সৌহার্দ ও সম্পর্কোন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে বিজেপি সরকারের নানা সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে তিক্ততা ক্রমেই বাড়িয়ে চলেছে। ঈদুল আজহার ছুটিতে পশ্চিমবঙ্গের হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে কথিত ‘বাংলাদেশি’ হিসাবে এখন পর্যন্ত ৬০ জনকে পুশইন করা হয়েছে। পরিচয় যাচাই করার জন্য আরও অন্তত ৯০ জনকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকে বহু বছর ধরে ভারতে বসবাস করলেও নানা জটিলতায় তারা সেখানকার নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার পাননি। অভিযোগ উঠেছে, এমন অনেককে ‘বাংলাদেশি’ হিসাবে সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। অনেককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ‘হোল্ডিং’ সেন্টারে রেখে মানসিকভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরো বিষয়টি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে নতুন করে বাধা সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি সীমান্তে নতুন করে তৈরি হবে অস্থিরতা। কারণ একদিকে বিষয়টিতে মানবাধিকারও বিঘ্নিত হচ্ছে। অন্যদিকে এ দেশে জনমনে ছড়িয়ে পড়ছে ক্ষোভ। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এসব কর্মকাণ্ডে দুদেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
ভারতের দিক থেকে অনেক আগে থেকেই অবৈধ অভিবাসীদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হচ্ছিল। সেটি মূলত বাংলাদেশ থেকে আসা ভারতে বসবাসরত নাগরিকদের বিষয়ে ইঙ্গিত করা হয়। তবে বিষয়টি আলোচনায় নতুন মাত্রা পায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী নির্বাচিত হওয়ার পর। তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে জয়ী হওয়ার পরপরই কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। এরই অংশ হিসাবে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, পুশইন ইস্যুটিকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে তিক্ততা বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে দুই দেশেরই যুক্তি ও মানবিকতা দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও গবেষক ব্রিগেডিয়ার জে. মো. বায়েজিদ সরোয়ারের (অব.) মতে, পুশইনের মতো সংবেদনশীল পদক্ষেপের মাধ্যমে ভারত এক ধরনের চাপ বজায় রাখছে। এসব কর্মকাণ্ড দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্থিরতা ও আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। সম্পর্কোন্নয়নের বদলে তিক্ততা ও অসন্তুষ্টি বাড়তে পারে।
ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম এনডিটিভির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, সীমান্ত ইস্যুটিকে কোনো প্রতীকী ঘোষণা দিয়ে নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও ফলাফল-ভিত্তিক উপায়ে সমাধান করতে হবে।
দেশটিতে এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো জানায়, অমিত শাহ বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, শুধু প্রচারের উদ্দেশে কোনো ‘অর্ধসমাপ্ত’ অভিযান চালানো যাবে না। প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে আইনগতভাবে টেকসই, কূটনৈতিকভাবে সতর্ক এবং কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর (বিএসএফ) শীর্ষ কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছেন। এতে জোর দেওয়া হচ্ছে তাড়াহুড়ো করে বা যত্রতত্র জোরপূর্বক ফেরত না পাঠিয়ে, প্রকৃত অনুপ্রবেশকারীদের নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার ওপর।
প্রতিবেদন মতে, অমিত শাহ কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছেন; যেন এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া হয় যা ভারত-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্কে অপ্রয়োজনীয় ফাটল ধরায়। অতীতে যথাযথ যাচাই-বাছাই না করে বা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া কথিত অনুপ্রবেশকারীদের ‘পুশব্যাক’ করার কারণে ঢাকা তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল, যা অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এবার কৌশল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নয়াদিল্লি এমন একটি প্রক্রিয়া চাইছে যেখানে অনুপ্রবেশকারীদের সঠিকভাবে শনাক্ত ও নথিবদ্ধ করার পর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, আন্তর্জাতিক বিতর্ক এড়িয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা। কর্মকর্তারা স্বীকার করছেন যে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একই সঙ্গে মানবিক, ভূরাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জও বটে।
কলকাতার একটি কূটনৈতিক সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছে, যাদেরকে এখন বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাদের বেশির ভাগ মুসলমান। মূলত বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এবং নানা জটিলতায় এখনো ভারতের নাগরিকত্ব না পাওয়া মুসলমানরাই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে সীমান্তে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
সূত্রটি আরও জানায়, বাংলা ভাষাভাষী এসব মানুষ মূলত শ্রমজীবী। বন্যা, নদীভাঙন এবং দারিদ্র্যের কারণে তারা ভারতে গিয়েছিলেন। তারা নাগরিকত্ব সঠিকভাবে প্রমাণ করতে পারছেন না। কিন্তু এসব মানুষ পশ্চিমবঙ্গ এবং ভারতের অন্যান্য রাজ্য থেকে চলে যেতে বাধ্য হলে ভবিষ্যতে দেশটিতে শ্রমজীবী মানুষের সংকট দেখা দিতে পারে।
হুমায়ুন কবির এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, অবৈধ অভিবাসী হিসাবে যাদের চিহ্নিত করা হয়, তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য কূটনৈতিক পদ্ধতি আছে। সেটি দুই দেশের সরকারের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে করা যেতে পারে। বর্ডার এলাকায় হলে বর্ডার গাইডলাইন্স আছে সেভাবেও করা যেতে পারে। অনেককে ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার তথ্যও এসেছে। সেখানে তাদের তথ্য-উপাত্ত দেখে বাংলাদেশি প্রমাণিত হলে তাদের আমরা ফেরত নেব। কিন্তু তাদের যদি ভারতীয় হিসাবে প্রমাণ করা না যায় তাহলে তাদের আমরা কেন নেব?
হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্তে বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে পুশইন বা বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলে মনে করেন ব্রি. জে. মো. বায়েজিদ সরোয়ার (অব.)। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ভারত সরকার কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের প্রতি বিভিন্ন ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। বাংলাদেশকে এখন ভারতের সঙ্গে দৃঢ় কূটনীতির মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবিলা বা সমাধান করতে হবে। বিজিবিকে কঠোর ও সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে।