গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় সরকারি গাছ নিলামের নামে ভুয়া সিডিউল ও জাল পে-অর্ডার দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ চাঞ্চল্যকর অভিযোগটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নয়, বরং খোদ দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধেই এনেছেন দলটির বর্তমান রোকন সদস্য নিজেই।
অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেন পলাশবাড়ী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জামায়াত মনোনীত বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক। আর এই দুর্নীতির খতিয়ান ও বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ্যে এনেছেন উপজেলা ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি এবং জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান রোকন (সদস্য) মো. তাজুল ইসলাম মিলন।
ঘটনাটি পলাশবাড়ী উপজেলার কিশোরগাড়ী ইউনিয়নের। সগুনা জামে মসজিদ থেকে মেঘার মোড় পর্যন্ত রাস্তার দুই পাশে লাগানো ৭৮০টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও জামায়াত আমির আবু বক্কর সিদ্দিক প্রভাব খাটিয়ে লোকদেখানো টেন্ডারের মাধ্যমে গাছগুলো নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করেন। অথচ এসব গাছের প্রকৃত মূল্য প্রায় কোটি টাকা, যা বিক্রি করা হয়েছে মাত্র ৩৩ লাখ টাকায়।
তদন্তে বেরিয়ে আসা সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো কিশোরগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ ও কথিত ‘মামা-ভাগ্নে সমবায় সমিতি’র মধ্যে ২০০৬ সালে সম্পাদিত চুক্তিনামার স্ট্যাম্প যাচাই করে দেখা যায়, ব্যবহৃত ১০০ টাকার স্ট্যাম্প বিক্রি হয়েছে ২০২৩ সালের আগস্টে এবং ৫০ টাকার স্ট্যাম্পগুলো বিক্রি হয়েছে ২০২২ সালের মে মাসে, অর্থাৎ চুক্তির ১৭ বছর পর স্ট্যাম্প বিক্রি হয়েছে। এতে পুরো চুক্তিনামাটি জাল বলেই ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিলামে অংশগ্রহণের জন্য নয়টি সিডিউল বিক্রির কথা বলা হলেও তদন্তের সময় উপস্থিত ছিল মাত্র ছয়টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান লিখিতভাবে জানায়, তারা কোনো সিডিউল কেনেনি এবং দরপত্রেও অংশ নেয়নি।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মামা-ভাগ্নে সমবায় সমিতি’নামে একটি প্রতিষ্ঠানের আবেদন দেখিয়ে গাছ বিক্রির পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। অথচ সমবায় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ নামে কোনো নিবন্ধিত সমবায় সমিতির অস্তিত্ব নেই। উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, এমন কোনো সমিতির সন্ধান তারা পাননি।
তারপরও ওই কথিত সমিতির কাগজপত্র ব্যবহার করে গাছ নিলামের আবেদন করা হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে। সমিতির বৈধতা যাচাই ছাড়াই ২০২৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি গাছের মূল্য নির্ধারণে বন বিভাগকে চিঠি দেন তৎকালীন ইউএনও কামরুল হাসান। পরে ২০২৫ সালে তৎকালীন ইউএনও জগৎবন্ধু মন্ডল চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের নিলাম কমিটি গঠন করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনিও সমিতির বৈধতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি।
নিলাম কমিটির সদস্য হিসেবে নাম থাকলেও উপজেলা সমাজসেবা ও যুব উন্নয়ন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা গাছ নিলাম সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।
এত অনিয়ম ও প্রশ্নবিদ্ধ নিলাম প্রক্রিয়ার পরও ‘মাহবুব ট্রেডার্স’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গাছ কেটে নেয়। পরে স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসক তদন্তের নির্দেশ দিলেও তদন্ত প্রতিবেদনে জাল চুক্তিনামার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।
এতে ভুয়া সমিতি ও জাল চুক্তিনামার বিষয়ে বক্তব্য নিতে গেলে হামলার শিকার হন একাত্তর টেলিভিশনের পলাশবাড়ী প্রতিনিধি পাপুল সরকার। অভিযোগ রয়েছে, কথিত সমিতির সভাপতি আতিয়ার রহমান ও তার সহযোগীরা সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়ে ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন ছিনিয়ে নেন।
অভিযোগকারী সাবেক শিবির সভাপতি ও জামায়াত রোকন মো. তাজুল ইসলাম মিলন জানান, পলাশবাড়ী উপজেলা জামায়াতের আমীর এবং দলটির মনোনীত ইউপি চেয়ারম্যান ক্ষমতার অপব্যবহার করে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই হরিলুট চালিয়েছেন। নিলাম প্রক্রিয়ার নিয়ম-কানুন তোয়াক্কা না করে, সম্পূর্ণ ভুয়া সিডিউল তৈরি এবং ব্যাংকের জাল পে-অর্ডার প্রদর্শন করে তারা সরকারি মূল্যবান গাছ কেটে নিয়েছেন। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তা পকেটস্থ করা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, আদর্শিক রাজনীতির আড়ালে এমন বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় সম্পদ লোপাটের ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দলের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ উদ্ধারের স্বার্থেই তিনি এই সত্যটি জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন এবং এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছেন।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও জামায়াত আমির আবু বক্কর সিদ্দিকের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
জেলা প্রশাসক বলেছেন, ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে গাছ কাটার ঘটনা অপরাধের শামিল। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য, সমবায় সমিতি ও চুক্তিনামাকে সরাসরি ভুয়া বলার সুযোগ নেই।
অভিযোগ ওঠার পর থেকেই স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক অঙ্গন ও সর্বসাধারণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। দলটির ভেতরের এই প্রকাশ্য কোন্দল এবং কোটি টাকার দুর্নীতির খবর এখন ‘টক অব দ্য ডিস্ট্রিক্টে’ পরিণত হয়েছে।
সাধারণ মানুষ ও সচেতন নাগরিক সমাজ অনতিবিলম্বে এই ‘গাছ লুটের’ ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় এনে রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুনরুদ্ধারের জোর দাবি জানিয়েছেন।