বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর নাগরিক সেবা সচল ও স্বাভাবিক রাখতে সবক’টি সিটি করপোরেশনে সাময়িক সময়ের জন্য প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। তবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করা হবে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন ধাপে ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। সবার আগে হবে ঢাকার দুটি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন।
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও বিএনপি ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক দল, বিশেষত; জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ইতোমধ্যে সিটি করপোরেশনকে সামনে রেখে প্রার্থী ঘোষণা ও সংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দুটি দল জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রার্থী নিয়ে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। দুটি দলই সংসদে জোটবদ্ধ থাকার পক্ষে এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন এককভাবে করার পক্ষে। গত ২৯ মার্চ এনসিপি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণসহ পাঁচটি সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে উত্তরে আরিফুল ইসলাম আদিব ও দক্ষিণে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁঁইয়াকে প্রার্থী করেছে এনসিপি। অন্যদিকে গত ১ মে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের থানা দায়িত্বশীল সম্মেলনে দলের রুকনদের প্রত্যক্ষ (গোপন) ভোটে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমকে দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।
আর ঢাকা উত্তর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন দীর্ঘদিন থেকেই প্রার্থী হতে কাজ করছেন। দলের নির্দেশনায় তিনি নানা সেবামূলক কাজে যুক্ত হয়েছেন। যদিও দলটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছেÑ এটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতারা জানিয়েছেন, প্রার্থী চূড়ান্ত করার বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পরে দেয়া হবে। এদিকে দক্ষিণে সাদিক কায়েমের নাম ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনার মধ্যেই অবস্থান পরিষ্কার করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ স্বাক্ষরিত এক জরুরি ঘোষণায় বলা হয়েছে, শিবিরের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কেউ অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে বা প্রার্থী হতে পারবেন না। এমনকি কোনো দল থেকেও তাকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেয়ার সুযোগ নেই। তবে দায়িত্ব শেষে ব্যক্তিগতভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া বা নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
জামায়াত ও এনসিপি সূত্রে জানা যায়, জাতীয় নির্বাচন ১১ দলীয় জোটের ব্যানারে তারা নির্বাচন করলেও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন জোটগতভাবে করার পক্ষে নয় কোনো দলই; বরং এককভাবেই এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চায় তারা। এ জন্য পৃথকভাবে দলকে শক্তিশালী করতে নেতাকর্মীদের মাঠে কাজ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এনসিপি ইতোমধ্যে তাদের দলে বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ইসহাক সরকারসহ বেশ কিছু নেতাকে দলে ভিড়িয়েছে। আরো কিছু নেতাকে দলে টানতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে দলটি। লক্ষ্যÑ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আগেই ঢাকায় এনসিপির সংগঠনকে শক্তিশালী করা এবং নির্বাচনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলা। অন্যদিকে জামায়াতও জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই ওয়ার্ড ও থানায় থানায় তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করেছে। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনে ঢাকার আসনগুলোতে অবিশ্বাস্য ফলাফল অর্জন করায় এখন দলটির আত্মবিশ্বাসও আকাশচুম্বী।
সিটি নির্বাচন প্রসঙ্গে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, কেউ পরামর্শ বা প্রস্তাবনা দিতেই পারে, তবে এটি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। কেন্দ্রীয় জামায়াতে ইসলামী যাকে অনুমোদন দেবে আনুষ্ঠানিকভাবে, ঢাকার মেয়র প্রার্থী হিসেবে তার নামই ঘোষণা করা হবে।
তিনি বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্যই আমাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। সেটি খুব শিগগিরই জানানো হবে। তবে এখনো বিষয়টি কেন্দ্রীয় জামায়াতে ইসলামী থেকে অনুমোদিত হয়নি। সে কারণে আমরা নাম প্রকাশ আনুষ্ঠানিকভাবে করিনি। যদিও কেউ কেউ মেয়র পদে ডাকসু ভিপির নাম প্রচার করছেন। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, স্থানীয় নির্বাচনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি চলছে। তবে এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যেহেতু এটি দলীয় প্রতীকে হচ্ছে না, তাই জোটের শরিকদের সাথে জটিলতারও কোনো প্রশ্ন আসে না। আমরা আমাদের মতো করে দলীয়ভাবে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি।
অন্যদিকে, এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক মাহাবুব আলম বলেন, এখনো নীতিগত কোনো সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়নি। জোটের মধ্যে আলোচনা চলমান রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে যেহেতু দলীয় প্রতীক থাকছে না, এটিই বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য প্রত্যেক দল নিজেদের মতো করে প্রার্থী বাছাই করছে।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে এনসিপির এককভাবেই অংশগ্রহণ করা উচিত। এনসিপির স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হতে হলে আমাদের সাংগঠনিক অবস্থা যাচাই করা দরকার। একটি রাজনৈতিক দলকে কখনো না কখনো সে সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এটি অত্যন্ত উত্তম সময় বলে আমি মনে করি, আর আমাদের সে সক্ষমতা আছে। আপনারা দেখেছেন, আমরা উত্তর-দক্ষিণ উভয় সিটিতেই প্রার্থী ঘোষণা করেছি।
তিনি বলেন, আমরা চাই জোটকেন্দ্রিক ভাবনা সংসদকেন্দ্রিক থাকুক, এটি আর স্থানীয় নির্বাচনে আমরা ভাবছি না। আমাদের মাঠ পর্যায়ে সাংগঠনিক অবস্থা শক্তিশালী করার জন্য একক নির্বাচনের কথা ভাবছি। আর বড় দলের সঙ্গে জোট করলে, বিশেষত জামায়াতের সঙ্গে থাকলে ভালো ফল পাওয়া যাবে; কিন্তু মনেই হবে না যে, একটি আলাদা রাজনৈতিক দল। এ জন্য মাঠপর্যায়ে দলের অবস্থা কেমন তা চেক করার জন্য এককভাবে ভাবতে হবে। ফলাফল যাই ঘটুক না কেন, তা আমরা মেনে নেবো।
আলোচনা শুরু হয়নি বিএনপিতে :
সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে যখন বিরোধী জোটের দুই দল জামায়াত ও এনসিপি প্রার্থী ঘোষণা ও তৎপরতা শুরু করেছে তখন সরকার দল বিএনপি এখনো এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করেনি। দলটির একাধিক নেতা জানান, নির্বাচনের ঘোষণা না আসায় এখনো বিএনপির প্রার্থী কিংবা নির্বাচন নিয়ে কোনো আলোচনা দলের মধ্যে হয়নি। তবে আনুষ্ঠানিক আলোচনা না হলেও ইতোমধ্যে কারা প্রার্থী হতে পারেন, তা আলোচনা চলছে। বিএনপি সূত্রে জানা যায়, ঢাকা উত্তরে বিগত দুটি সিটি করপোরেশনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ছিলেন তাবিথ আউয়াল। এবারো অনেকে তাকে প্রার্থী হিসেবে দেখছেন। কিন্তু তাবিথ আউয়ালের বাবা আবদুল আউয়াল মিন্টু এমপি ও মন্ত্রী হয়েছেন এবং তাবিথ আউয়াল নিজেও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। এ অবস্থায় বিএনপি তাবিথ আউয়ালকে প্রার্থী করবে কি-নাম, এ নিয়ে অনেকে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন। এর বাইরে উত্তরে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে আছেন বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। প্রশাসক হিসেবে তার কর্মকা-কেও ইতিবাচক হিসেবে দেখছে দল। উত্তরের তুলনায় দক্ষিণে বিএনপি প্রার্থীর সংখ্যা বেশি। বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম, বিগত সিটি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ও মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন এবং বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের নাম আলোচনায় রয়েছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানান, উত্তর ও দক্ষিণে বিএনপি যাদেরকেই প্রার্থী ঘোষণা করুক না কেন, নির্বাচনে জামায়াত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারে। কারণ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৪, ঢাকা-৫, ঢাকা-১২, ঢাকা-১৪, ঢাকা-১৫, ঢাকা-১৬ এই ছয়টি আসনে জামায়াত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছে। আর ঢাকা-১১ তে এনসিপি বিজয়ী হয়েছে। এছাড়া ঢাকা-১৮ আসনে এনসিপি প্রার্থী পরাজিত হলেও বিপুল ভোট পেয়েছে। ফলে সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও এর প্রভাব থাকবে। এ জন্য ঢাকার পরীক্ষিত ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদেরকে কাজে লাগাতে হবে। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণে মির্জা আব্বাস, মরহুম সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের ব্যাপক অনুসারী রয়েছে। এই সিটিতে বিজয়ী হতে হলে এই দুই পরিবারকে সাথে রেখেই মাঠে নামতে হবে। অন্যথায় ফলাফল ভিন্ন হতে পারে। ঢাকা উত্তরে বিএনপির আহ্বায়ক ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের প্রভাব রয়েছে, আর নোয়াখালীকেন্দ্রিক বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে বসবাস করেন, যাদের ওপর বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলুর প্রভাব রয়েছে। ফলে তারাও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ক্রীড়নকের ভূমিকায় থাকবেন।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য অ্যাড. সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে এখনো দলে কোনো আলোচনা হয়নি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে তখন প্রার্থীসহ অন্যান্য বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। এখন অনেকেই প্রার্থী হতে চায়, আবার যারা প্রশাসক আছেন তাদেরও পারফরমেন্সের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে দ্রুত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। যেসব সিটি করপোরেশনের মেয়াদ আগে শেষ হবে সেসব জায়গায় নির্বাচন আগে হবে। সে ক্ষেত্রে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন প্রথমে হবে। এরপর ধাপে ধাপে বাকি সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হবে।
তিনি বলেন, ধাপে ধাপে অনুষ্ঠানে সব স্তরের নির্বাচন সম্পন্ন করতে ১০ মাস থেকে এক বছর সময়ের প্রয়োজন হয়। নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে ভোটার তালিকা প্রস্তুত, ভোটের সামগ্রী সংগ্রহ, ধর্মীয় উৎসব, পাবলিক পরীক্ষা, আবহাওয়া, কেন্দ্র চূড়ান্তকরণ ও সংস্কার, নির্বাচনী কর্মকর্তা নির্বাচন ও প্রশিক্ষণÑ ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে তফসিল ঘোষণা করতে হয়। তফসিল ঘোষণার প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে ন্যূনতম ৪৫ দিন প্রয়োজন হয়।