উত্তরাঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা প্রকল্প বিএনপি সরকার বাস্তবায়ন করবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিজমিতে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এ পদ্মা ব্যারাজ করা হবে। অনেকে সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য অনেক কথা বলতে পারেন। কিন্তু বর্তমান সরকার আবারো অঙ্গীকার করছে, পদ্মা ব্যারাজ শুধু নয়Ñ বিএনপি সরকার তিস্তা প্রকল্পও বাস্তবায়ন করবে। গতকাল বুধবার গাজীপুরে জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উদ্বোধনের পর সুধী সমাবেশে তিনি এ অঙ্গীকার করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর সঙ্গে দুর্যোগও জড়িত। ভূগর্ভস্থ পানি শূন্য হচ্ছে, মাটির নিচে পানি থাকছে না, কৃষিকাজের জন্য কৃষক পানি পাচ্ছে না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি হিসেবে খালখনন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে সরকার। খালখনন কর্মসূচি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়; বরং কৃষি, দুর্যোগ ও ভূমিকম্পের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
তারেক রহমান বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসবে যা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। বাসস্থানের জন্য অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ হচ্ছে, গাছপালা কাটা যাচ্ছে। ফসলি জমি থাকছে না। যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট নির্মাণ হতে যাচ্ছে, সেখানে অনেকে দুর্যোগ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেবে। তিনি আরো বলেন, গরিব দেশ আমরা, সম্পদ কম। সম্পদকে রক্ষা করতে পারলে উন্নত দেশে উন্নীত করতে পারব। প্রকৃতিকে ঠিক রাখতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলা সম্পূর্ণভাবে করা যাবে না ঠিকই; কিন্তু দেশের মানুষ সচেতন না হলে প্রকৃতিকে বাঁচানো সম্ভব নয়।
তিস্তা প্রকল্পের কাজে সরকার হাত দেবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, আপনাদের সবার সামনে আজকে আমি পরিষ্কার একটি কথা বলে যাই, ইনশাআল্লাহ এই বিএনপি সরকার পদ্মা ব্যারাজের কাজেও হাত দেবে। ইনশাআল্লাহ তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পের কাজেও হাত দেবে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতি ইঙ্গিত করে বলে প্রধানমন্ত্রী বলেন. যারা বড় বড় কথা বলছে তাদের উদ্দেশে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, এই যে আজকে এখানে দুর্যোগমন্ত্রী (আসাদুল হাবিব দুলু) বসে আছেন, এই লোকটির নেতৃত্বেই তিস্তায় বিএনপি কর্মসূচি পালন করেছে যা বাংলাদেশে অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করেনি।
তারা হয়তো বড় বড় কথা বলেছে, গরম গরম কথা বলেছে; কিন্তু কাজ যদি কেউ করে থাকে, ডেলিভারি যদি কেউ করে থাকে, পরিস্থিতি যদি কেউ তৈরি করে থাকেÑ সেটি বিএনপিই করেছে, ইনশাআল্লাহ বিএনপি সেটি করবে। পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ জরুরি সে ব্যাখ্যা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা নিশ্চিত পত্রিকায় দেখেছেন, কয়েক দিন আগে আমরা একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, আমাদের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চলে বিশেষ করে রাজশাহীতে আমরা পদ্মা নদীর সাথে পদ্মা ব্যারাজ তৈরি করব। পদ্মা ব্যারাজ এজন্য আমরা তৈরি করব যে, সীমান্তের ওপারে তারা (ভারত) ব্যারাজ তৈরি করার মাধ্যমে বিভিন্নভাবে পানি তারা নিচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাছে যে পানিটি আসছে শুকনো মৌসুমে হয়তো আমরা কম পাচ্ছি। যার ফলে যেটি হচ্ছে, নদীতে পানি স্রোত কমে যাওয়ার ফলে অনেক সমস্যা হচ্ছে। আস্তে আস্তে নদীর আশপাশগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। আপনারা নিশ্চয়ই দেখেছেন, ছোটবেলায় আমরা দেখেছি পদ্মা নদীর এপার থেকে ওপার দেখা যায় না, এখনো দেখা যায় না। তবে তখন পানি ছিল, এখন পানিশূন্য। কেন আমরা পদ্মা ব্যারাজটি করতে চাচ্ছি?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা ব্যারাজটি আমরা এই জন্য করতে চাচ্ছি যে, বর্ষা এবং শুকনো মৌসুমে বলুন, যখনই হোক আমাদের দেশের মানুষ কৃষকই হোক বা যেকোনো মানুষ হোক, তারা যাতে চাষের জন্য পানি পায়। আরেকটি বিপজ্জনক ব্যাপার হচ্ছেÑ এই ফারাক্কা বাদ হওয়ার কারণে যেটি হচ্ছে ধীরে ধীরে যেহেতু পানির পরিমাণ কম, সে জন্য ধীরে ধীরে যেটি হচ্ছে সমুদ্রের পানি দক্ষিণাঞ্চলে ঢুকছে। ফলে সুন্দরবনসহ ওই সব অঞ্চলে যেই সমস্যাগুলো আছেÑ লোনা পানি বেশি পরিমাণে ভেতরে চলে আসার কারণে সমতলের গাছপালা নষ্ট হচ্ছে, জীববৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে। বিভিন্ন পশু বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমরা যদি সেই প্রেসারটিকে রাখতে চাই আমাদেরকে ব্যারাজটি নির্মাণ করতে হবে এবং ব্যারাজের মধ্যে আমরা পানি ধরে রাখব। যখন বাড়তি পানি বর্ষার মৌসুমে যে পানিটা আসে, সেই পানিটি আমরা ধরে রাখতে পারব। যাতে করে সেই পানি আমরা আমাদের মানুষের জন্য কাজে ব্যবহার করতে পারি। সেই পানিকে আমরা কৃষির পাশাপাশি আরো যাবতীয় কাজে ব্যবহার করতে পারি। এর আগে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
উপস্থিত সুধীবৃন্দের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গরম বোধ হয় বেশ পড়েছে তাই না? আমরা যখন ছোট ছিলাম আমার পরিষ্কার মনে আছেÑ স্কুলে যখন পড়তাম, স্কুলে ক্লাস থ্রি-ফোর-ফাইভে যখন পড়তাম, খুব সম্ভবত আমরা এত গরম নিয়ে কমপ্লেইন করতাম না, তখন এত গরম পড়ত না। আবার একইভাবে প্রায় অনেক বছর আমাকে দেশের বাইরে থাকতে হয়েছে। বাট এর মধ্যে প্রায় যখন দেশের শীতের সময়ে কথা হতো প্রায় দেখতাম, আমাদের পরিচিত লোকজন অলমোস্ট এখানে অনেকেই দলীয় লোকজন যারা আছেন আপনাদের সাথে প্রায় আমার জুমে মিটিং হতো। দেখতাম যে, খুব যে গরম কাপড় সবাই পরে আছে তা না। অনেকের মুখে শুনতাম শীত পড়েই নাই। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসেও বলতÑ শীত পড়ে নাই, অর্থাৎ শীতও তেমন পড়ে না। পরিষ্কার আমার মনে আছেÑ আমরা যখন স্কুলে পড়তাম ২৬ মার্চে স্কুলে যে প্রোগ্রাম হতো, যখন রিহার্সেল দিতাম স্কুলে সেই সময় কিন্তু সোয়েটার পরে থাকতাম, শীত থাকত। তিনি বলেন, এই যে দুটো ঘটনা বললাম গরম এবং শীত আমরা কিন্তু এই বিষয়টি নিয়ে আজকে এখানে বসেছি।
অর্থাৎ আমাদের ক্লাইমেট বা আবহাওয়া যেটিই বলি, এগুলো কিন্তু চেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। এখন এই যে জায়গায় আজকে আমরা দাঁড়িয়ে আছি আমি আসার সময় দেখলাম একটি জায়গায় বালির উপরে একটি ডিঙি নৌকার মতো বেশ বড় একটি নৌকা পড়ে আছে। ওটা দেখে আমার মনে হলোÑ এই এলাকাটি খুব সম্ভবত ২০-২৫ বছর আগে। এখানে পানি ছিল, এখানে নদী ছিল। জনসংখ্যা ক্রম বর্ধমান বৃদ্ধি জায়গাও সঙ্কুুচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশের দিকে আমাদের নজর দিতে হবে। কক্সবাজারে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের অস্থায়ী বাসস্থানের ব্যবস্থা করতে গিয়ে বিপুল সংখ্যা বৃক্ষনিধনের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বাসস্থান তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎÑ হাজার হাজার গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কিছু দিন আগে আমি হঠাৎ করে একদিন সকালে পত্রিকায় দেখলাম, কক্সবাজার থেকে বিচের পাশ দিয়ে একদম উখিয়া পর্যন্ত একটি রাস্তা করা হচ্ছেÑ একটি বিচ রোড করা হচ্ছে। যেকোনো কারণেই হোক রোডের ডিজাইনের কারণে প্রায় তিন হাজার গাছ কেটে ফেলতে হবে। এই সংবাদ দেখার পরে আমি পরে এটার দায়িত্বে যেই মন্ত্রী আছেন তাকে ফোন করে নিউজটি তাকে পাঠালাম। পাঠিয়ে আমি বললাম, ওদের সাথে কথা বলেন। ডিজাইনটিকে একটু চেঞ্জ করা যদি সম্ভব হয় ভালো হয়। এই গাছ কাটা যাবে না। কি করবে না করবে সেটি তারা ডিসাইড করুক। কিন্তু এই গাছ কাটা যাবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতির দুর্যোগ আসবে, সেটিকে আমরা বন্ধ করতে পারব না। সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। যেমন দুর্যোগ প্রবণ একটি এলাকা ঠিক একইভাবে একটি জনবহুল দেশও। আমাদের এখানে অল্প একটু দুর্যোগ হলেই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফসলহানি হয়, গবাদিপশু মারা যায়। সেজন্য আজকের এই অনুষ্ঠানটির মূল যে লক্ষ্য হচ্ছে দুটি : ১. এই প্রতিষ্ঠানটি তৈরি হওয়ার পরে এখানে আমাদের ক্লাইমেট বা আবহাওয়া যে চেঞ্জ হচ্ছে সেটি সম্পর্কে রিসার্চ করা। কিভাবে এই বিষয়গুলোকে আমরা ট্যাকেল করব। ২. এট দ্য সেইম টাইম সেটি ভূমিকম্প হোক সেটি অন্য জলোচ্ছ্বাস, যেটি হোক সেখান থেকে আমরা কিভাবে আমাদের সম্পদ এবং মানুষকে আমরা রক্ষা করব।
শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের জন্য খালখনন কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালখনন কর্মসূচির সাথে মানুষের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর সাথে কৃষি জড়িতÑ যেভাবেই হোক আমাদেরকে খালখনন কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতন হতে হবে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি বলেছি দুর্যোগ আমরা থামাতে পারব না। কিন্তু আমরা যেটি করতে পারি আমরা দুর্যোগ সম্পর্কে মানুষকে ওয়াকিবহাল করতে পারি। আমরা যেটি করতে পারি আমরা মানুষকে সচেতন করতে পারি।
এ সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন ও সচিব সাইদুর রহমান খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।