সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হককে জুলাই আন্দোলনের সময় যাত্রাবাড়ী থানার খোবাইব হত্যা মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
শনিবার (২৩ মে) দুপুরের পরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ্ ফারজানা হক শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
গত ১৬ মে এ আবেদন করেন যাত্রাবাড়ী থানার উপ-পরিদর্শক মো. ইব্রাহিম খলিল। নতুন এ মামলায় গ্রেপ্তারের আদেশ আসায় আপাতত খায়রুল হকের মুক্তি মিলছে না বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী মোনায়েম নবী।
শনিবার বেলা ১১টা ২০ মিনিটের দিকে তাকে হুইলচেয়ারে করে আদালতে তোলা হয়। শুনানি হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে তার আইনজীবীদের সাথে কথা বলতে দেখা যায়। গরম বেশি থাকায় তাকে কাগজ মোড়ানো পাখা দিয়ে বাতাস করেন এক আইনজীবী।
শুনানিতে দেরি হওয়ায় পরে বেলা ১১টা ৪৯ মিনিটের দিকে তাকে ফের আদালত থেকে সিএমএম কোর্টের হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে বিকেল ৩টায় আবারও পুলিশি পাহাড়ায় তাকে আদালতে তোলা হয়। ৩টা ১ মিনিটে বিচারক আদালতে উঠেন। তখন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক এ বিচারপতির মামলা সংশ্লিষ্টতা তুলে ধরেন। পরে শুনানি শেষে বিকেল ৩টা ২৪ মিনিটে এ তাকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেওয়া হয়।
আদালতে সাবেক এ বিচারপতির জামিনের বিরোধিতা করে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর পিপি ওমর ফারুক ফারুকী শুনানি করেন। তিনি আদালতে বলেন, যারা ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে বিভিন্ন সহযোগিতা করেছেন তার মধ্যে অন্যতম এ আসামি। পুরস্কার হিসেবে তিনি ২০১৩ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ছিলেন।
তিনি বলেন, এসব মামলার ক্ষেত্রে ঘটনার জায়গায় উপস্থিত থাকা জরুরি না। কেউ বিদেশে বসে জুম মিটিংয়ে থেকেও ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে সহায়তা করেছেন। এসব আসামিরা পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে সহায়তা করেছেন।
পিপি বলেন, আজকের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা সুনির্দিষ্ট তথ্য পেয়েছেন। এখন যদি আমরা বলি আজকের মামলায় তিনি কি ঘটিয়েছেন, সেটা পুলিশ রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত বলতে পারব না।
ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, তদন্তের অনেক বিষয়ে গোপনীয়তা রক্ষার ক্ষমতা তদন্ত কর্মকর্তার আছে। এই মামলায় তদন্ত করতে গিয়ে এজাহারনামীয় যারা আছেন তাদের তো পেয়েছেন। তদন্ত পর্যায়ে যেহেতু আছে তাকে এজন্য তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হোক।
অপরদিকে খায়রুল হকের আইনজীবী শামীম হায়দার পাটোয়ারী, ব্যারিস্টার মোস্তাফিজুর রহমান ও আইনজীবী মোনায়েম নবী গ্রেপ্তারের বিরোধিতা করে শুনানি করেন।
তারা আদালতকে বলেন, সাবেক বিচারপতি খায়রুল হকের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য থেকে অভিযুক্ত করার মতো কিছু নেই। এসব মামলার ক্ষেত্রে সময় ও তারিখটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই মামলায় যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নীচে বেলা ১১টার সময় ঘটনা ঘটেছে বলে দেখানো হয়েছে। একই সময়ে আদাবরে লিংক রোডে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আরেকটা মামলা আছে। একই টাইমে দুই যায়গায় কীভাবে থাকতে পারেন? এ পর্যন্ত সাতটা মামলায় জামিন পেয়েছেন। এটা তার আট নম্বর মামলা।
এছাড়াও শুনানিতে আইনজীবী ও জাপা মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, হাইকোর্টের আদেশ সবাইকে মানতে হবে। মামলার বাদী নির্দিষ্ট আসামির নাম দিয়ে করেছে। সেখানে অন্যান্য বলেননি। তাছাড়া একই সময়ে দুইটি মামলা হয়েছে।
আসামিপক্ষের জবাবে পিপি বলেন, এ ধরনের মামলায় সব আসামির উপস্থিতি থাকা লাগে না। তারা ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনাকারী ছিলেন। হাইকোর্টের আদেশের আগেই ১৬ তারিখ আবেদন করেছে সুতরাং হাইকোর্টের আদেশটি এ মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। এটা পরবর্তী মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
গ্রেপ্তারের আবেদন সূত্রে জানা যায়, এই মামলার তদন্তেপ্রাপ্ত আসামি এ বি এম খায়রুল হক। তিনি বর্তমানে আটক আছেন। এই মামলা তদন্তকালে উল্লিখিত আসামির মামলার ঘটনার সাথে জড়িত থাকার প্রাথমিক স্বাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষে তদন্তের স্বার্থে তামে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো একান্ত প্রয়োজন।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেন খোবাইব (২০)। যাত্রবাড়ী ওভারব্রিজের নিচে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থানের সময় মামলার আসামিদের আদেশে ও মদদে পুলিশ, র্যাবসহ অঙ্গসংগঠন যুবলীগ, ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবকলীগের অস্ত্রধারীরা একসাথে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর অতর্কিত গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে খোবাইব ঘটনাস্থলে মারা যান।
এ ঘটনায় মৃতের ভাই জোবায়ের আহম্মেদ বাদী হয়ে ২৪ সালের ১৬ নভেম্বর মামলা দায়ের করেন। এতে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, ওবায়দুল কাদেরসহ ৮০ জনকে আসামি করা হয়।
উল্লেখ্য, খায়রুল হককে সুনির্দিষ্ট মামলা ছাড়া গ্রেপ্তার না দেখানো এবং হয়রানি না করার জন্য হাইকোর্ট থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়। গত রোববার বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। একইসঙ্গে এ বিষয়ে রুলও জারি করেছেন আদালত।