ফেসবুকের নিউজফিডটা যেন হঠাৎই এক রাজনৈতিক অগ্নিগর্ভ উঠানে পরিণত হয়েছে। কেউ লিখছেন ‘লীগ ব্যাক’, কেউ বলছেন ‘লীগ কখনো যায়নি’, আবার কেউ তর্ক তুলছেন— আসলে ফিরে আসছে দল নয়, ফিরে আসছে পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এসবের শুরু একটি দীর্ঘ ফেসবুক পোস্ট দিয়ে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেছে, দেখো নাই?’ মাহফুজের এই লেখা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে হাজারো মানুষের টাইমলাইনে। অনেকে ভেবেছিলেন তিনি হয়তো সরাসরি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পুনরুত্থানের কথা বলছেন। কিন্তু পরে দীর্ঘ ব্যাখ্যায় মাহফুজ আলম জানিয়েছেন, তিনি আসলে একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ফিরে আসার কথা বলেছেন।
মাহফুজের ভাষায়, যেদিন ‘মব-স্টারদের হিরো বানানো হয়েছে’, যেদিন ‘২৪-কে ৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছে’, যেদিন বিভাজনের রাজনীতি নতুনভাবে জায়গা নিতে শুরু করেছে— সেদিন থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ছায়া আবার দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
মাহফুজের পোস্টে একটা হতাশার সুর ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে নতুন রাজনৈতিক স্বপ্ন, রাষ্ট্রসংস্কারের আশা আর পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তিনি মনে করছেন সেই স্বপ্ন ধীরে ধীরে পুরনো রাজনৈতিক আচরণে ডুবে যাচ্ছে। প্রতিপক্ষকে শত্রু ভাবা, সামাজিক বিভাজন, সাংস্কৃতিক লড়াই আর ‘মব’ সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক করে তোলাই শেষ পর্যন্ত পুরনো শক্তিগুলোর জন্য পথ তৈরি করছে—এমনটাই ছিল তার ইঙ্গিত।
মাহফুজের ওই পোস্টের নিচে বেশ কয়েকজন মন্তব্যও করেছেন। শামসুন নাহার হল সংসদের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমিও আছেন। যিনি শাহবাগ থানার সামনে ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোর কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই মাস জেল খেটেছেন। মন্তব্যের ঘরে তিনি লিখেছেন, ‘লীগ সেদিনই ব্যাক করসে, যেদিন ৩২ ভাংতে গেসিলা। লীগ সেদিনই ব্যাক করসে যেদিন এনসিপির কারণে গোপালগঞ্জে ৫ খুন হয়। এই দুইটা পয়েন্ট বাদ পড়সে।’ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও বর্তমানে জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার লেখেন, ‘উপদেষ্টাদের কারও কারও অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়টা মিস গেছে ভাই। ওইটা যদি একটু অ্যাড করতেন।’
গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মাহতাব উদ্দীন আহমেদ মাহফুজের পোস্টে মন্তব্যে লেখেন, ‘যে ইন্টেরিমের সমালোচনা এখন করছেন, তখন যখন আপনি নিজেও এই সরকারের অংশ ছিলেন, আপনি পদত্যাগ করেন নাই কেন— এইটার জবাবও কিন্তু পাওনা। যখন দেখলেন ইন্টেরিম উগ্র ডানপন্থীদের পেট্রন করছে, তখন তো আটকাতে না পারার ব্যর্থতা নিয়েই সততার সাথে ইন্টেরিম থেকে সরে যেতে পারতেন। সেটা না করে আপনি আপনার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাইছেন।’
এমন পরিস্থিতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরেক সাবেক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল যেন সেই বক্তব্যের উল্টো প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আওয়ামী লীগ ব্যাক করেনি। তারা ছিলই। ব্যাক করেছে তাদের দম্ভ, মিথ্যাচার আর মানুষকে বিভ্রান্ত করার দুঃসাহস।’
এ যেন একই বাস্তবতা, কিন্তু দুই ভিন্ন ব্যাখ্যা। মাহফুজ আলম যেখানে বর্তমান রাজনৈতিক প্রবণতার ভেতরে আওয়ামী লীগের পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনর্জন্ম দেখছেন, সেখানে আসিফ নজরুল বলছেন— বাস্তব রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের মতো কোনো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বরং এটি এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা, একটি রাজনৈতিক ‘হাইপ’।
এরপর যেন পুরো ফেসবুকই ভাগ হয়ে গেল দুই শিবিরে। ছাত্রশক্তির ঢাবি শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মোহাম্মদ সাকিব লিখেছেন, ‘লীগ ব্যাক’ আতঙ্ক তৈরি করাটাই আসলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখছে। তার মতে, মতের অমিল হলেই সবাইকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তুলনা করা, উদার গণতন্ত্রের কথা বলেও ব্যক্তিগত জীবনে ফ্যাসিবাদী আচরণ করা— এসবই পুরনো রাজনীতিকে আবার জায়গা করে দিচ্ছে।
একই সুরে কথা বলেছেন এনসিপি নেত্রী দিলশানা পারুলও। তিনি লিখেছেন, বাস্তব সংস্কারের বদলে যখন রাজনৈতিক শক্তিগুলো শুধু ‘বিপ্লবী রেটরিক’ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখনই আওয়ামী লীগের জন্য নতুন জায়গা তৈরি হয়। মুক্তিযুদ্ধ বনাম রাজাকার— এ পুরনো বিভাজনের রাজনীতিতে ফিরে যাওয়াকেও তিনি সেই পুরনো চক্রের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখছেন।
সাংবাদিক আনিস আলমগীর আবার প্রশ্ন তুললেন অন্য জায়গায়। তিনি লিখেছেন, জুলাই অভ্যুত্থানের যে সম্ভাবনা ছিল, তা বাস্তব রাজনৈতিক কৌশলের দুর্বলতা আর অদূরদর্শিতার কারণেই ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেছে। আজকের বিতর্ক সেই ব্যর্থতারই প্রতিফলন।
অন্যদিকে অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট মোহাম্মদ ইশরাক পুরো বিষয়টি দেখছেন ‘সফট পাওয়ার’-এর লড়াই হিসেবে। তার দাবি, আওয়ামী লীগ বাস্তবে ফেরেনি; বরং রাজনৈতিক অস্থিরতা আর বিভক্তির সুযোগ নিয়ে একটি মানসিক প্রভাব তৈরি করার চেষ্টা করছে। তিনি মনে করছেন, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মতো শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকলে আওয়ামী লীগের বাস্তব প্রত্যাবর্তন সহজ হবে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আইনুল ইসলাম যেন পুরো বিতর্কটিকে আরও বড় এক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। তার মতে, যখন নতুন কোনো গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প দ্রুত দৃশ্যমান হয় না, তখন মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পুরনো শক্তির কথাই আবার ভাবতে শুরু করে। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক দুর্বলতা আর সামাজিক মেরূকরণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। আর সেই অস্থিরতা থেকেই ‘আওয়ামী লীগ ফিরে আসছে’ ধরনের আলোচনা আবার গুরুত্ব পাচ্ছে।
আইনুল ইসলামের ভাষায়, এটি শুধু একটি দলের ফিরে আসার বিতর্ক নয়; বরং রাষ্ট্র ও রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের গভীর অনিশ্চয়তার বহিঃপ্রকাশ। জুলাই অভ্যুত্থানের পর মানুষ নতুন কিছু চেয়েছিল। নতুন রাষ্ট্রচিন্তা, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, নতুন ভাষা। কিন্তু সেই প্রত্যাশার স্পষ্ট রূপরেখা এখনো দৃশ্যমান না হওয়ায় নানা ধরনের গুঞ্জন, আশঙ্কা ও পাল্টা রাজনৈতিক বার্তা সামনে আসছে।
সময় যত গড়াচ্ছে, অনেকের কাছেই প্রশ্নটা তত স্পষ্ট হয়ে উঠছে— নতুন কিছু কি সত্যিই তৈরি হচ্ছে, নাকি পুরনো গল্পই শুধু নতুন নামে ফিরে আসছে?