এককভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা বললেও সংবিধান সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য থাকবে। জামায়াত ছাড়াও জোট শরিক এনসিপি, এবি পার্টিসহ কয়েকটি দল স্থানীয় নির্বাচনের জন্য এককভাবে প্রার্থী ঠিক করায় কর্মী-সমর্থকদের টানাপোড়েন আছে। তবে গণভোটের রায় বাস্তবায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া ১১ দল সংসদের ভেতরে এবং রাজপথে জোটবদ্ধ থেকে এগোবে।
জামায়াত, এনসিপিসহ ১১ দলের নেতারা সমকালকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সংবিধান সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান ব্যবস্থার ধারাবাহিকতার বিকল্প নেই। বিএনপি সরকার যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গণভোটকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে সংবিধান সংশোধনের দিকে এগোয়, তবে বিরোধী জোট রাজপথের কর্মসূচিতে যাবে। এর আগ পর্যন্ত মিছিল, সমাবেশ, জনমত গঠনের মতো কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।
সবার আগে সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে দলসমর্থিত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে এনসিপি। নির্বাচন কবে হবে তা এখনও নিশ্চিত নয়। অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত হওয়ায় স্থানীয় সরকার আগামীতে অতীতের মতো নির্দলীয় পদ্ধতিতে হবে।
সরকার জানিয়েছে, প্রথমে হবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। স্থানীয় সরকারের এই স্তরে সর্বশেষ নির্বাচন হয়েছিল ২০২১ সালের জুন থেকে ২০২২ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সাত ধাপে। সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে দিয়েছে বিএনপি সরকার। ইউনিয়ন পরিষদে দায়িত্ব পালন করছেন অতীতে নির্বাচিতরা। যারা পলাতক রয়েছেন, তাদের জায়গায় দায়িত্ব পালন করছেন সরকারি কর্মচারীরা।
উপজেলা, পৌরসভায়ও দায়িত্ব পালন করছেন সরকারি কর্মচারীরা। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের পর উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন হতে পারে। এতে চলতি বছরে সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
এই বাস্তবতায়ও ইতোমধ্যে পাঁচ সিটি করপোরেশনে দলসমর্থিত মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এনসিপি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদিব, কুমিল্লায় তারিকুল ইসলাম, সিলেটে আব্দুর রহমান আফজাল এবং রাজশাহীতে মোবাশ্বের আলীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
জামায়াতও সিটি করপোরেশনগুলোতে আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিকভাবে মেয়র প্রার্থী ঠিক করছে। দক্ষিণে অনানুষ্ঠানিকভাবে ঠিক করা হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি আবু সাদিক কায়েমকে। উত্তরে মহানগর আমির মুহাম্মদ সেলিমউদ্দিনকে।
দক্ষিণে সাদিক কায়েমের নাম সামনে আসার পর তাঁকে এবং এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে জামায়াত ও এনসিপির কর্মী-সমর্থকরা বাহাসে জড়িয়েছেন। তবে একে গুরুত্ব দিচ্ছেন না দল দুটি নীতিনির্ধারকরা।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা আসিফ মাহমুদ জামায়াতের সঙ্গে এনসিপির জোটের পক্ষে ছিলেন না। গত নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার দিনে পদত্যাগ করা জুলাই অভ্যুত্থানের এই ছাত্রনেতা ঢাকা-১০ আসনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন। বিএনপির সমর্থনে তিনি প্রার্থী হবেন–এমন আলোচনাও ছিল। শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। এনসিপির সঙ্গে জোট গঠনে জামায়াতের শর্ত ছিল, সাবেক উপদেষ্টাদের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না। এই শর্তের কারণে সংসদ নির্বাচন করা হয়নি আসিফের। তবে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে জোটের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি।
জামায়াতের একাধিক নেতা সমকালকে বলেছেন, অতীতে যেসব কারণে আসিফকে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী করা হয়নি, সেগুলো অনেকটাই দূর হয়েছে। কিন্তু সিটি করপোরেশনে তাঁকে সমর্থন করা হবে কিনা, তা অনেক পরের ব্যাপার। সাদিক কায়েম সমকালকে বলেছেন, এখন পর্যন্ত জামায়াত তাঁকে মেয়র প্রার্থী হতে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি। যতটুকু আলোচনা হচ্ছে, সবই অনানুষ্ঠানিক।
একক নির্বাচন পরিস্থিতি বুঝে
সংসদ নির্বাচনে ঢাকার ১৫টি আসনের চারটি এনসিপিকে ছেড়ে দিয়েছিল জামায়াত। এনসিপি ঢাকা দক্ষিণের দুটি আসনেই পরাজিত হয়েছে। জয়ী হয়েছে ঢাকা উত্তরের একটি আসনে। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে বিএনপি থেকে বহিষ্কার নেতা ইসহাক সরকারকে দলে ভিড়িয়ে দক্ষিণে শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করছে এনসিপি।
জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের সমকালকে বলেছেন, মেয়দ পদে কয়েকজনের নাম বিবেচনা করা হচ্ছে। সাদিক কায়েম তাদের একজন। অতীতে বিএনপির সঙ্গে জোট থাকলেও জামায়াত স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে অংশ নিয়েছে। তবে কিছু জায়গায় স্থানীয়ভাবে সমঝোতা করা হতো। এবার নির্দলীয় পদ্ধতিতে স্থানীয় নির্বাচন হবে, তাই এককভাবে এবং স্থানীয় সমঝোতায় ১১ দলীয় ঐক্য প্রার্থী দিতে পারে। কোথায় কী সমঝোতা হবে, তা অনেক পরের ব্যাপার।
এনসিপি সূত্র জানিয়েছে, দেশের ১২টি সিটি করপোরেশনের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, নারায়াণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গাজীপুর সিটি এলাকায় সংসদ নির্বাচনে এক লাখ ৪১ হাজার ভোট পেয়েছেন এনসিপি প্রার্থী। নারায়ণগঞ্জে সিটি এলাকার একটি আসনে জয়ী হয়েছেন এনসিপির প্রার্থী। চট্টগ্রামে দলে টানার চেষ্টা চলছে বিএনপির সাবেক মেয়র মনজুর আলমকে।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সমকালকে বলেছেন, জামায়াত জোটে থাকলেও এখন পর্যন্ত সিদ্ধান্ত এককভাবে নির্বাচন করার। বাকিটা পরিবেশ-পরিস্থিতি বলবে।
জামায়াতের একাধিক নেতা সমকালকে বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হলে এবং এনসিপি তাতে এককভাবে অংশ নিলে তারা নিজেদের অবস্থান বুঝতে পারবে। তাই ইউনিয়ন পরিষদের পরই বলা যাবে, বাকি নির্বাচনগুলোতে জোটের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা। শহরাঞ্চলে পরিস্থিতি কী–এসব বিষয়ের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। চট্টগ্রামে শামসুজ্জামান হেলালীকে মেয়র পদে সমর্থন দেবে জামায়াত। এনসিপি যদি মনজুর আলমকে দলে টানতে পারে, তা তখন দেখা যাবে। কিন্তু ‘জামায়াত সমর্থন দেবে’–এ প্রতিশ্রুতিকে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
তবে জামায়াত ও এনসিপির জ্যেষ্ঠ নেতারা সমকালকে বলেছেন, একক নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও স্থানীয় নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতির প্রভাবের কারণে, অন্তত সিটি করপোরেশনে শেষ পর্যন্ত জোট করতে হবে।
আন্দোলনও একসঙ্গে
১১ দলীয় ঐক্যকে নির্বাচনী জোট আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। তবে ভোটের পর জামায়াত, এনসিপিসহ সব দল বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেয়, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে সরকার অস্বীকার করায় জোট থাকবে। গণভোটের ফল অনুযায়ী সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলবে।
ইতোমধ্যে তিনবার কর্মসূচি পালন করেছে ১১ দল। চতুর্থ দফার কর্মসূচি চলবে আগামী ২৫ জুলাই পর্যন্ত। আগামী তিন মাসে ঢাকার বাইরে সব বিভাগীয় শহরে সমাবেশ করবে এই জোট। এতে শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা অংশ নেবেন।
জামায়াত জোট সংবিধান সংস্কারের দাবি তুললেও, সরকার সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছে। ১৭ সদস্যের কমিটিতে ১২ জনের নামও দিয়েছে। বাকি পাঁচজনের নাম দিতে বিরোধী জোটকে আহ্বান জানিয়েছে। আগামী বাজেট অধিবেশনের আগে এই কমিটি গঠন করতে চায় সরকারি দল। তবে বিরোধী জোট নাম দেয়নি।
জামায়াত ও এনসিপির একাধিক নেতা সমকালকে বলেছেন, তারা দেখতে চান সরকার আসলে শেষ পর্যন্ত কী করে। সরকার যদি ২০১১ সালের মতো একতরফা সংবিধান সংশোধনের দিকে যায়, তাহলে ১১ দল এতে অংশ নেবে না। আবার দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আওয়ামী লীগের ফেরার পথ তৈরি হয়–এমন আন্দোলনও করবে না। বরং সরকারকে চাপে রাখা হবে জুলাই সনদে বর্ণিত উপায়ে অন্তত নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে। এটিই শেষ সীমারেখা, তা সরকার পূরণ না করলে আন্দোলনে যাবে।
আন্দোলনে কতদূর যাবে জামায়াত–এ প্রশ্নে আবদুল্লাহ তাহের বলেছেন, এটি তো পরিস্থিতি ঠিক করবে। সরকার যদি গণভোট মেনে নেয়, তাহলে আন্দোলনের দরকার নেই। আর গণভোটকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করলে, বিরোধী জোটকে রাজপথে ঠেলে দেওয়া হবে।
নাহিদ ইসলাম সমকালকে বলেছেন, আন্দোলন মানে শুধু হরতাল, ভাঙচুর নয়। গণভোটের ফল বাস্তবায়নে ১১ দলীয় ঐক্য একসঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত একসঙ্গেই থাকবে। যেভাবে প্রয়োজন, সেভাবেই আন্দোলন করবে।