Image description

কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকা থেকে অপহরণের পর প্রথমে বাহারছড়ার নির্জন জঙ্গলে জিম্মি করা হয়, তারপর তাদের তুলে দেওয়া হয় মাছ ধরা ট্রলারে। সেখানে আবার যোগ হয় মালয়েশিয়া যাওয়ার প্রলোভনের টানে ছুটে আসা নারী-পুরুষ। এভাবে ২৬২ জনকে জড়ো করে শুরু হয় একটি ট্রলারের ভয়ংকর সমুদ্রযাত্রা। চারদিন পর মাঝ সমুদ্রে প্রতারকচক্রের পৈশাচিক আচরণের এক পর্যায়ে জিম্মিদের সঙ্গে শুরু হয় হট্টগোল-মারামারি।

টালমাটাল ট্রলারটি আন্দামান সাগরে ডুবে করুণ পরিণতি ঘটে ২৬৫ নারী-পুরুষের। গভীর সাগরে হাবুডুবু খেতে খেতে একসময় নাটকীয়ভাবে উদ্ধার পান ৯ জন।

লোমহর্ষক এই অপহরণ-প্রলোভন ও জিম্মি-মুক্তিপণ কারবারের আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানের মাধ্যমে জানা যায়, কক্সবাজারকেন্দ্রিক ভয়ংকর এক প্রতারকচক্র এখন সক্রিয় নিরীহ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নারী-পুরুষের জীবন নিয়ে জুয়াখেলায়।

এক পলকে শুরু ও শেষ   

৪ এপ্রিল ২০২৬, রাত সাড়ে ৮টা।

কক্সবাজারের বাহারছড়া থেকে একটু দূরের সমুদ্র। ৪২ ফুট দৈর্ঘ্য, ১৫ ফুট প্রস্থ আর ১২ ফুট উচ্চতার একটি মাছ ধরা ট্রলার ধীরে ধীরে চলতে শুরু করে। কিন্তু ট্রলারে কোনো মাছ নেই, নেই কোনো পণ্য। ভেতরের কোল্ড স্টোরেজ আর ওপরে প্রতি ইঞ্চি জায়গাজুড়ে ভাঁজে ভাঁজে শুধু মানুষ আর মানুষ।
 
নারী, শিশু, তরুণ, যুবক। সংখ্যায় প্রায় পৌনে তিন শ। গন্তব্য মালয়েশিয়া।

চার দিন সাগরে ভেসার পর ৭ এপ্রিল রাত শেষে ভোর। সূর্য তখনো ওঠেনি।

ঠিক সেই মুহূর্তে ট্রলারজুড়ে নেমে আসে ভয়াবহ ট্র্যাজেডি। প্রথমে হট্টগোল-মারামারি, তারপর হুড়াহুড়িতে অতিরিক্ত বোঝাই ট্রলারটি একদিকে কাত হয়ে যায়। শুরু হয় আর্তচিৎকার। জনা বিশেষ নারী, ছয় শিশুসহ শত শত মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছটফট করতে থাকে। নিমেষেই ডুবে যায় ট্রলারটি। নিচের অন্ধকার কুঠুরিতে আটকে পড়া বহু মানুষ বেরই হতে পারেননি। ট্রলারসহ তাঁরা উধাও হয়ে যান আন্দামান সাগরের অতলে।

যাঁরা ওপরে ছিলেন কিংবা কোনো মতে বের হতে পেরেছিলেন, তাঁদের শুরু হয় গহিন সাগরের নোনাজলের সঙ্গে জীবন-মরণ যুদ্ধ। কেউ ড্রাম ধরে ভাসছেন, কেউ কাঠের টুকরা, জালের ফ্লোট কিংবা ভাসমান কোনো বস্তু আঁকড়ে ধরে। তীব্র স্রোতের সঙ্গে প্রাণপণ লড়াই চলতে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

৩৬ ঘণ্টা পর ৯ এপ্রিল সকালে ইন্দোনেশিয়াগামী একটি বাংলাদেশি জাহাজ যাচ্ছিল সেই পথ ধরে। ডেকের এক ক্রু দেখলেন সমুদ্রে কেউ যেন ভাসছে। কেউ যেন হাত নেড়ে ইশারায় বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। মুহূর্তেই খবর পৌঁছে যায় জাহাজের ক্যাপ্টেনের কাছে। শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। প্রায় তিন ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধার করা যায় মাত্র ৯ জনকে। আশপাশে কয়েক নটিক্যাল মাইল ঘুরে দুরবিন দিয়ে খুঁজেও আর কারো দেখা মেলেনি।

এরপর কেটে গেছে ২৫ দিন। কিন্তু হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলো আর ফেরেননি। তাঁদের অপেক্ষায় দিন গুনছেন স্বজনরা। কোথাও মা, কোথাও বা স্ত্রী ঘরের দুয়ার খুলে বসে আছেন পথ চেয়ে, এই বুঝি প্রিয় মানুষটি ফিরে এলেন! এই বুঝি ফোনটা বেজে উঠল! আন্দামান সাগরে তলিয়ে যাওয়া এই ভয়াবহ ট্র্যাজেডির ক্ষত এখন কক্সবাজারের নানা প্রান্তে।

শতাধিক পরিবার, ফিরে আসা তিন ভুক্তভোগী, উদ্ধারকারী জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং কারাবন্দি অভিযুক্ত মাঝির সঙ্গে কথা বলে, অনুসন্ধান করে পাওয়া গেছে এই ভয়াবহ অপহরণ ও মানবপাচার-ট্র্যাজেডির পূর্ণ চিত্র।

গত মাসের প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়াগামী এই ট্রলারডুবির ঘটনায় হতবাক বিভিন্ন মহল। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ট্রলারটিতে আড়াই শর বেশি মানুষ ছিল। তাদের মধ্যে শতাধিক বাংলাদেশি এবং বাকিরা কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গা।

এই ঘটনার নেপথ্যের কাহিনি জানতে শুরু হয় কালের কণ্ঠের অনুসন্ধান। ঢাকা থেকে ছুটে যাই কক্সবাজারের টেকনাফে। শাহপরীর দ্বীপ, দক্ষিণপাড়া, উত্তরপাড়া, উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প, অপহরণ ও মানবপাচারের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট সরেজমিনে দেখার পর আমরা চলে যাই কক্সবাজার জেলা কারাগারে। মানবপাচারের শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের কথা শুনতে যাই চকরিয়া, রামু, বাঁশখালী; এমনকি চট্টগ্রামের মিরসরাইতেও। শুধু তাই নয়, সাগরপথে মানবপাচারের ভয়াবহতার তালাশ চলে সুদূর মালয়েশিয়ায় সরেজমিন গিয়ে।

প্রায় তিন সপ্তাহের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অপহরণ ও প্রলোভনের মাধ্যমে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের ভয়াবহ জিম্মি কাহিনি বেরিয়ে আসে। অপহরণ করে মালয়েশিয়ায় বিক্রি করে দেওয়ার তথ্য যেমন আছে, আবার মুক্তিপণের জন্য দেশে-বিদেশে জিম্মি করে রাখার মতো ভয়াবহ ঘটনার সন্ধানও পাওয়া গেছে অনুসন্ধানে।

অপহরণ-প্রলোভনের মালয়েশিয়াযাত্রা

গত ২৫ এপ্রিল কক্সবাজারের কলাতলী মোড় থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে রওনা হই টেকনাফের উদ্দেশে। মেরিন ড্রাইভ দিয়ে ইনানী হয়ে শামলাপুর পার হতেই নির্জন এলাকা। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে টেকনাফে পৌঁছে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় একা মেরিন ড্রাইভ হয়ে কক্সবাজার থেকে টেকনাফে নিরাপদে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে আমার—এটি যেন তাদের কাছে এক মহাবিস্ময়!

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারের কলাতলী মোড় ও টেকনাফের ঝরনা চত্বরে সক্রিয় রয়েছে সংঘবদ্ধ অপহরণকারী চক্র। সেখানে অবস্থান করছে একাধিক সিএনজি ও টমটম, যেগুলোর বেশির ভাগ মূলত অপরিচিত যাত্রীদের টার্গেট করে। চক্রের সদস্যরা কৌশলে যাত্রী তুলেই তাদের নির্জন ও আতঙ্কিত এলাকায় নিয়ে যায়। আগেভাগে সংকেত পাঠানো হয় চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে, ফলে গন্তব্যস্থলে অস্ত্রসহ প্রস্তুত থাকে অপহরণকারীরা। যাত্রীকে অপহরণকারীর কাছে মাত্র ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন চালকরা। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের বেশ কিছু ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।

অপহরণ করে দুর্গম পাহাড়ি জঙ্গলে গড়ে তোলা বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। আদায় করা হয় মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ। অন্যথায় ভুক্তভোগীদের বিক্রি করে দেওয়া হয় অন্য পাচারকারী চক্রের কাছে। পরবর্তী সময়ে শুরু হয় আরো ভয়াবহ নির্যাতন। পরিবারের কাছে পাঠানো হয় নির্যাতনের অডিও-ভিডিও। কারো সামনে থাকে মুক্তিপণ দিয়ে বাঁচার শেষ সুযোগ, আবার অনেককে জোর করে তুলে দেওয়া হয় মালয়েশিয়াগামী নৌকায়। অনেকেই ফিরে আসেন লাশ হয়ে, কেউ ভেসে ওঠেন সাগরে।

কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে অপহরণের শিকার কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পান্টি গ্রামের তরুণ রেজাউল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, দুষ্কৃতকারীরা তাঁকে চোখ বেঁধে পাহাড়ি আস্তানায় নিয়ে যায় এবং স্থানীয় মানবপাচারকারীদের কাছে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়।

রেজাউল বলেন, ‘চোখের বাঁধন খুলে দেখি, শত শত মানুষ বন্দি। পাহাড়ের গভীরে গড়ে উঠেছে এক অন্ধকার রাজ্য, যেখানে মানুষের দাম টাকায় নির্ণন করা হয়। আমি ১৫ দিন ওই আস্তানায় বন্দি ছিলাম। পরে আমাকে আবারও ৬০ হাজার টাকায় অন্য এক পাচারকারীর কাছে বিক্রি করা হয়। সেখান থেকে সুযোগ বুঝে পালিয়ে বিজিবির কাছে আশ্রয় নিই।’

এই ঘটনাটি গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বরের। রেজাউলের তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ বাহিনী অভিযান চালিয়ে ওই জিম্মিদশা থেকে ৮৩ জনকে উদ্ধার করে।

সেখানকার একজন মুন্সীগঞ্জের অমিত হাসান। তিনিও বেড়াতে গিয়ে অপহরণের শিকার হন। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, যাঁরা মালয়েশিয়া যেতে অস্বীকার করতেন, তাঁদের পরিবারের কাছে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হতো। আর যাঁরা রাজি হতেন, তাঁদের কাছ থেকে আদায় করা হতো চার-পাঁচ লাখ টাকা। পরে তাঁদের সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী নৌকায় তুলে দেওয়া হতো।

ওই আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া টেকনাফের নয়াপাড়া এলাকার আয়েশা খাতুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি আমরা। বাহারছড়া ইউনিয়নের কচ্ছপিয়া পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে তিনি অপহৃত হন। পরে তাঁকে মানবপাচারকারীদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। একটি পাহাড়ি বন্দিশালায় গাদাগাদি করে আটকে রেখে ছয় দিন ধরে নির্যাতন চালানো হয় মুক্তিপণের জন্য।

আয়েশা বলেন, ‘সেদিন বিজিবি উদ্ধার না করলে হয়তো মরেই যেতাম। কেননা সেখান থেকে পালানোর কোনো সুযোগই ছিল না।’ 

৫০ হাজারে কিনে চার লাখে বিক্রি

অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমরা এমন কয়েকটি পরিবারের খোঁজ পাই, যারা সরাসরি স্থানীয় দালালচক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। এই পরিবারগুলোর দাবি, তাদের সন্তানদের ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় দালালের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এরপর মালয়েশিয়া পৌঁছতে সমর্থ হলে সেখানে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায় করে। ক্ষেত্রবিশেষে সে দেশে কোনো কম্পানিতে তাকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বিনিময়ে পাওয়া যায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা।

টেকনাফ সদর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে সাবরাং ইউনিয়নের উত্তর পাড়ায় ঢুকতেই শাহপরীর দ্বীপ সড়কের ডান পাশে একটি টিনশেড ঘর। ঘরের দরজার বসে বিলাপ করছিলেন হারুনুর রশিদের বাবা জাফর আলম। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই বলে ওঠেন, ‘দালাল সাইফুল ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে আমার ছেলেকে মৌলভি শফিকের কাছে বিক্রি করে দিয়েছে। তারপর শফিক ট্রলারে তুলে দিয়েছে। আমার জলজ্যান্ত ছেলেটা কোথায় হারিয়ে গেল!’

শাহপরীর দ্বীপের দক্ষিণ পাড়ায় বেড়িবাঁধের কাছে ছোট্ট একটি ঘর। চারপাশে ত্রিপল দিয়ে বেড়া আর ত্রিপলের ওপর নারকেলগাছের পাতা দিয়ে মাথা গোঁজার ব্যবস্থা। দরজায় বসে সমুদ্রের দিকে অপলক তাকিয়ে খালেদা বেগম। ছেলে জয়নালের জন্য এভাবেই প্রতিদিন বসে থাকেন তিনি।

এই মা বিলাপের সুরে বলেন, ‘শুদ্ধ চাচায় লই যাইয়েরে পোয়ারে বেছি ফেইল্যে (আপন চাচা আমার ছেলেকে বিক্রি করে দিয়েছে)।’ খালেদার ভাষ্য, ট্রলারে তুলে দেওয়ার দুই দিন পর এসে জয়নালের চাচা মোহাম্মদ ইউনূস তাঁদের খবরটি জানান। এর আগে তাঁরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি।

এদিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের ৬ নম্বর ক্যাম্পের এ ব্লকের বাসিন্দা রফিককে অপহরণকারীদের কাছে বিক্রি করে দেয় মোহাম্মদ নূর নামে আরেক রোহিঙ্গা শরণার্থী। বাহারছড়ার নির্জন পাহাড়ে একটি বাড়িতে তাকে আটকে রেখে পরিবারের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করে। তার পরও রফিককে জোর করে তুলে দেওয়া হয় ট্রলারে।

গত ২৬ এপ্রিল কালের কণ্ঠের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে রফিক জানান, গত ২ এপ্রিল বিকেলে কাজ দেওয়ার কথা বলে পূর্বপরিচিত নূর তাকে টেকনাফে নিয়ে যায়। এরপর তাকে বিক্রি করে দেয় অপহরণকারীদের কাছে।

অপহরণকারী চক্রের সদস্য নূরকে মুক্তিপণের টাকা নগদে পরিশোধ করা হচ্ছে—এমন একটি ভিডিও ফুটেজ আমাদের হাতে আসে। এতে দেখা যায়, ৫০০ টাকা নোটের বান্ডেল গুণে বুঝে নিচ্ছে নূর। কিন্তু টাকা নিয়েও রহস্যজনক কারণে রফিককে মুক্তি না দিয়ে ৪ এপ্রিল রাতে অন্যদের সঙ্গে ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়।

বেঁচে ফেরা রফিক জানান, এ ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছেন। তবে ঘটনার পর থেকে নূর ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে গেছে। তাকে কোথাও দেখা যায়নি। মোবাইল ফোনও বন্ধ রেখেছে।

শাহপরীর দ্বীপের মিস্ত্রিপাড়ার ১৬ বছরের কিশোর আবসারও অপহরণের শিকার। পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় দালাল মাহবুবুর রহমান ওরফে মাম্মা আবসারকে চাকরির কথা বলে অপহরণ করে। এরপর তাকে সাগরপথে পাচার করে দেয়।

টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, সর্বশেষ ১৬ মাসে এ থানায় ৩২টি অপহরণের মামলা হয়েছে। তবে বেশির ভাগই মাদকসংক্রান্ত ঘটনা বলে মনে করেন তিনি। অবশ্য তিনি চার মাস ধরে এখানে দায়িত্ব পালন করছেন বলে এর চেয়ে বেশি তথ্য জানাতে পারেননি। 

প্রলোভনের ফাঁদে তরুণরা

টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া স্কুলের পাশ দিয়ে একটু সামনে এগোলেই এনায়েত উল্লাহর বাড়ি। ২২ বছরের এই তরুণ পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে পড়ে গত ৪ এপ্রিল দুপুরে বাড়ি ছাড়েন। ট্রলারডুবির পর তিনি নিখোঁজ।

বাড়িতে বসে কথা হয় এনায়েতের বড় ভাই আবদুল্লাহ এবং ছোট বোন সুমাইয়ার সঙ্গে। তাঁরা জানান, এই পরিবারের দুই ছেলে বিদেশে আছেন। কিছুদিন আগে নতুন দালান নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। এনায়েত দেখভাল করত। কেউ ভাবতেই পারেনি সে এভাবে প্রলোভনে পড়ে সমুদ্রযাত্রায় শামিল হতে পারে।

এর মাত্র দুই দিন আগে কক্সবাজার পাসপোর্ট অফিস থেকে নিজের পাসপোর্টটি সংগ্রহ করেছিল এনায়েত উল্লাহ। সমুদ্রসৈকতে দাঁড়িয়ে পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ছবি ও ভিডিও ধারণ করে সেগুলো ফেসবুক আইডিতে শেয়ারও দেন। ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘হয়তো এটাই আমার শেষ কক্সবাজার আসা, আর হয়তো কক্সবাজার আসা হবে না। বন্ধুরা, আমার জন্য দোয়া কোরো।’

আবদুল্লার ভাষ্য, পাসপোর্ট করার পরও সে এভাবে সমুদ্রপথে যাওয়ার চিন্তা করবে—এটা কেউ ঘূর্ণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি। এনায়েত একা যাননি, সঙ্গে ছিল তাঁরা পাঁচ বন্ধু। তাঁর চার বন্ধু হলো—রাসেল, ফিরোজ মিয়া, আরাফাত ও আবদুল মাবুদ। সবাই প্রতিবেশীও।

এঁদের মধ্যে ফিরোজের স্ত্রী জান্নাতুল ইমার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ফিরোজ মাঝেমধ্যে গাড়ি চালাতেন, আবার সাগরে মাছও ধরতেন। তাহসিন নামে তাঁদের দুই বছরের একটি ছেলে রয়েছে। স্ত্রী-সন্তানের মায়া ছাড়িয়ে ফিরোজ চুপিসারেই চলে যায়। ইমা জানান, এমন কোনো ইঙ্গিত আগে পাওয়া যায়নি। দালালের প্রলোভনে পড়ে সে সমুদ্রপথে পা বাড়িয়েছে।

শাহপরীর দ্বীপ দক্ষিণপাড়ার হোসেন আলীর ছেলে মোহাম্মদ ফরিদ (১৮) প্রলোভনে পড়ে ছুটে যায় গত ৪ এপ্রিল বিকেল ৩টার দিকে। তার মা লায়লা বেগম জানান, সেদিন ঘর থেকে জরুরি জিনিসপত্র নিয়েই দৌড় দেয় ফরিদ। কোথায় যাস—জানতে চাইলে ফরিদ তখন জানায়, ‘ফারুক বলেছে, চার দিনের মধ্যেই পৌঁছিয়ে দেবে।’ আর কোনো কথার সুযোগ না দিয়ে এক দৌড়ে চলে যায় ছেলেটি।

লায়লা জানান, ফরিদকে সৌদি আরবে পাঠাতে একটি এজেন্সিতে পাসপোর্টও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিবেশী দালাল ফারুকের প্রলোভনে পড়ে সে ভুলপথে পা বাড়ায়। পরবর্তী সময়ে দালাল ফারুক নিজেই ট্রলার ডুবে যাওয়ার খবরটি জানায়।

(অপহরণ ও পাচারচক্রের বিষয়ে অনুসন্ধানে তথ্য আগামীকালের পর্বে)

যেভাবে ট্রলারটি ডুবে যায়

এ ঘটনায় জীবিত ফিরে আসা তিনজন যাত্রী ও মাঝির সঙ্গে আলাপ করে ট্রলারডুবির কারণ সম্পর্কে একটি পূর্ণ ধারণা পাওয়া গেছে। তাদের ভাষ্য মতে, টেকনাফের বাহারছড়াসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর থেকে মাছ ধরার ট্রলারটি ৪ এপ্রিল রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার দিকে রওনা দেয়। চার দিন চার রাত সাগরে ভেসে থাকার পর আন্দামান সাগরে প্রবেশের কিছু সময় পর এটি দুর্ঘটনায় পড়ে।

তাদের ভাষ্য মতে, আন্দামান সাগরের প্রবেশের কিছুক্ষণ পর ট্রলারে হট্টগোল বেধে যায়। গাদাগাদি করে বসে থাকা শতাধিক মানুষের চোখে তখন শুধু আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা। হঠাৎই শুরু হয় তৃষ্ণার আর্তনাদ। পানি চাই পানি চাই বলে চিৎকার করতে থাকে অনেকে। কিন্তু সেই আর্তনাদে সাড়া মেলেনি; বরং নেমে আসে নির্মমতা।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে জানা যায়, ৭ এপ্রিল রাতে পানি চাইলে যাত্রীদের ওপর চালানো হয় নির্বিচার মারধর। এক ফোঁটা পানিও দেওয়া হয়নি। উল্টো অনেককে পিটিয়ে ট্রলারের নিচের স্টোরেজে ঢুকিয়ে ওপর থেকে ঢাকনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ হয়ে যায় বাতাসের পথ। ভেতরে শুরু হয় দমবন্ধ হওয়া চিৎকার। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তব্ধতা। অক্সিজেনের অভাবে একই রাতে প্রাণ হারায় অন্তত ৩৩ জন।

রফিক জানান, মৃতদেহগুলো বেশিক্ষণ রাখা হয়নি। মাঝির নির্দেশ, ‘লাশ ফেলে দাও।’ এক এক করে সাগরে ফেলা হতে থাকে নিথর দেহগুলো।  কিন্তু সেখানেই ঘটে নতুন বিপর্যয়। লাশ ফেলার পর ট্রলার ভারসাম্য হারিয়ে একদিকে কাত হয়ে পড়ে। এরপরই ভেতরে ঢুকতে শুরু করে পানি। পানি ঢুকতেই শুরু হয় হুড়াহুড়ি। কেউ বের হতে চাইছে, কেউ ওপরে উঠতে চাইছে। ট্রলার দুলছে, একবার এপাশে, একবার ওপাশে। ভেতরে আটকে থাকা মানুষ ওপরে তোলার চেষ্টা চললেও সময় ফুরিয়ে আসে দ্রুত। সবাইকে তোলা যায়নি। এর মধ্যেই ট্রলারটি পুরোপুরি ডুবে যায়।

৩৬ ঘণ্টা পর ৯ জনকে উদ্ধার

৯ এপ্রিল সকালে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া ইন্দোনেশিয়াগামী জাহাজ এম টি মেঘনা প্রাইডের ডেক থেকে একজন ক্রু আন্দামান সাগরে একজন মানুষকে ভাসতে দেখেন। তারপর শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। কালের কণ্ঠের সঙ্গে জাহাজের ক্যাপ্টেন ওমর জাহানের সাক্ষাৎকারে উঠে আসে ওই মুহূর্তের বিস্তারিত চিত্র।

গত ১ মে শুক্রবার মোবাইল ফোনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ক্যাপ্টেন জাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন সোলাস-৩৩ রেগুলেশনস অনুযায়ী, সাগরে বিপদে পড়া মানুষের জীবন রক্ষা করতে তাঁরা বাধ্য। আবার এর সঙ্গে মানবিক দিকও রয়েছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকেই তাঁরা তিন থেকে চার ঘণ্টার অভিযানে প্রায় তিন মাইল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৯ জনকে উদ্ধার করেন।

ক্যাপ্টেন বলেন, উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের অবস্থা ছিল ভয়াবহ। নোনা পানি পেটে ঢুকে শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত, অনেকের শরীরে কাপড় পর্যন্ত ছিল না। বেশির ভাগের চামড়া ঝলসে গেছে। 

ক্যাপ্টেন আরো বলেন, ঘটনাস্থলটি ছিল সেন্ট মার্টিন থেকে অন্তত ৪০০ নটিক্যাল মাইল দূরে। সেখান থেকে প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে নিকোবার আইল্যান্ড। কিন্তু সমুদ্রে স্রোতের যে তীব্রতা ছিল, তাতে স্বাভাবিকভাবে কোনো মানুষের পক্ষে সাঁতরে অতদূর যাওয়া অসম্ভব।

উদ্ধারকৃতদের ১১ এপ্রিল রাত ২টায় কোস্ট গার্ড জাহাজ মনসুর আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় কোস্ট গার্ডের চিফ পেটি অফিসার এম শাসছুল আলম মিয়া বাদী হয়ে টেকনাফ থানায় একটি মামলা করেন। উদ্ধারকৃত ৯ জনের মধ্যে ছয়জন প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাচারকারীচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁরা বর্তমানে কক্সবাজার জেলা কারাগারে বন্দি আছেন। রফিকসহ বাকি তিনজনই রোহিঙ্গা শরণার্থী। অন্য দুজন হলেন এনাম উল্যাহ ইমরান ও রাহেলা বেগম।

রফিক পুরো ঘটনা নিয়ে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার বেশির ভাগের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে বাকি দুজনের কথায়ও। ইমরান জানান, তাঁকে উখিয়ার ইনানি এলাকা থেকে ট্রলারে তোলা হয়েছিল। ট্রলার ডোবার সময় চারদিকে মানুষের চিৎকার আর আল্লাহর নাম ও কালিমা পড়ার শব্দ শুনতে পান তিনি।

ইমরান বলেন, ‘ট্রলার ডুবে যাওয়ার পর সবাই ছিটকে আলাদা হয়ে যায়। আমার হাতে একটি পানির ট্যাংকি ছিল, সেটি ধরে ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেছি। আল্লাহর অশেষ রহমতে একটি জাহাজ আমাদের উদ্ধার করে পরে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের কাছে হস্তান্তর করে।’

অন্যদিকে উখিয়ার একটি ক্যাম্পে কথা হয় রাহেলার সঙ্গে। গরম ইঞ্জিনের তেল ও সমুদ্রের পানি মিশে যাওয়ায় তাঁর হাত ও শরীরে পোড়ার ক্ষতচিহ্ন রয়েছে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ৩০ মার্চ বাড়ি থেকে বের হই। তিন দিন দালালের আস্তানায় বন্দি থাকার পর টেকনাফের রাছারছড়া ঘাট থেকে ছোট নৌকায় উঠি। চার ঘণ্টা চলার পর আমাদের বড় ট্রলারে তোলা হয়।’

তিনি বলেন, ‘দুই দিন এক রাত সমুদ্রে ভেসে থাকার পর আমি যে কাঠের টুকরোটি ধরে ছিলাম, সেটিও উল্টে যায় এবং আমি তা হারিয়ে ফেলি। সেই মুহূর্তে আমি জ্ঞান হারাই। জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর আমি দেখি যে আল্লাহ একটি জাহাজ পাঠিয়েছেন। জাহাজটি আমাকে উদ্ধার করে। আমি কখনো ভাবিনি যে বেঁচে ফিরব। জিম্মিদশার দ্বিতীয় অধ্যায় মালয়েশিয়ায়

সাগরপথে মানবপাচারসংক্রান্ত অনুসন্ধানে মার্চের শেষ সপ্তাহে আমরা মালয়েশিয়া সফর করি। সে দেশে গিয়ে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গার সঙ্গে আলাপ করি, যারা ট্রলারে করে সাগরপথে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন। তাঁদের বয়ানে উঠে এসেছে জিম্মি রেখে ভয়াবহ নির্যাতনের কাহিনি। মালয়েশিয়া পৌঁছার পরই দেখা যায় দালালচক্রের ভয়ংকর রূপ। মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে চলে জিম্মি কাহিনি।’

কুয়ালালামপুরের প্রাণকেন্দ্র বুকিত বিনবাংয়ের তেংকাত তংসিন এলাকায় একটি ক্যাফেতে বসে কথা হয় শাহীন আলমের সঙ্গে। তিনি সাগরপথে ট্রলারে করেই মালয়েশিয়া যান ২০২৩ সালের নভেম্বরে। শাহীনের কথায়ও সমুদ্রযাত্রার সেই একই তথ্য জানা যায়। বেশির ভাগ কাহিনি একই।

মালয়েশিয়া পৌঁছার পরে যে জিম্মিদশার দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়, সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে শাহীন বলেন, “কক্সবাজার থেকে যাত্রা শুরুর পাঁচ দিন পর আমরা থাইল্যান্ড সীমান্তে পৌঁছাই। সেখানে দালালদের সঙ্গে মাঝিদের যোগাযোগ হয় থাইল্যান্ডের সিম কার্ড ব্যবহার করে। সবকিছু ঠিক আছে নিশ্চিত হওয়ার পর রাত প্রায় ৩টার দিকে স্পিডবোট আসে। সেখান থেকে ১০ জন করে আমাদের নামিয়ে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। জায়গাটির নাম ‘পাডান গুসার’।”

তিনি বলেন, “সেখানে দালালদের হাতে অস্ত্র ছিল। তাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা দালাল এবং থাই শিয়াং জাতিগোষ্ঠীর লোকজনও ছিল। তবে কঠোর নিরাপত্তার কারণে সেখান থেকে সরাসরি মালয়েশিয়ায় ঢোকা সম্ভব হয়নি। পরে পাহাড়ি পথ ধরে আমাদের ইন্দোনেশিয়ায় নেওয়া হয়। ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছানোর পর রাত ১২টার দিকে আবার স্পিডবোটে করে মালয়েশিয়ার ‘সিঙ্গাবাতানি’ নামক স্থানে পৌঁছানো হয়। সেখানে একটি গুদামঘরে আটকে রাখা হয়। পরে সাড়ে তিন লাখ টাকা দেওয়ার পর আমি মুক্তি পাই।”