Image description

৯ এপ্রিল দুপুর। চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া ইন্দোনেশিয়াগামী বাংলাদেশি জাহাজ এমটি মেঘনা প্রাইড মাত্রই আন্দামান সাগরে প্রবেশ করেছে। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। এর মধ্যেই জাহাজের ডেক থেকে এক ক্রু দেখতে পান সমুদ্রে একজন মানুষ ভাসছে।

মুহূর্তেই জাহাজজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সতর্কতা। শুরু হয় জীবন-মৃত্যুর এক উদ্ধার অভিযান।

গত শুক্রবার কালের কণ্ঠকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জাহাজটির ক্যাপ্টেন ওমর জাহান বলেন, ঘটনাটি তাদের কাছে শুধু পেশাগত দায়িত্বের বিষয় ছিল না, ছিল গভীর মানবিকতার প্রশ্নও। আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন সোলাস (সেফটি অব লাইফ অ্যাট সি) অনুযায়ী সাগরে বিপদে পড়া যেকোনো মানুষের জীবন রক্ষা করা জাহাজের পেশাগত ও আইনি বাধ্যবাধকতা।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন উদ্ধার অভিযানে একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। জ্বালানি খরচ বাড়ে, চার্টারিং শিডিউল নষ্ট হয়, গন্তব্যে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়, পরবর্তী লোডিং কার্যক্রম পিছিয়ে যায়।

ক্যাপ্টেন জাহানের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার দিকে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা ধরে জাহাজ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে, বাইনোকুলার দিয়ে খুঁজে খুঁজে, প্রায় তিন মাইল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মানুষদের উদ্ধার করা হয়।

দুপুর ১টার দিকে অভিযান শেষ করা হয়। কারণ তখন আশপাশে আর কাউকে দেখা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তাদের মধ্যে আটজন পুরুষ ও একজন নারী ছিলেন।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অবস্থা ছিল ভয়াবহ।

তারা ছিল মৃতপ্রায়। সাগরের লোনা পানি পেটে ঢুকে শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিল সবাই। অনেকের শরীরে কাপড় পর্যন্ত ছিল না। দীর্ঘ সময় লোনা পানিতে ভেসে থাকার কারণে শরীরের চামড়া ঝলসে গিয়েছিল। জাহাজে তোলার পর তাদের নতুন কাপড় দেওয়া হয়, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। প্রথমে সামান্য পানি ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়। পরে পাঁচ-ছয় ঘণ্টা পর, শরীর কিছুটা স্থিতিশীল হলে, ভারী খাবার দেওয়া হয়। ক্যাপ্টেন জানান, জাহাজে ওঠার পর তারা এতটাই ক্লান্ত ও ভেঙে পড়েছিল যে কয়েক ঘণ্টা মরার মতো ঘুমিয়েছিল।

ক্যাপ্টেনের বর্ণনায়, উদ্ধারস্থলটি ছিল সেন্ট মার্টিন উপকূল থেকে প্রায় ৪০০ নটিক্যাল মাইল দূরে। সেখান থেকে আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের একটি ছোট দ্বীপের দূরত্ব ছিল প্রায় ১৫ থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল। কিন্তু সেই দূরত্বও বাস্তবে তাদের কাছে অতিক্রম করার মতো ছিল না। কারণ সাগরে তখন তিন থেকে চার নট গতির প্রবল স্রোত ছিল।

ক্যাপ্টেন বলেন, ওই অবস্থায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সাঁতরে কোনো দ্বীপে পৌঁছানো মিরাক্কল ছাড়া সম্ভব নয়। জাহাজ ঘুরিয়ে উদ্ধার করতেও তাদের বেগ পেতে হয়েছে। উদ্ধার করতে বয়া ছুড়ে দিতে হয়েছে। কারণ ভাসমান মানুষগুলো এতটাই দুর্বল ছিল যে নিজেরা জাহাজের কাছে আসার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছিল।

ক্যাপ্টেন জানান, স্বাভাবিক হওয়ার পর উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে ঘটনার বর্ণনা জানতে চান তিনি। তারা কক্সবাজার উপকূল থেকে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল। তাদের ভাষ্যমতে, ৪ এপ্রিল রাতে ট্রলারটি যাত্রা করে। ৭ বা ৮ এপ্রিল ভোরের দিকে সেটি ডুবে যায়। কেউ বলেছে তারা ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টা সাগরে ভেসেছিল, কেউ বলেছে তিন দিন। তবে ক্যাপ্টেন জাহানের মতে, ট্রমার মধ্যে থাকায় তাদের সময়ের হিসাব এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। দীর্ঘ সময় লোনা পানিতে ভেসে থাকা মানুষের পক্ষে সঠিক সময় বলা কঠিন। তা ছাড়া তিন দিন সাগরের লোনা পানিতে ভেসে থাকা প্রায় অসম্ভব বলেও তিনি মনে করেন। 

ক্যাপ্টেনের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল, নৌকাটি কোনো ঝড়ের কবলে পড়ে ডোবেনি। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে তারা ধারণা করেন, অতিরিক্ত যাত্রী, ভেতরের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ এবং মাঝিদের সঙ্গে যাত্রীদের ধাক্কাধাক্কি থেকেই ট্রলারটি ডুবে যায়। ক্যাপ্টেন বলেন, বোটের খোলের ভেতরে যখন দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তখন কয়েকজন ওপরে উঠে ফ্রেশ এয়ার নিতে চেয়েছিল। এ নিয়ে মাঝিদের সঙ্গে তাদের হাতাহাতি ও মারামারি শুরু হয়। একপর্যায়ে সবাই বোটের একদিকে চলে গেলে নৌকাটি কাত হয়ে উল্টে যায়। 

ক্যাপ্টেন বলেন, ‘আমরা যখন সমুদ্রে ভাসমান একজনকে দেখতে পাই, সঙ্গে সঙ্গে জাহাজটি ঘুরিয়ে তার কাছে পৌঁছে যাই। তারপর অবস্থা বুঝে আমরা চারপাশে প্রায় তিন নটিক্যাল মাইল ঘুরে ঘুরে বাইনোকুলার দিয়ে খুঁজেছি। এভাবে ৯ জনকে উদ্ধার করেছি। কিন্তু তারা সবাই একসঙ্গে বা কাছাকাছি জায়গায় ছিল না। তারা প্রায় তিন মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। আমরা বাইনোকুলার দিয়ে দেখে দেখে জাহাজ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তাদের উদ্ধার করেছি। কেউ এক জায়গায় ছিল, আবার কেউ মাইল খানেক দূরে। 

তিনি বলেন, ‘উদ্ধার করার সময় পুরো পরিস্থিতি আমি মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছি। তখন দেখেছি, ওই মানুষগুলো কেউ ড্রাম ধরে ভেসেছিল, কেউ কাঠের টুকরা, কেউ জালের ফ্লোট আবার কিছু ভাসমান বস্তু আঁকড়ে ছিল। তারা নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। হয়তো আর বেশি সময় টিকতেও পারত না।’

তিনি আরো জানান, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা বলেছিল, তাদের আগে আরেকটি জাহাজ পাশ দিয়ে চলে গেলেও উদ্ধার করেনি। ক্যাপ্টেনের মতে, এটিই সাগরের কঠিন বাস্তবতা। অনেক জাহাজ অবৈধ অভিবাসী উদ্ধার করলে আইনি, কূটনৈতিক ও বন্দরসংক্রান্ত জটিলতায় পড়ার আশঙ্কায় এমন ঘটনা এড়িয়ে যায়। 

উদ্ধারের পর নতুন জটিলতা তৈরি হয় তাদের কোথায় নামানো হবে, তা নিয়ে। ক্যাপ্টেন জানান, অবৈধ অভিবাসনপ্রত্যাশী হওয়ায় কোনো দেশের বন্দর তাদের গ্রহণ করতে চাইবে না—এটা প্রায় নিশ্চিত। তখন বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের ডিজি শিপিং এবং কোস্টগার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হয়, তাদের বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ৯ এপ্রিল উদ্ধার অভিযান শেষে জাহাজটি সেন্ট মার্টিন উপকূলের দিকে রওনা দেয়। ১১ এপ্রিল মধ্য রাতে কোস্টগার্ডের ‘মনসুর আলী’ জাহাজে উদ্ধার হওয়া ৯ জনকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

তিনি জানান, উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা—উভয়ই ছিল। তাদের নাম-ঠিকানা ও প্রাথমিক তথ্য কোস্টগার্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।