সতের বছর রাজপথে। এলো জুলাই। নানা ঘটনা- এলো অন্তর্বর্তী জমানা। গণতন্ত্র ও নির্বাচন ইস্যু নিয়ে বিতর্ক চাউর রেখেছেন বরাবর। বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল দল ও নিজ অবস্থান। জাতীয় নির্বাচনে মাঠ তাতিয়ে গেছেন সংসদে। ধকল না কাটতেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। গুরুতর অবস্থায় ভর্তি করা হয় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে। সেখানে জরুরি অস্ত্রোপচারের পর প্রাথমিক ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব হলেও অবস্থা অবনতির দিকে যায়।
চিকিৎসকদের পরামর্শে উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার এম্বুলেন্সে নেয়া হয় সিঙ্গাপুর। সেখানকার চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় সুস্থ হয়ে উঠছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাস। চার বারের এমপি, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির এই সদস্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পেয়েছেন। ঢাকার মেয়র ও বিএনপি সরকারের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মির্জা আব্বাস এবারের নির্বাচনে কঠিন এক পরিস্থিতি উতরে এমপি হন। জাতীয় নাগরিক পার্টির তরুণ প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিজয়ী হন।
নির্বাচনের সময়ে নানামুখী প্রতিকূলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে এই প্রবীণ রাজনীতিবিদকে। নির্বাচনের পরও কিছুদিন আলোচনায় ছিলেন মির্জা আব্বাস। সরকার গঠনের পর করা হয় মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। উপদেষ্টা হয়ে মন্ত্রিসভার কয়েকটি বৈঠকে অংশ নিতে পারলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর আগের দিন আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঢাকা ও সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিয়ে তিনি এখন মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
দেশে-বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের পর মির্জা আব্বাস এখন অনেকটাই সুস্থ। কিছু সমস্যা আছে যা ধারাবাহিক চিকিৎসায় সেরে উঠবেন বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। গতকাল মালয়েশিয়া থেকে মানবজমিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, এখন অনেকটাই সুস্থ। পুরোটা সেরে উঠতে আরও কিছু সময় লাগবে। অসুস্থতার সময়ে দেশবাসী ও দলীয় নেতাকর্মী এবং নির্বাচনী এলাকার মানুষ তার জন্য দোয়া করায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন সবার প্রতি।
মির্জা আব্বাসের পরিবার সূত্র জানায়, তিনি এখন কুয়ালালামপুরের কোর্ট প্রিন্স মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এখানে তাকে থেরাপি দেয়া হচ্ছে। এখন তিনি অনেকটাই স্বাভাবিক। কথাবার্তা বলেন। স্বাভাবিকভাবে খাদ্য গ্রহণ করেন। শুভাকাঙ্ক্ষী ও দলীয় নেতাকর্মীদের অনেকের সঙ্গে দেখা করছেন এবং কথা বলছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শে মেডিকেল সেন্টারের লবি বা খোলা স্থানে তাকে নিয়ম করে নিয়ে যাওয়া হয়। পুরো স্বাভাবিক হতে আরও কিছুদিন থেরাপি দিতে হবে।
মির্জা আব্বাসের পরিবার সূত্র জানায়, আসছে ঈদুল আজহার আগেই দেশে ফেরার পরিকল্পনা থাকলেও চিকিৎসার বিষয় বিবেচনায় আপাতত এই পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে। আরও কিছুদিন মালয়েশিয়ায় থেকে দেশে ফেরার কথা ভাবা হচ্ছে। পরিপূর্ণ সুস্থতার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন মির্জা আব্বাসের পরিবার।
গত ১১ই মার্চ রাজধানীর শাহজাহানপুরের বাসায় হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে মির্জা আব্বাসকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা জানান, তার স্ট্রোক হয়েছে, অবস্থা গুরুতর। তাকে নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দেয় পরিবার, দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে। তার সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকেও নির্দেশনা দেয়া হয়।
গত ১৩ই মার্চ এভারকেয়ার হাসপাতালে মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয় মির্জা আব্বাসের। এতে প্রাথমিক ঝুঁকি কাটলেও অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকদের পরামর্শে এয়ার এম্বুলেন্সে করে গত ১৫ই মার্চ তাকে সিঙ্গাপুর নেয়া হয়। ভর্তি করা হয় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসা গ্রহণ করে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেন। পরবর্তী চিকিৎসা ও ফিজিও থেরাপির জন্য পরিবারের সিদ্ধান্তে ১৩ই এপ্রিল তাকে নেয়া হয় মালয়েশিয়ায়। এখন সেখানেই তার চিকিৎসা চলছে। স্ত্রী আফরোজা আব্বাসসহ স্বজনরা তার সঙ্গে রয়েছে। পরিবার সূত্র জানায়, চিকিৎসা প্রক্রিয়া শেষে দেশে ফেরার পর ধীরে ধীরে রাজনীতিতেও সক্রিয় হবে প্রবীণ এই নেতা। তবে এই মুহূর্তে তার সুস্থতাকেই বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অধিকারী মির্জা আব্বাস এবারের নির্বাচনে এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। তার নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-৮ আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী এনসিপি’র নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। বয়সে তরুণ এই প্রার্থী ও তার সমর্থকরা শুরু থেকে মির্জা আব্বাসকে নিয়ে অশোভন প্রচারণায় মাতেন। যা বিএনপি’র প্রবীণ এই নেতার জন্য এক বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে। তবে তিনি পরিস্থিতি সামাল দেন ঠাণ্ডা মাথায়, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা দিয়ে উতরে যান পরিস্থিতি।
নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় অনেকটা বদলে যাওয়া আব্বাস পান অনেকের প্রশংসাও। নির্বাচনের পুরো সময় জুড়ে ঢাকা-৮ আসনে ছিল সবার চোখ। অনেকটা হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে ৫ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন মির্জা আব্বাস। ভোটের আগের পরিস্থিতির মতো এই আসনের ফল প্রকাশ নিয়েও ছিল উত্তেজনা।
অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাস তৎকালীন ঢাকা-৬ আসনে প্রথম এমপি হন। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন দ্বিতীয় মেয়াদের মন্ত্রিসভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সর্বশেষ গত ১৮ই ফেব্রুয়ারি তাকে মন্ত্রী মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।