Image description

আন্দামান সাগরের মাঝখানে হাবুডুবু খেয়ে যে ৯ জন জীবিত ফেরত আসতে পেরেছেন, রফিক তাঁদের একজন। গত ২৬ এপ্রিল কক্সবাজারের কলাতলী এলাকায় বসে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তাঁর বয়ানে উঠে আসে অপহরণের শিকার হয়ে জিম্মি রাখা, ট্রলারে তুলে দেওয়া, নির্যাতন, মালয়েশিয়ায় যাত্রার সময় মাঝ সমুদ্রে ট্রলারডুবে বহু মানুষের সলিল সমাধির লোমহর্ষক সব ঘটনার বিবরণ।

রফিকের বয়স ২৪ বছর।

থাকেন কক্সবাজারের কুতুপালং আশ্রয় শিবিরের ৬ নম্বর ক্যাম্পের এ-ব্লকে। স্থায়ী ঠিকানা নাফ নদীর ওপারে মুংডুর কুমারখালীতে। ২০১৭ সালে মায়ানমারের জান্তা সরকারের নিপীড়নের শিকার হয়ে অন্য অনেকের সঙ্গে দেশান্তরী হন। বাংলাদেশে মা-বাবা, স্ত্রী এবং দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকেন।

রফিক জানান, জাতিসংঘের সাহায্য সংস্থা থেকে আগে তাঁদের প্রতি মাসে জনপ্রতি ১২ ডলার সহায়তা দেওয়া হতো। গত দুই মাসে সেটি ১০ ডলারে নেমে এসেছে। আবার কেউ কেউ সাত ডলার পায়। এটা দিয়ে সংসার চলে না।

তাই অনেকেই সাগরপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চিন্তা করে।

তবে তিনি দাবি করেন, গত ২ এপ্রিল বিকেলে কাজের খোঁজে উখিয়া বাজারের উদ্দেশ্যে ক্যাম্প থেকে বের হন। কুতুপালং বাজারে দেখা হয় একই ক্যাম্পের সি-ব্লকের মোহাম্মদ নূরের সঙ্গে। নূর তখন তাঁকে টেকনাফে পেঁয়াজের কাজের প্রস্তাব দেন।

অর্থকষ্টে থাকা রফিক সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান।

তখন বিকেল ৫টা। রফিককে নিয়ে টেকনাফের দিকে রওনা দেন নূর। কিছুদূর গিয়ে পালংখালী ফিলিং স্টেশনের সামনে অন্য একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে দেওয়া হয় রফিককে। নূর তখন জানান, তিনি পরদিন সকালে আসবেন। তাঁকে বসানো হয় সিএনজি অটোরিকশার পেছনে দুজন ব্যক্তির মাঝখানে।

এর পরই শুরু হয় জিম্মিদশা। রফিক কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। প্রায় দেড় ঘণ্টা চলার পর সিএনজি অটোরিকশা গিয়ে থামে ল্যাঙ্গুরবিল নামক একটি নির্জন এলাকায়। সেখানে আট থেকে ১০টি বাড়ি। তাঁকে একটি ঘরে ঢোকানো হয়। তিনি গিয়ে দেখেন, আগে থেকেই ওই ঘরে ছয় ব্যক্তি, সবার হাত-পা বাঁধা। পেঁয়াজের কাজের কথা বলে কোথায় পাঠানো হয়েছে তাঁকে—এই ভেবে চমকে ওঠেন রফিক। ততক্ষণে বুঝে ফেলেন তিনি অপহরণকারী চক্রের ফাঁদে আটকে গেছেন।

কালের কণ্ঠকে রফিক বলেন, সেখান থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। সারাক্ষণ তরুণ-যুবক বয়সী বেশ কয়েকজন পাহারায় থাকে। ফোন কেড়ে নেওয়ায় কারো সঙ্গে যোগাযোগও করতে পারছিলেন না। দরজাও বাইরে থেকে তালাবদ্ধ। সেদিন রাতে আরো ১২ জনকে এনে রাখা হয় তাঁদের সঙ্গে। সেই রাতে খাবারও দেয়নি। ভেতরে ময়লা-দুর্গন্ধ। মল ত্যাগের প্রয়োজন হলে দুজন এসে বাইরে নিয়ে যেত। আর মূত্র ত্যাগের ক্ষেত্রে ঘরের ভেতরেই বোতলে করতে হতো।

পরদিন ৩ এপ্রিল সকাল ১১টার দিকে তাঁদের ভাত দেওয়া হয়। তারপর দুপুরের দিকে একজন পাহারাদার তাঁদের জানায়, ‘তোমাদের সবাইকে আমাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ায় পাঠানো হবে তোমাদের।’

এ কথা শুনেই চিন্তিত হয়ে পড়েন রফিক। শব্দ করলেই লাঠির বাড়ি পড়ত। ফলে চোখ বুজে সেখানে বসে থাকা ছাড়া বিকল্প ছিল না তাঁদের।

৪ এপ্রিল আনুমানিক রাত ৮টা। রফিকসহ সবাইকে ওই বাড়ি থেকে বের করে মেরিন ড্রাইভ সড়ক পার করা হয়। সাগরপারে ছোট সাইজের একটি মাছ ধরার সাম্পানে ওঠানো হয়। স্থানীয়রা এটিকে টাংক নৌকা নামে চেনে। তাঁরা সংখ্যায় আনুমানিক ৪০ জন ছিলেন। এই নৌকাটি দুই ঘণ্টা চলার পর একটি বড় ট্রলারের সামনে গিয়ে থামে।

লোমহর্ষক যাত্রা

নৌকা থেকে ট্রলারে একজন একজন করে হেঁটে যাবে, অত সময় নেই। তাই পাচারকারীদের মধ্যে দুজন নৌকায় দাঁড়িয়ে রফিকদের ধরে চ্যাংদোলা করে ছুড়ে মারে ট্রলারে। ঠিক যেমন ট্রাকের ওপর মালের বস্তা ছোড়া হয়!

প্রথম রাতে ট্রলারের ওপরে ঠাঁই হয় রফিকের। পরদিন সকালে ভেতরে পাঠিয়ে দেয় তাঁকে। ভেতরে গিয়ে দেখেন মাছ রাখার যে বরফঘর, সেখানে একটিতেই গাদাগাদি অবস্থায় অন্তত ২৫ থেকে ৩০ জন। মানুষের গাদাগাদিতে এক পর্যায়ে গরমে অস্থির হয়ে ওঠেন সবাই। গুনে দেখেন মোট ২৭ জন তাঁরা। এ রকম চারটি কোল্ড স্টোরেজের সব মানুষে ভর্তি। ভেতরে আলো-বাতাস ঢোকার কোনো সুযোগ নেই। ঢোকা ও বের হওয়ার ঢাকনাটি খুলে দিলে কিছুটা বাতাস পাওয়া যেত।

রফিক জানান, পালা করে তাঁদের ভেতরে-বাইরে করা হতো। এক দিন পর আবার ওপরে বসার সুযোগ হয় তাঁর। তবে বসে থাকতে হয় একদম গুটিসুটি হয়ে। পা সোজা করলেই পড়ত লাঠির বাড়ি।

তিনি বলেন, ‘দুই লিটার পানি, প্রতিটি ১৫ টাকা দামের ১০ প্যাকেট কোকোনাট বিস্কুট, এক পাতা প্যারাসিটামল সঙ্গে দিয়ে আমাদের ট্রলারে তোলা হয়েছিল। ট্রলারে দুই বেলা খাবার দেয়। সামান্য ভাতের সঙ্গে হলুদ মেশানো মিষ্টিকুমড়া সিদ্ধ।’

৭ এপ্রিল বিকেল ৪টা। ট্রলার তখন গভীর সাগরে। দুপুরের খাবারের পর পানির সংকট দেখা দেয়। বিকেল গড়িয়ে রাত। এক ফোঁটা পানিও মেলে না নির্দয় মাঝিমাল্লার কাছ থেকে। রফিক বলেন, ‘গভীর সমুদ্রে পানির তৃষ্ণায় ছটফট করছিলাম। মনে হচ্ছিল এখনই বুঝি মারা যাব। মাঝিকে বলি, ভাই আমাকে এক ফোঁটা পানি দেন, দুই মিনিটের জন্য জীবনটা ভিক্ষা দেন ভাই। তার পরও মাঝির মনে দয়া হলো না। জীবন বাঁচাতে আমি পরনের জামাটা খুলে সমুদ্রে চুবিয়ে তারপর সেই নোনা পানি খাই। ওই পানি পেটে যাওয়ার পর ভেতরটা যেন জ্বলেপুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল। মনে হলো, এক গ্লাস পানিতে এক কেজি লবণ মেশানো হয়েছে!’

এভাবে আরো কয়েকজন এসে পানি চাইলে হট্টগোল শুরু হয়। পিটিয়ে কোল্ড স্টোরেজে ঢুকিয়ে ঢাকনাটি ওপর থেকে আটকে দেয় ওরা। এর আগে তাঁদের কড়া ভাষায় পাচারকারীরা জানিয়ে দেয়, ‘পিটিয়ে তোদের ১০ থেকে ২০ জনকে মেরে ফেললেও আমাদের কৈফিয়ত দিতে হবে না। শুধু ভাড়াটা কমে যাবে।’ 

ডোবার আগেই মারা যায় অনেকে

ওপর থেকে ঢাকনাটি বন্ধ করে দেওয়ায় ভেতরে অক্সিজেন সংকট দেখা দেয়। বাতাসও নেই। রফিকের ভাষ্য, দমবন্ধ হয়ে অন্তত ৩৩ জন প্রাণ হারায়। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। রফিক নিজেও অচেতন হয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর জ্ঞান ফিরলে দেখেন, তিনি মাঝির কাছে ইঞ্জিনের পাশে পড়ে আছেন।

তখন রফিক শুনতে পান, সৈয়দ মাঝি নির্দেশ দিচ্ছেন, লাশগুলো সাগরে ফেলে দাও। তার কথামতো লাশগুলো ফেলে দেওয়ায় ট্রলারটি একপাশে কাত হতে থাকে। আতঙ্কে শুরু হয় হুড়াহুড়ি। উভয় পক্ষের মধ্যে হট্টগোল আরো জোরালোভাবে বেধে যায়। ট্রলার তখন এ পাশ ও পাশ কয়েকবার দোল খায়। এর মধ্যে কোল্ড স্টোরেজে থাকা লোকজনও ওপরে উঠতে শুরু করে। সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ আগে ট্রলারটি গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যায়।

ইঞ্জিনের পাশে থাকায় রফিকের  সব পিঠ গরম তেলে ঝলসে যায়। এ অবস্থায় শুরু হয় বাঁচার লড়াই। একটি পানির ড্রাম ধরে তাঁরা প্রায় ১০ থেকে ১৫ জন ভেসে থাকেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর তাঁদের সঙ্গে থাকা এক নারী মারা যান।

এভাবে বেশিক্ষণ ওই ড্রাম ধরে ব্যালেন্স রাখতে পারছিলেন না তাঁরা। রফিক অন্য কিছু ধরে ভেসে থাকার চেষ্টা করেন। তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করেন কূল-কিনারা দেখা যায় কি না। কিন্তু না, চারপাশে শুধু পানি আর পানি। 

মনে হচ্ছিল সবাই মারা যাচ্ছি

৮ এপ্রিল বিকেল। দূরে একটি জাহাজ দেখে হাত নাড়ালে একসময় দেখতে পেয়ে কাছে আসে। তবে ভিনদেশি জাহাজটি তাদের ভাষা বুঝতে পারেনি বলে সেটি ফিরে যায়। কাউকেই উদ্ধার করেনি। তখনো সেখানে অন্তত শ-খানেক মানুষ বাঁচার লড়াই করছে। কেউ কেউ লাইফ জ্যাকেট পরে ছিল। অনেকে একটি জ্যাকেট দুজন মিলে পরেছে। কেউ ড্রাম, কেউ কাঠের টুকরা, জালের ফ্লোট ধরে ভাসছিলেন।

আন্দামান সাগরের শীতল পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে কতক্ষণ আর টিকে থাকতে পারবেন রফিকরা? এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে কাঁদতে থাকেন। রফিক বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই মারা যাব। তাহলে আর এত কষ্ট করে কী লাভ? সমুদ্রের লবণ পানি গিলে ডুব দিয়ে মরার চেষ্টা করি। কিন্তু মুহূর্তেই ভেসে আবার ওপরে চলে আসি। এভাবে সেই রাতটিও কেটে যায়।’

৯ এপ্রিল। ভোরের আলো ফুটলে রফিক দেখেন, তখন তারা কেবল পাঁচজন। এর মধ্যে দুজন নারী। সূর্যোদয়ের পর রফিক ভাবলেন, যেদিকে সূর্য উঠেছে, সেদিকে এগিয়ে যাওয়া যায় কি না। তাতে যদি মায়ানমার অথবা বাংলাদেশের সীমানা পাওয়া যায়! তাঁরা সেদিকে সাঁতরাতে থাকেন। কয়েক ঘণ্টা সাঁতরানোর পরও কোনো কূলকিনারা পাওয়া যায়নি।

আর কিছুক্ষণ পর আশার আলো দেখা দিল। পাশ দিয়েই যাচ্ছিল একটি জাহাজ। চিৎকার করে ডাকবেন, সেই শক্তি নেই। হাত নেড়েই সংকেত দিচ্ছিলেন তাঁরা। জাহাজটি কাছে আসে। সৌভাগ্যবশত সেটি ছিল বাংলাদেশি জাহাজ। তাঁদের উদ্ধারের চেষ্টা শুরু হয়। দীর্ঘক্ষণ ঘুরে জাহাজটি ৯ জনকে উদ্ধার করে। সবাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গরম দুধ এবং খাবার দেওয়া হয়। তারপর তাঁদের সবাইকে কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

রফিক জানান, জাহাজে পাচারকারীদের পক্ষে মাঝি এবং লাঠিয়াল মোট ১৩ জন ছিলেন। সর্বোচ্চ দেড় শ জন মানুষের ধারণক্ষমতার ট্রলারে সবমিলে আড়াই শতাধিক মানুষ ছিলেন।