Image description

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে বসবাসরত অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ‘ডিটেক্ট’ ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট অর্থাৎ চিহ্নিতকরণ, বাদ দেওয়া ও বিতাড়ন নীতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) আওতাভুক্ত নন এমন অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করে সরাসরি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে তুলে দেওয়া হবে এবং তারা বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি’র সঙ্গে সমন্বয় করে তাদের নিজ দেশে নেবে।

দিল্লির একাধিক সূত্র খবরের কাগজকে জানান, এই মুহূর্তে ভারতের অগ্রাধিকার ইস্যু হচ্ছে অবৈধ অভিবাসীদের বের করে দেওয়া। দিল্লির এই অবস্থানের বাস্তবায়ন কী পশ্চিমবঙ্গ থেকেই শুরু হচ্ছে–এমন আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

ধারণা করা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়নের আগে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা আরও জোরদার করা দরকার। সে লক্ষ্যে সীমান্তের যেসব জায়গায় এখনো কাঁটাতারের বেড়া দিতে বাকি আছে সেগুলো দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। সে লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিএসএফের কাছে প্রয়োজনীয় বরাদ্দের জমিও হস্তান্তর করেছেন। কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ সম্পন্ন হলেই কি অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে? কা সংশোধনের সময় ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রায় ৯১ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেয়। এদের সবাইকে অবৈধ অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যদিও চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়া নিয়ে রাজ্যজুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। পাশাপাশি ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় নাগরিকত্ব নিবন্ধন (এনআরসি) কার্যকর হওয়ার আশঙ্কায় প্রান্তিক মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। ভোটার তালিকায় বাদ পড়াদের অনেকেই আইনের আশ্রয় নিয়েছেন। তবে বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু হলে সীমান্তজুড়ে বড় ধরনের ঝামেলা তৈরির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।  

 

যদিও ভারত সরকার এর আগে বিভিন্ন সময় অবৈধ বাংলাদেশি সন্দেহে সীমান্তে পুশব্যাক করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। তবে এবার সেই প্রক্রিয়ায় না গিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ায় বিতাড়নের ইঙ্গিত দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। যদিও নির্বাচনের আগে অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়নের অঙ্গীকার ছিল পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির। এবার পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় এসেই বিজেপির সেই এজেন্ডা বাস্তবায়নে জোর দিয়েছেন তিনি। এতে দিল্লিরও নাকি গ্রিন সিগনাল আছে। 

এদিকে অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়নের নামে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করার চেষ্টা করা হলে তা বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি হবে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। এ ক্ষেত্রে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে ফের জটিলতা সৃষ্টি হবে, নাকি আলোচনার দরজা খুলবে, সেটা সময় বলে দেবে। যদিও দিল্লির পক্ষ থেকে ভালো সম্পর্কের বার্তা দেওয়া হয় বিএনপি সরকারকে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাকে চিঠি দিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন এবং সপরিবারে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু ভারতের সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সৃষ্টি হওয়া সম্পর্কের টানাপড়েন নিরসনে এখনো উল্লেখযোগ্য আলোচনা শুরু করতে পারেনি ঢাকা-দিল্লি। এরই মধ্যে চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের গতি বাড়িয়েছে বর্তমান সরকার। এর মধ্যে অবৈধ অভিবাসী নিয়ে সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হলে ঢাকা-দিল্লি আলোচনার কাছাকাছি আসবে, নাকি সম্পর্কে আবারও জট লাগবে তা নিয়ে শংকা রয়ে গেছে। 

এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, অবৈধ অভিবাসী নিয়ে সীমান্তে উত্তেজনা তৈরি হলে তা ঢাকার জন্য অবশ্যই চাপ হবে। তবে সম্পর্ক ভালো চাইলে ভারত এটা করবে না। তিনি বলেন, অবৈধ অভিবাসী বিতাড়নের একটি আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়া আছে। ভারত আগের মতো পুশব্যাক এখন করতে পারবে না। তবে সম্পর্ক উন্নত করতে হলে উত্তেজনা না বাড়িয়ে সরকারি ও রাজনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু করা দরকার। তিনি বলেন, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক উন্নয়নে আলোচনার উদ্যোগে আমরা ঘাটতি দেখছি। দু’দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকা উভয়ের জন্যই জরুরি। কাজেই দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা শুরু হওয়া দরকার। তৃতীয় কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর মানে এই নয় যে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে হবে।

সম্প্রতি আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা পুশব্যাক নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করায় বাংলাদেশ প্রতিক্রিয়া জানায়। তিনি বলেন, আমি সব সময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যে পরিস্থিতি ড. ইউনূসের সময়ে যেমন ছিল, সেটাই যেন থাকে, সম্পর্কের উন্নতি যেন না হয়। হিমন্ত শর্মা পুশব্যাক প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা করা কঠিন। তাই আসামের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ রাত নামা পর্যন্ত অপেক্ষা করে এবং যখন সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কোনো সদস্য উপস্থিত থাকে না, তখন অন্ধকারের আড়ালে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে সীমান্তে নিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়। যদিও আসামেও অবৈধ অভিবাসী বিতাড়নের পক্ষে অবস্থান আসাম রাজ্য সরকারের।