লালমনিরহাট জেলার বড় হাটগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কালীগঞ্জ উপজেলার চাপারহাট। ঐতিহ্যবাহী এই হাটে রংপুর বিভাগের গরু-ছাগলের ক্রেতা ও ব্যাপারীরা আসেন। এবার ঈদুল আজহা উপলক্ষে হাটটি আগেভাগেই জমেছে। এই সুযোগে নির্ধারিত হাসিলের (খাজনা) দ্বিগুণ টাকা আদায় করছেন ইজারাদার।
ক্রেতা-বিক্রেতা, ব্যাপারী ও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার চন্দ্রপুর ইউনিয়নের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গরু কেনাবেচার জন্য দেশের উত্তর জনপদের সবচেয়ে বড় বাজার চাপারহাট। সপ্তাহে দুদিন শুক্র ও সোমবার ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। বর্তমানে ব্যবসায়িক দিক থেকে খুবই গুরুত্ত্বপূর্ণ হাট হিসেবে পরিচিত এটি। এবার হাটের ইজারা পেয়েছেন হাবিবুর রহমান। তিনি নিজেকে লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ-আদিতমারী) আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য মো. রোকন উদ্দিন বাবুলের ভাগনে বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। স্থানীয় বিএনপি নেতা পরিচয় দিলেও দলের কোনও পদে নেই।
সরেজমিনে হাট ঘুরে দেখা গেছে, হাটে প্রতি গরু বিক্রিতে ক্রেতার কাছ থেকে ইজারাদার হাসিল নেওয়ার বিধিতে রয়েছে ৪৯৫ টাকা। আর ছাগলে নেওয়ার কথা ১১০ টাকা। এই টাকা কেবল ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়ার নিয়ম। অথচ প্রতি গরুতে হাসিল নেওয়া হয় ৮০০-৯০০ ও ছাগলে ৪০০-৫০০ টাকা। আবার ক্রেতা ও বিক্রেতা দুজনের কাছ থেকেই টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে প্রতি গরুতে বিক্রেতার কাছ থেকে ৩৫০-৪০০ এবং ক্রেতার কাছ থেকে ৪৫০-৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। তবে হাসিল আদায়ের একাধিক রশিদে দেখা গেছে, সেখানে কোনও টাকার পরিমাণ উল্লেখ করা হয় না। শুধু গরু-ছাগলের বর্ণনা লেখা হয়
বাজারের গরু ব্যবসায়ী লেবু মিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতি গরুতে বিক্রেতার কাছ থেকে খাজনা নেওয়া হয় ৩৫০-৪০০ টাকা। আর ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়া হয় ৪৫০-৫০০ টাকা। আমি চারটা গরু বিক্রি করে ৩ হাজার ২০০ টাকা খাজনা দিয়েছি। কারণ ক্রেতারা আমাকে খাজনা দেওয়া অনুরোধ করেছিলেন। তবে আশপাশের হাটগুলোতে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়। এই হাটে প্রায় দ্বিগুণ খাজনা দিতে হয়।’
মেহেদী হাসান নামে এক ক্রেতা একই কথা বলেছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি একটি গরু কিনেছি। বিক্রেতা-ক্রেতা মিলিয়ে আমাকে ৮০০ টাকা খাজনা দিতে হয়েছে। প্রতি ছাগলে ৪০০ টাকা দিতে হয়। অথচ সরকারি নির্দেশনা হলো একটি গরুতে ৪৯৫ টাকা, তা শুধু ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়ার কথা।ছাগল প্রতি ১১০ টাকা, তাও শুধু ক্রেতার কাছ থেকে নেওয়ার কথা। বিক্রেতার কাছ থেকে খাজনা নেওয়ার কোনও নিয়ম নেই। রশিদে টাকার কথা স্পষ্ট উল্লেখ থাকতে হবে। কিন্তু তা উল্লেখ না করে দুজনের কাছ থেকেই খাজনা নিচ্ছেন হাটের ইজারাদার। এ নিয়ে কিছু বললে নিজেকে এমপির ভাগনে বলে হুমকি দেন।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাটের ইজারাদার হাবিবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘হাটের খাজনা দ্বিগুণ নিচ্ছি নাকি কম, এটি আপনার জানার দরকার নেই। এমপি রোকন উদ্দিন বাবুল সব সময় আমার খবর রাখেন। তিনি সময় জানেন। আপনিও এসে চা খেয়ে যান। এসব নিয়ে কথা বলার দরকার নেই।’
এ বিষয়ে জানতে লালমনিরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. রোকন উদ্দিন বাবুলের মোবাইল নম্বরে তিন দিন ধরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।
কোরবানির হাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের বিষয়ে পদক্ষেপ জানতে কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামিমা আক্তার জাহানের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।
রবিবার কালীগঞ্জ উপজেলার চামটাহাটে অতিরিক্ত হাসিল আদায়ের খবর পেয়ে অভিযান চালান জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. নওশাদ আলম। অভিযান শেষে চাপারহাটের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ক্রেতা-বিক্রেতারা দলবেঁধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে অতিরিক্ত খাজনা আদায়ের অভিযোগ করেন। কিন্তু সেখানে অভিযান চালাননি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। উপস্থিত ক্রেতা-বিক্রেতাদের চাপারহাটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যান তিনি।