ভারতের পাঞ্জাবে জাতীয় মহাসড়কের পাশে বসানো সিসিটিভি ক্যামেরাকে ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। পুলিশের দাবি, গোপনে বসানো ওই ক্যামেরায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর চলাচলের ওপর নজরদারি করা হচ্ছিল এবং সেই ভিডিও ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাকিস্তানে পাঠানো হতো। এ ঘটনায় এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তদন্তে সীমান্তপারের গুপ্তচর নেটওয়ার্কের ইঙ্গিতও মিলেছে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, পাঞ্জাবের পাঠানকোটে সন্দেহভাজন একটি গুপ্তচর চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশ। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর চলাচলসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য পাকিস্তানে পাঠানোর অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃত ওই ব্যক্তির নাম বলজিৎ সিং ওরফে বিট্টু। তিনি চাক ধাড়িওয়াল গ্রামের বাসিন্দা।
পুলিশ জানিয়েছে, পাঠানকোট-জম্মু জাতীয় মহাসড়ক-৪৪–এর একটি সেতুর কাছে থাকা দোকানে তিনি একটি সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন। সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনীর চলাচলের ওপর নজর রাখতেই এই ক্যামেরা স্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা দলজিন্দর সিং ধিল্লন জানান, ভারতীয় সেনাবাহিনীর ওপর ওই নজরদারির ভিডিও ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাকিস্তান ও বিদেশে অবস্থানকারী অপারেটরদের কাছে পাঠানো হচ্ছিল। জিজ্ঞাসাবাদে বলজিৎ সিং স্বীকার করেছেন, গত জানুয়ারিতে সুজানপুরের কাছে মহাসড়কের পাশের একটি দোকানে তিনি ইন্টারনেটভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়েছিলেন।
তিনি আরও জানান, দুবাইয়ে অবস্থানরত এক অজ্ঞাত ব্যক্তির কাছ থেকেও নির্দেশনা পাচ্ছিলেন। এ কাজের জন্য তাকে ৪০ হাজার রুপি দেয়া হয়েছিল। তার কাছ থেকে একটি সিসিটিভি ক্যামেরা ও ইন্টারনেট ওয়াইফাই রাউটার জব্দ করেছে পুলিশ।
মূলত পাঠানকোট-জম্মু মহাসড়কে সন্দেহজনক তৎপরতার তথ্য পাওয়ার পর পুলিশ এই অভিযান চালায়। এরপর সুজানপুর থানায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। বলজিৎ সিং ছাড়াও মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে বিক্রমজিৎ সিং ওরফে ভিক্কা, বলবিন্দর সিং ওরফে ভিকি এবং তরণপ্রীত সিং ওরফে তান্নুকে।
পুলিশের দাবি, তারা অপরাধমূলক ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুরো ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই চক্রের সীমান্তপারের যোগাযোগ ও অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে। অন্য অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযানও অব্যাহত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
এর আগে গত মাসেও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই–সমর্থিত দুটি গুপ্তচর চক্রের সন্ধান পাওয়ার দাবি করে পাঞ্জাব পুলিশ। সেসময় চীনে তৈরি সৌরশক্তিচালিত আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহার করে সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ভিডিও সরাসরি পাকিস্তানে পাঠানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
পরে জালন্ধরে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স উইং এক অভিযানে একজনকে গ্রেপ্তার করে। তার কাছ থেকে চীনে তৈরি সিসিটিভি ক্যামেরা, ইউএসবি-সংযুক্ত সৌর প্যানেল ও ফোর-জি সংযোগযুক্ত ডিভাইস উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে কাপুরথালা পুলিশ কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে যৌথ অভিযানে আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করে। তাদের কাছ থেকে বিদেশি অপারেটরদের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ফোন, সিম-ভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা এবং একটি ওয়াইফাই সেট উদ্ধার করা হয়।
পাঞ্জাব পুলিশের মহাপরিচালক গৌরব যাদব বলেন, এই চক্রগুলো কৌশলগতভাবে বিভিন্ন স্থানে সিম-ভিত্তিক ও সৌরশক্তিচালিত সিসিটিভি ক্যামেরা বসাচ্ছিল। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পর্যবেক্ষণ করে মোবাইল অ্যাপের সাহায্যে পাকিস্তানে থাকা অপারেটরদের কাছে সরাসরি ভিডিও পাঠানো হচ্ছিল।
তিনি বলেন, ‘চীনে তৈরি এই ক্যামেরাগুলো অফ-গ্রিড নজরদারির জন্য খুবই উপযোগী। এগুলো ফোর-জি সংযোগ ও সৌরশক্তিতে চলে, তাই প্রচলিত তারের প্রয়োজন হয় না।’
কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নাম সুখবিন্দর সিং ওরফে সুখা। তিনি ফিরোজপুরের সাহানকে গ্রামের বাসিন্দা। অন্যদিকে কাপুরথালার অভিযানে গ্রেপ্তারকৃত দুজন হলেন ফিরোজপুরের ডোনা মাট্টারের বাসিন্দা সোনা এবং ছাঙ্গা খুর্দ গ্রামের বাসিন্দা সন্দীপ সিং ওরফে সোনু।
জালন্ধারের কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স বিভাগের সহকারী পুলিশ মহাপরিদর্শক সিমরাতপাল সিং ধিন্ডসা জানান, সুখবিন্দর সিংকে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে একটি সিসিটিভি ক্যামেরা, সৌর প্যানেল ও একটি সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়।
কাপুরথালা মডিউল সম্পর্কে জেলার পুলিশ সুপার গৌরব তুরা জানান, সেনা ছাউনির আশপাশে নজরদারির গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মডেল টাউনের একটি দোকানে অভিযান চালানো হয়। গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা ওই দোকান ভাড়া নিয়ে কাছের একটি খুঁটিতে সিম-ভিত্তিক ক্যামেরা বসিয়েছিল, যাতে সামরিক বাহিনীর চলাচলের ওপর নজরদারি করা যায়।
গৌরব তুরা বলেন, পাকিস্তানভিত্তিক ‘ফৌজি’ নামে এক অপারেটর ক্যামেরা বসানোর জন্য অভিযুক্তদের ৩৫ হাজার রুপি দিয়েছিল। তিনি আরও জানান, সন্দীপ মাদক পাচারেও জড়িত ছিল। একই পাকিস্তানি অপারেটরের পাঠানো ড্রোনের মাধ্যমে আসা এক কেজি হেরোইন বিতরণের জন্য সে ৫০ হাজার রুপি পেয়েছিল।