পুরান ঢাকার ব্যস্ত জজকোর্ট এলাকা। উল্টোপাশে ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। সেই হাসপাতালের মূল গেটের সামনে ছিল রোগী আর স্বজনের ভিড়। গত বছরের ১০ নভেম্বর সকালে দিনের আলোয়, শত শত মানুষের সেই ভিড়কে উপেক্ষা করেই সিনেমার কায়দায় এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন ৫৫ বছর বয়সী তারিক সাইফ মামুন। যিনি পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওই ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। এর পর ‘বীরদর্পে’ চলে যায় খুনিরা। এমন খুনে ভয় ধরায় সাধারণ মানুষকেও। তবে ভয়ংকর সেই খুনের তদন্তেই যেন ভর করেছে ভয়, স্থবিরতা আর নানা প্রশ্ন। ৬ মাস পার হতে চললেও বিচার কার্যক্রম শুরু তো দূরের কথা, চার্জশিট পর্যন্ত দিতে পারেনি পুলিশ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কার্যত থমকে আছে ভয়াবহ সেই খুনের তদন্ত।
শুধু শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন হত্যাকাণ্ডই নয়, গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৬ মাসে রাজধানীতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে আতঙ্ক ধরানো এমন হত্যাকাণ্ড ঘটে আরও তিনটি, যাদের প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেও মাস্টারমাইন্ডরা অধরাই রয়ে গেছে; তবে থমকে আছে তদন্ত।
গত বছরের ১০ নভেম্বর মামুন খুনের এক সপ্তাহের মাথায় ১৭ নভেম্বর রাজধানীর পল্লবীতে ঘটে আরেক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। ওইদিন সন্ধ্যায় দোকানের ভেতর ঢুকে মুখোশধারী তিন সন্ত্রাসী পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করে। দোকানের ভেতরে-বাইরে মানুষের উপস্থিতিতে এমন ভয়ংকর হত্যাকাণ্ড ঘটে। অস্ত্রধারীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় এক রিকশাচালককেও গুলি করে।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কারওয়ান বাজারে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য সচিব মুসাব্বিরকে। আর গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটনকে। প্রকাশ্যে গুলি করে এসব হত্যাকাণ্ডও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়ায়। আলোচিত এই চার হত্যার ঘটনায় দায়ের মামলার তদন্ত শুরুতে থানা পুলিশ করলেও এখন তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীতে খুনের ঘটনায় ১২৫টি মামলা হয়। এর মধ্যে নভেম্বর মাসে ২৭টি, ডিসেম্বর মাসে ২০টি, জানুয়ারি মাসে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৫টি এবং এপিল মাসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়। তবে ওই ৬ মাসে আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ছিল তালিকাভুক্ত দুই শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন ও টিটন এবং যুবদল নেতা কিবরিয়া ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মুসাব্বিরকে খুনের ঘটনা। এসব হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলোচিত এসব হত্যার তদন্তে নেমে নেপথ্যে সক্রিয় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাত দেখতে পান তদন্তসংশ্লিষ্টরা। মাস্টারমাইন্ড হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সম্পৃক্ততা পাওয়ার পর তাদের কিছু সহযোগীকে ধরা হয়। এর পরই আর তদন্তের আলো গভীরে পৌঁছায় না। ফলে তদন্তও চলে ধীরগতিতে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী মামুন হত্যা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই হত্যাকাণ্ডে এখন পর্যন্ত সরাসরি জড়িত দুই শুটারসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হত্যায় ব্যবহৃত দুটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মধ্যে অন্তত দুজন পুলিশকে জানিয়েছে, দুই লাখ টাকার বিনিময়ে তারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। তাদের দাবি, পলাতক সন্ত্রাসী রনি ওরফে ‘ভাইগ্না রনি’র নির্দেশে তারা গুলি চালান।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই রনি আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর আশীর্বাদপুষ্ট এবং তার নির্দেশেই রাজধানীর অপরাধজগতের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রিত হয়। মূলত আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বে এই হত্যাকাণ্ড হয়। যদিও রনি বা তার মাস্টারমাইন্ড অধরা।
মামুন পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হলেও তিনি নিহত হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যরা এখন আতঙ্কে রয়েছেন। এ জন্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। যদিও মামুনের পরিবারের এক সদস্য অভিযোগ করেন, পুলিশ এখন পর্যন্ত মূলহোতাদের নাগাল পায়নি বা তারা সে পর্যন্ত যেতে চাচ্ছে না। পুলিশ মূলহোতাদের ধরতে চাইছে কি না, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
পরিবারের ওই সদস্যের শঙ্কা, মামলাটিও হয়তো ধীরে ধীরে অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলার মতোই ফাইলের স্তূপে চাপা পড়ে যাবে। সুষ্ঠু বিচার চাইলেও তদন্তের এই গতি দেখে মনে হচ্ছে বিচার পাওয়া অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
অবশ্য মামলাটির তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) লালবাগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. নূরে আলম কালবেলাকে বলেন, ‘এটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ড হওয়ায় নিবিড়ভাবে তদন্ত চলছে। এতে একটু সময় লাগছে। তা ছাড়া ৫ আসামিকে গ্রেপ্তারের পর জড়িত অন্যরা আত্মগোপনে চলে গেছে। এজন্য নতুন কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া হত্যা মামলাটিও থানা পুলিশের হাত ঘুরে এখন ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। হত্যায় জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। ৬ মাস পরও তদন্ত মাঝপথে আটকে রয়েছে বলে জানা গেছে।
থানা ও ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মূলত বিদেশে বসে যুবদল নেতা কিবরিয়াকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এর নেপথ্যে বিদেশে পলাতক মফিজুর রহমান ওরফে মামুন নামে একজনের সম্পৃক্ততা মিলেছে। যদিও ওই খুনে ভাড়াটে সন্ত্রাসীরা অংশ নেয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও লেনদেন নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে কিবরিয়াকে হত্যা করা হয়েছিল বলে এখন পর্যন্ত মনে হয়েছে।
মামলাটির তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ডিবির মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. সোনাহর আলী কালবেলাকে বলেন, মামলাটিতে এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত ও এজাহারের বাইরে ৮ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এখনও মামলার তদন্ত শেষ হয়নি।
তিনি বলেন, সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি এবং হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্রও উদ্ধার করা যায়নি। এজন্য মামলার চার্জশিট দিতে দেরি হচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের অদূরে তেজতুরী বাজার এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডেরও চার মাস পার হয়েছে। কিন্তু এখনও মামলাটির তদন্ত শেষ করতে পারেনি পুলিশ। এই মামলাটিও থানা-পুলিশের হাত ঘুরে ডিবি তদন্ত করছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এই মামলায় এখন পর্যন্ত প্রধান শুটারসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সর্বশেষ গতকাল বৃহস্পতিবার পুলিশ জানায়, রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি, ইয়াবাসহ জাহিদুল ইসলাম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডে সে আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহ করেছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্বেচ্ছাসেবক দলের আজিজুর রহমান মুসাব্বির হত্যাকাণ্ডে অস্ত্র সরবরাহে গ্রেপ্তার জাহিদুলের সংশ্লিষ্টতার তথ্য মিলেছে। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে।
ওই মামলাটির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অন্তত ১৫ লাখ টাকার চুক্তিতে মুসাব্বিরকে হত্যা করা হয় বলে তথ্য রয়েছে। মালয়েশিয়ায় বসে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা হয়। পুরো হত্যা মিশন তদারকি করে পলাতক সন্ত্রাসী দিলীপ ওরফে ‘দাদা বিনাশ’।
এদিকে গত ২৯ এপ্রিল খুন হওয়া তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন হত্যা মামলার তদন্তেও অগ্রগতি নেই বলে জানা গেছে। গত ১৫ দিনেও পুলিশ হত্যায় জড়িত কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওই হত্যার পর খুনিরা মূল সড়ক ব্যবহার করেনি। তারা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল থেকে ইরাকি মাঠ হয়ে সরু গলি ধরে মোটরসাইকেলে নবাবগঞ্জ ও রায়েরবাজারের দিকে চলে যায়। এর বাইরে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তথ্য মেলেনি।
অবশ্য গত মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘টিটন হত্যায় জড়িত খুনিদের ছকের ভেতর আনা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে আসামিদের অবস্থান প্রকাশ করতে চাচ্ছি না। আমরা চেষ্টা করছি।’
দীর্ঘদিনেও চাঞ্চল্যকর এসব হত্যা মামলার সুরাহা না হওয়ার বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরে যখন অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা কারাগার থেকে বের হলো, তখন কিন্তু এই প্রশ্ন উঠেছিল যে তারা জামিনে বের হয়ে আবারও অপরাধমূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে কি না। তখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, তারা এটাকে নজরদারির মধ্যে রাখবে। এখন যেসব ঘটনা ঘটছে, তাতে তো বোঝা যাচ্ছে যে নজরদারি ঠিকমতো করা হচ্ছে না বা হয়নি।’
তিনি বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড যখন ঘটে তখন দেখা যায় কয়েকজন হয়তো গ্রেপ্তার হয়। কিন্তু এসব ঘটনার পেছনে যারা মূলহোতা থাকে এবং কলকাঠি নাড়ায় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। এসব কারণেই অপরাধীরা আরও বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তা ছাড়া এসব শীর্ষ অপরাধীরা বেশিরভাগ সময় রাজনৈতিক ঢালের মধ্যে থাকে। রাজনৈতিক সাপোর্ট পেলে তাদের আইনের আওতায় আনা কঠিন। তারা ক্ষমতা খাটিয়ে তদন্তকেও প্রভাবিত করতে পারে।