রাজনীতিতে ফিরে আসতে পথ খুঁজছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ। দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নানা কৌশলে মাঠে নামার চেষ্টা করছে। এ জন্য তারা নানা দিবস বা সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে বেছে নিচ্ছে। এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তারা দলীয় স্লোগান এবং বক্তব্যও দিচ্ছে। সরকার এ বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা সরকার হয়তো আওয়ামী লীগকে কিছুটা ছাড় দিচ্ছে। এ জন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এ ধরনের কর্মকা-কে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাচ্ছে।
গতকাল ১৭ মে ছিল শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস (আওয়ামী লীগের ভাষায়)। এ উপলক্ষে দলটির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। তারা তাদের নেত্রীর প্রত্যাবর্তন এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবিতে রাজধানীর আসাদগেট ও ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে তাৎক্ষণিক ঝটিকা মিছিল করছে। এছাড়াও দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিষয়ে বিভিন্ন কনটেন্ট প্রচার করছে। এছাড়া গত ১৪ মে চট্টগ্রামে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের জানাজায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে মিছিল করে। চট্টগ্রাম নগরের জমিয়াতুল ফালাহ জামে মসজিদ মাঠে মোশাররফ হোসেনের জানাজা শেষে হঠাৎ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে নগরীর প্রধান সড়কে নেমে আসে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এ সময় তারা সরকারবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান দেয়। এরপর গত ১৫ মে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিচার দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচির শুরুতে অভিনেতা জুটন দাশের আহ্বানে টিকা সংকটে মৃত শিশুদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। ক্রিয়েটিভ রাইটার্সের মুখপাত্র কবি কুতুব হিলালির সঞ্চালনায় মানববন্ধনের মূল দাবিগুলো উপস্থাপন করেন চলচ্চিত্র পরিচালক ও অ্যাক্টিভিস্ট এস এম কামরুজ্জামান সাগর। এছাড়াও এতে অংশগ্রহণকারীদের বেশির ভাগই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের কর্মী-সমর্থক হিসেবে পরিচিত।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ এভাবেই নানা কৌশলে আবার রাজনৈতিক ও নির্বাচনী মাঠে ফেরার চেষ্টা করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রম ও অঙ্গসংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা প্রায় সবাই শেখ হাসিনার মতো দেশ থেকে পালিয়ে ভারত নয়তো অন্য কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ কেউ গ্রেফতার হয়ে জেলে আছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের বিচার হচ্ছে। দেশে আওয়ামী লীগ বা এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের তৃতীয় চতুর্থ সারির কোনো নেতাকেও প্রকাশ্যে দেখা যায় না। বলা যায় যে জুলাই অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ একেবারে গর্তে লুকিয়ে পড়েছে। তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। চলতি বছরের শেষে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
আওয়ামী লীগকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখলেও এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির তৃণমূলের নেতারা অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আওয়ামী লীগ সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করতে চাচ্ছে। এরই মধ্যে আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেলগুলো সক্রিয় রয়েছে এবং কিছু জায়গায় তারা ইতিবাচক ফলাফলও পেয়েছে। এছাড়া আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ নেতাদের অনেকেই এখন দল ও নেতাকর্মীদের বাঁচাতে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি দেশে ফিরে আসার কথা ভাবছে। দলের বিতর্কিত ও শীর্ষ নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে বা সংস্কারের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্বের অধীনে ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টিও দলের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত হচ্ছে।
আর্ন্তজাতিক চাপ অথবা রাজনৈতিক কৌশল যাই হোক না কেন, জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে আওয়ামী লীগের প্রতি বিএনপি যেন বেশ কিছুটা নমনীয়। নির্বাচনের পরদিন থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশে এক ডজনের বেশি জেলা ও উপজেলায় দলীয় কার্যালয় খুলে দোয়া-মোনাজাত, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, ব্যানার টানানো ও স্লোগান দেয়া তারই বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ে এ ধরনের উপস্থিতি কেবল সাংগঠনিক বার্তা নয়; বরং জাতীয় রাজনীতিতে পুনরায় জায়গা করে নেয়ার কৌশলগত প্রচেষ্টা। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে গণভোটে বিএনপির তৃণমূলের ‘না’ ক্যাম্পেইন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেয়া, গণভোট ও জুলাই সনদের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্য ও অবস্থান, প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের উত্থান ঠেকাতে দুই দলের নেতাকর্মীদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে বলেও মনে করছেন অনেকে।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন এলাকায় অফিস খোলার চেষ্টা, পতাকা উত্তোলনের বাইরে আরেকটি বিষয় সবার নজরে আসে। দীর্ঘ প্রায় ৯ মাস পর জামিন পেয়েছেন বরিশাল সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ। একই সঙ্গে জামিন দেয়া হয়েছে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের বরিশাল মহানগর সাবেক সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান জসীম উদ্দিনসহ দুজনকে। এরপর নারায়ণগঞ্জের সিটি মেয়র সেলিনা হায়াত আইভিও কয়েকটি মামলায় জামিন পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীও জামিন পেয়েছেন। এসব বিষয়কে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতি নতুন সরকারের নমনীয় মনোভাব বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে। সরকার গঠনের পর বিএনপির একটি অংশ মনে করছে, ইসলামী দলগুলোর উত্থান বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে মোকাবিলা করতে হলে আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি রাজনৈতিক মাঠের বাইরে ঠেলে দেয়া কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক নাও হতে পারে। ফলে মাঠপর্যায়ে অনানুষ্ঠানিক সহনশীলতার একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে ‘জুলাই সনদ’ ও সংস্কার ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান প্রায় একই বিন্দুতে এসে ঠেকেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বর্তমান সংসদে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ না নেয়া ও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রশ্ন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। দলটির নেতাদের অনানুষ্ঠানিক বক্তব্যে শোনা যাচ্ছে, জুলাই সনদ কার্যকর হলে তাদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান আরো দুর্বল হতে পারে। ফলে এই ইস্যুতে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে নীরব সমঝোতার একটি ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, এমন ধারণা রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালো হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ এখন সরাসরি বড় কর্মসূচির বদলে ‘উপস্থিতি জানানোর’ কৌশল নিয়েছে। ছোট ছোট প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সংগঠনের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চাইছে। একই সঙ্গে তারা দেখছে, বিএনপির প্রতিক্রিয়া কতটা কঠোর বা সহনশীল হয়। এই প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে ভবিষ্যতের কৌশল।
আমার বাংলাদেশ পার্টি-এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসা সহজ হবে না। তরুণ প্রজন্ম তাদের প্রত্যাবর্তন চায় না। তবে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে যে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে, তা সংঘাতে রূপ নিলে আওয়ামী লীগ লাভবান হবে। অতীতে এ রকম নজির আছে। ১৯৯১ সালে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করেছিল। পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনগুলোর প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে তাদের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক তৈরি হয় এবং একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। তাই এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে সংঘটিত গণহত্যা ও বিচারের আগে দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসন কিংবা দেশে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। তাদের ফ্যাসিবাদী আচরণ ও গণহত্যার পর দেশের মানুষ আওয়ামী লীগকে কোনোভাবেই আর রাজনীতিতে মেনে নেবে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই। তাদের একমাত্র প্রত্যাবর্তন হতে পারে শুধু বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর জন্য। যেকোনো মূল্যে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের যেকোনো চেষ্টা ছাত্র-জনতা প্রতিহত করবে।