Image description

স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী 
ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে। জাতীয় নির্বাচনে একসঙ্গে ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে অংশ নিলেও স্থানীয় নির্বাচন পৃথকভাবে করতে চাইছে দুই দলই। তবে ভেতরের খবর ভিন্ন। এককভাবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিলেও দুই দলই আলোচনার দরজা খোলা রাখছে। স্থানীয় নির্বাচনের সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করা হলে শেষ সময়ে গিয়ে কিছু পরিবর্তন বা সমঝোতা হতে পারে বলেও দুই দলের নেতারাই আভাস দিচ্ছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একসঙ্গে অংশ নিলেও সাংগঠনিক ভিত্তি ও তৃণমূল গোছানোর জন্য এবং এককভাবে স্থানীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি মাথায় রেখেই দল গোছাচ্ছে এনসিপি। ইতিমধ্যে ঢাকার দুই সিটির মেয়র ও ১০০ পৌরসভা ও উপজেলায় প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। ওদিকে জামায়াতে ইসলামী চারটি সিটি করপোরেশনের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তবে কৌশলী ভূমিকায় মাঠ গোছাতে স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি নিচ্ছে দুই দলই। পৃথকভাবে প্রার্থী ঘোষণা ও মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি শুরু করায় ১১ দলীয় জোটের ভেতরেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। জোট সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৌশলগত এই ভিন্নতা এখনই জোটের সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো প্রভাব ফেলবে না। নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হলে সবকিছু বুঝতে পারা যাবে, জানা যাবে।

জামায়াত সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলগতভাবেই হবে। জাতীয় নির্বাচনের জন্য জোট গঠন করা হলেও স্থানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে সেই সমীকরণ কার্যকর হচ্ছে না। তাছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকেও অনুষ্ঠিত হবে না। দলটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন জোটগতভাবে নয়, বরং এককভাবেই করা হবে। তবে অন্যান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী ও পরিস্থিতি বিবেচনায় সমঝোতার সুযোগ থাকতে পারে।

অন্যদিকে এনসিপিও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবেই অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটির দাবি, নির্বাচনের জন্য সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও প্রার্থী চূড়ান্তের কাজ এগিয়ে চলছে। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুযায়ী সমঝোতার সম্ভাবনাও পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে না।

দলটির নেতারা মনে করছেন, সময়ের সঙ্গে এনসিপি’র সাংগঠনিক শক্তি বাড়ছে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন সেই শক্তি যাচাইয়ের বড় সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। একইসঙ্গে জামায়াতও মাঠপর্যায়ে নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সক্রিয় করে তুলেছে।

জোটসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি সামনে আসার পর থেকেই শরিক দলগুলোর তৎপরতা বেড়েছে। এরই মধ্যে এনসিপি প্রথম ধাপে একশ’ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা চেয়ারম্যান ও মেয়র পদে আরও প্রার্থী ঘোষণা করার প্রস্তুতিও চলছে। অন্যদিকে জামায়াত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও সারা দেশে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। জোটের অন্য শরিক দলগুলো এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেনি।

জামায়াতের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মহানগর উত্তরের আমীর সেলিম উদ্দিনকে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। দক্ষিণে আলোচনায় রয়েছেন ডাকসু’র ভিপি আবু সাদিক (সাদিক কায়েম)। সমপ্রতি সাদিক কায়েমকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সমালোচনারও সৃষ্টি হয়। তবে জামায়াতের নেতারা বলছেন, নির্বাচনের সময় পর্যন্ত তার ডাকসু’র মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। পাশাপাশি ছাত্রত্ব শেষ হলে ছাত্রশিবিরে তিনি আর থাকবেন না। ফলে প্রার্থী হতে সাংগঠনিক কোনো বাধা থাকবে না।

জামায়াত সূত্র আরও জানায়, ঢাকা দক্ষিণে এনসিপি’র পক্ষ থেকে তাদের দলীয় মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়াকে জোটের প্রার্থী করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় অনেক নেতাই এ প্রস্তাবে আপত্তি জানিয়েছেন।

জামায়াতের আলোচনায় থাকা সিটি মেয়র প্রার্থীরা হলেন- নারায়ণগঞ্জে মহানগর জামায়াতের আমীর আবদুল জব্বারকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ভাবা হচ্ছে। তিনি একসময় ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন, এখন নারায়ণগঞ্জ সিটি আমীরের দায়িত্বে রয়েছেন। গাজীপুরে আলোচনায় রয়েছেন তুরস্কভিত্তিক এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হাফিজুর রহমান। তিনি ছাত্রশিবিরের সাবেক নেতা। চট্টগ্রামে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উঠে এসেছে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান হেলালীর নাম। রংপুরে বিবেচনায় আছেন মহানগর আমীর এ টি এম আজম খান। সিলেট সিটি নির্বাচনে মাওলানা হাবিবুর রহমান। কুমিল্লা সিটি নির্বাচনে দ্বীন মুহাম্মদ। এরমধ্যে নারায়ণগঞ্জ, রংপুর, গাজীপুর ও চট্টগ্রামের সিটি মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী।

অন্যদিকে, জোটের আশা ছেড়ে না দিলেও এনসিপি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আলাদাভাবে করার প্রস্তুতি নিয়ে রাখছে। গত ২৯শে মার্চ ঢাকার দুই সিটিসহ পাঁচ সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করে দলটি। সর্বশেষ ১০০ পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে এনসিপি। ২০শে মে দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণার কথা রয়েছে দলটির। তবে ভেতরে ভেতরে এনসিপি’র নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনেক নেতা এখনো ১১দলীয় ঐক্যের হয়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয়ার কথা ভাবছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম মানবজমিনকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা হয়নি। আমরা দলীয়ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি এবং এককভাবেই নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছি। জোটগত কোনো বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এনসিপি’র উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম মানবজমিনকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এককভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমরা সকল সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলাতে খুব দ্রুতই আমাদের প্রার্থী ঘোষণা করবো। ইতিমধ্যে কিছু প্রার্থী আমরা ঘোষণা করেছি।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো জোটগত নির্বাচন বা সমঝোতা নিয়ে আলোচনা কিংবা সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচনের আগে পরিস্থিতি অনুযায়ী কোনো সমঝোতা হবে কিনা, সেটিও নিশ্চিত নয়।