করেছি। এক্সট্রাডিশন (প্রত্যর্পণ) চুক্তি অনুসারেও অনুরোধ করেছি- আমরা শেখ হাসিনাকে ফেরত চাই। এবং আমরা চাই তিনি মামলা ফেস করুক। এখন যদি কেউ বলে আসতে চায়, আমরা তো তাকে (শেখ হাসিনাকে) চাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান সম্প্রতি তার ব্যক্তিগত ইউটিউব চ্যানেলে এ বিষয়ে এক ভিডিও বক্তব্যে দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্দোষ প্রমাণিত হলে আওয়ামী লীগ নিজ নামেও ফিরতে পারে। কিন্তু শেখ হাসিনার মাথা উঁচু করে দূরে থাক, মাথা নিচু করেও এদেশে ফিরে আসার সম্ভাবনা আসলে নেই। মাঝে মাঝে তাকে দিয়ে কথাগুলো আসলে বলানো হয়। এটা একটা কৌশলের অংশ। সেই হিসাবে তিনি এগুলো বলেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে যদি ভবিষ্যতে কোনদিন আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো নামেও হয়, সেটা শেখ পরিবারকে বাদ দিয়েই হয়তো হতে হবে। শেখ হাসিনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রিভাইভ করা হবে এবং বাংলাদেশে এসে তার রাজনীতি করার প্রশ্নই আসে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে বিদেশে অবস্থানরত কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন-শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথে মামলা বা বিচারিক প্রক্রিয়া কোনো বাধা নয়। অতীতেও তিনি একাধিকবার নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে দেশে ফিরেছেন। ফলে এবারও সঠিক সময়েই দেশে ফিরবেন।