ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বাসে সিনিয়রের হাতে জুনিয়র শিক্ষার্থী মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুই বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন।
রোববার রাত সাড়ে ৮টার দিকে প্রধান ফটকে রাতের শিডিউলের বাস ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি, ট্রেজারার, প্রক্টরিয়াল বডিসহ অন্যান্য শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের সায়েন্স ভবনে এবং লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মীর মশাররফ ভবনে আটকে রাখা হয়।
শিক্ষার্থীরা জানান, বিকেল ৪টার ঝিনাইদহগামী দ্বিতল মধুমতী বাসে যাওয়ার সময় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সিনিয়রের হাতে জুনিয়র শিক্ষার্থী মারধরের ঘটনা ঘটে। এর জের ধরে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীরা মেইন গেইটে অবস্থান করছিলেন। পরে পুনরায় তাদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এতে জড়িত দুই শিক্ষার্থী হলেন- বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী অন্তর বিশ্বাস এবং অভিযুক্ত লোকপ্রশাসন বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হৃদয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার বাস ক্যাম্পাসে প্রবেশ করার পর লোকপ্রশাসন বিভাগের হৃদয়, জিহাদ এবং তাদের সঙ্গে থাকা কয়েকজন বাস থেকে নামতেই বায়োটেকনোলজি বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথাকাটাকাটি শুরু হয়, যা এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যেই সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষ শুরু হলে ১৯-২০ ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থী হৃদয়কে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে লোকপ্রশাসন বিভাগের আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী ঘটনাস্থলে এলে সংঘর্ষ বড় আকার ধারণ করে।
এ সময় উভয় বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। পরে প্রক্টরিয়াল বডি ও উপস্থিত শিক্ষার্থীরা দুই পক্ষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেন। এরপর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে আসে।
বায়োটেকনোলজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের বিভাগের সাগরকে প্রথমে ঘুষি মারা হয়েছে। তামিম নামের যে ছেলেটা ওকে প্রথমে মেরেছে। সাগর আসলে আমাদের এবং জুনিয়রদের আটকানোর চেষ্টা করছিল। সাগর যখন উত্তেজিত হয়েছে, এরপর আবারো ওকে মারা হয়েছে। দুইজন আমাদের চোখের সামনে মার খেয়েছে। লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে এসে আমাদের মারধর করেছে। আমরা প্রক্টর স্যারের সঙ্গে বসে ছিলাম। যারা মার খেয়েছে তারা হলো- সাগর (২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ), নাফিস আরমান (২৪-২৫)। বাসে যে মার খেয়েছে সে হলো অন্তর বিশ্বাস।
ভুক্তভোগী বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী সাগর বলেন, বাসের মধ্যে আমার বন্ধুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা মেইন গেইটে অবস্থান করি। তবে আমাদের এমন কোনো উদ্দেশ্য ছিল না যে মারামারি করব। কিন্তু আমার মনে হয় লোক প্রশাসন বিভাগের ছেলেরা পূর্বপরিকল্পিতভাবেই এক-দুই কথার মধ্যে আমাদের ওপর চড়াও হয় এবং গায়ে হাত তোলে। তাদের বাধা দিতে গেলেই আমিও হামলার শিকার হই।
ঘটনার সূত্রপাত সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, বিকেল ৪টার বাসে আমার বন্ধু যখন শহরে যাচ্ছিল, তখন লোক প্রশাসন বিভাগের ভাইয়ের সঙ্গে সামান্য বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি হয় এবং পরে তাকে মারধর করা হয়। আমরা এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মেইন গেইটে অবস্থান করি, কারণ প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থীরা আমাদের আশ্বস্ত করেছিল যে এর সুষ্ঠু বিচার হবে। কিন্তু মারামারির কোনো উদ্দেশ্য আমাদের ছিল না। আচমকাই তারা বাস থেকে নামার পর কথা-কাটাকাটি থেকে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় আমাদের প্রায় ৫-৬ জন আহত হয়।
লোকপ্রশাসন বিভাগের ১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের তামিম বলেন, আমি বাইরে থেকে দেখলাম হঠাৎ করে ক্যাম্পাসের ভেতরে শোরগোল চলছে। আমি ভেতরে ঢোকার পর দেখি লোক প্রশাসন বিভাগের দুই শিক্ষার্থীর ওপর অতর্কিত হামলা হয়েছে। যারা মেরেছে তারা দৌড়ে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে গেছে। সেখানে কর্তৃপক্ষ সমাধানের চেষ্টা করছে। বাকিটা প্রক্টর স্যার সমাধানের চেষ্টা করবেন। নবনিযুক্ত উপাচার্য লোকপ্রশাসন বিভাগের হওয়ায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভিসি স্যার পুরো ক্যাম্পাসের অভিভাবক। সেখান থেকে তাকে কোনো নির্দিষ্ট বিভাগের বলা যাবে না। আমরা এ ধরনের আচরণ করিনি। পরিস্থিতির কারণে যা হওয়ার হয়েছে। আমি সবাইকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি, তবে আমার ওপরও হামলা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সিনিয়র অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন বলেন, ছাত্রদের দুটি পক্ষ সামান্য একটি বিষয় নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই উপাচার্য মহোদয়ের নির্দেশে প্রক্টোরিয়াল বডিসহ আমি, প্রোভিসি এবং ট্রেজারার মহোদয় তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ছাত্রদের সঙ্গে কথা বলে চেষ্টা করেছি যেন উত্তেজনার মাত্রা না বাড়ে। দুই বিভাগের সভাপতি তাদের শিক্ষার্থীদের নিয়ে বসেছেন। আশা করছি সামান্য ঘটনাটি এখানেই শেষ হবে, আর দীর্ঘায়িত হবে না। ভাইস চ্যান্সেলর উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আশ্বস্ত করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এয়াকুব আলী বলেন, মাননীয় ভাইস চ্যান্সেলর রাত ৮টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে কুষ্টিয়ায় গেছেন। আমরা শিক্ষার্থীদের দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে শান্ত করেছি। একটু ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। আমাদের প্রক্টোরিয়াল বডি এবং দুই বিভাগের চেয়ারম্যান এসেছেন। প্রক্টর অফিসে দুই পক্ষকে নিয়ে বসার পর আশা করি তাদের মধ্যকার ভুল বোঝাবুঝির সমাধান হবে। এই মুহূর্তে ক্যাম্পাসে কোনো ধরনের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি বা কোনো ধরনের শঙ্কার কারণ নেই।