Image description

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনার প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, তখন বিএনপির আইনজীবী ও চিকিৎসকরা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আজ যারা আন্দোলন ও অবরোধ করছে, তখন তাদের মাঠে দেখা যায়নি। যারা দেশে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে তারা কৃষকের কথা বলে না, খাল খননের কথা বলে না, গ্রামের শিশুর শিক্ষা কিংবা কৃষক কার্ডের কথা বলে না। তারা শুধু অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়।

শনিবার (২৩ মে) দুপুরে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ঐতিহাসিক ধরার খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন।

সম্প্রতি রাজধানীতে সংঘটিত একটি শিশুহত্যার ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের মাধ্যমে বিচার করতে হবে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, কিছু গোষ্ঠী এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করছে। রাস্তা অবরোধ, যানবাহন বন্ধ, আগুন ও উত্তেজনা সৃষ্টি করে তারা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নষ্ট করতে চাইছে। তারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত করছে।

তিনি আরও বলেন, অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হবে। খাল পুনঃখনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-খতিবদের সম্মানী, এমনকি শিশুদের স্কুল ড্রেস বিতরণ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হবে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে গ্রামের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জনগণ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। যারা মানুষের ভোটাধিকার ও কথা বলার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন দেশের মানুষ উন্নয়ন ও ভাগ্যের পরিবর্তন চায়। বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কাজে লাগাতে হবে। নতুন ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে। দেশ গড়তে হলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, ধরার খাল শুধু একটি খাল নয়, এটি এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। দীর্ঘদিন খালটি ভরাট ও অকার্যকর হয়ে থাকায় কৃষকরা সেচ সংকট, জলাবদ্ধতা এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন। প্রায় ৪৫ বছর আগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজে এই খাল খনন কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিলেন।

উপস্থিত প্রবীণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যাদের বয়স ষাটের বেশি, তাদের অনেকেরই সেই স্মৃতি এখনও মনে থাকার কথা। খাল পুনঃখনন সম্পন্ন হলে অন্তত ৪ হাজার ৩০০ কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

সরকারপ্রধান বলেন, পুরো ময়মনসিংহ জেলায় প্রায় আড়াই হাজার কিলোমিটার খাল রয়েছে, যেগুলো পুনঃখনন প্রয়োজন। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষিকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে এসব উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, আপনারা বিএনপিকে ভোট দিয়ে সরকার গঠন করেছেন। আমাদের লক্ষ্যই ছিল মানুষের উপকার করা। খাল খনন করলে কৃষক উপকৃত হবে, গ্রামের মানুষ উপকৃত হবে।

সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারীদের স্বাবলম্বী করতে পরিবারভিত্তিক ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে এবং সরাসরি মায়েদের হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে। একইসঙ্গে দেশের কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। তিনি জানান, দেশের প্রায় দুই কোটি ৬৫ লাখ কৃষকের কাছে পর্যায়ক্রমে এই কার্ড পৌঁছে দেওয়া হবে, যাতে তারা সরাসরি সরকারি সহায়তা পেতে পারেন।

তিনি বলেন, বিএনপি সরকার শুধু কৃষি নয়, শিক্ষা খাতেও গুরুত্ব দিচ্ছে। গ্রামীণ অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের জন্য নতুন স্কুল ড্রেস ও স্কুল ব্যাগ দেওয়ার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আগামী জুলাই মাস থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব বিতরণ করা হবে বলে তিনি জানান। তার ভাষ্য, গ্রামের ছোট ছোট শিশুরা যেন সুন্দর পোশাক পরে স্কুলে যেতে পারে, সেটাই সরকারের লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের মসজিদের ইমাম-খতিব, মাদ্রাসার শিক্ষক এবং অন্যান্য ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্যও সম্মানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধর্মীয় ব্যক্তিরা সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং তাদের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।

দেশের তরুণ সমাজের কর্মসংস্থানের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, দেশে অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ-তরুণী থাকলেও অনেকের কর্মসংস্থান নেই। এজন্য সরকার কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন নতুন টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হবে বলেও তিনি জানান।

তিনি বলেন, যেমন একটি সংসারে নানা সমস্যা থাকে, তেমনি একটি দেশেও নানা সমস্যা থাকে। এক দিনে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ২০ কোটি মানুষের এই বিশাল রাষ্ট্রে ধাপে ধাপে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়েই সরকার দেশ পরিচালনা করতে চায়।

খাল পুনঃখনন উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার এম ইকবাল হোসেইন, বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ত্রিশাল আসনের এমপি ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন, স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ, জনপ্রতিনিধি, কৃষক, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার হাজারো সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রী জাতীয় কবির ১২৭তম জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ত্রিশালের নজরুল মঞ্চে আয়োজিত জাতীয় অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন এবং তিন দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী। পরে ত্রিশালের নজরুল অডিটোরিয়ামে ময়মনসিংহ উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক সভায় যোগদান করবেন তিনি। এরপর সন্ধ্যায় সড়কপথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৬ সালের পর এবারই প্রথম জাতীয়ভাবে ত্রিশালে নজরুল জন্মজয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবকে কেন্দ্র করে নজরুল একাডেমি মাঠে বসেছে বিশাল গ্রামীণ মেলা ও নজরুল বইমেলা। পাঁচ শতাধিক স্টল বসানো হয়েছে সেখানে।