ক্রিকেটের বাইশ গজে উদ্বোধনী জুটি সফল হলে খেলার মোড় অনেক সময়ই ঘুরে যায়। অনেক সময়ই মঞ্চস্থ হয় জয়-পরাজয়ের আগাম দৃশ্যপট। রাজনীতির মাঠও অনেকটা তাই। ‘প্রভাতে প্রস্ফুটিত হয়, সাঁঝবেলার বারতা’-তেমনই দিনের শুরুটা ভালো হলে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছায় সাধারণ মানুষের কাছে। দেড় বছরেরও বেশি সময় পর ফের সংসদীয় রাজনীতিতে পা ফেলা ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ছিল ঠিক এমনই। ২৫ কার্যদিবসের এই সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যেমন বাহাস ছিল, তেমনই ছিল তর্কবিতর্ক। আবার বাগযুদ্ধ কিংবা তুমুল কথার লড়াই কখনো সংসদকে প্রাণবন্ত করেছে। এতে ঐক্য ও অনৈক্যের সুর থাকলেও দিন শেষে পুরোটা সময় ঐক্যের বার্তা ছড়িয়েছে এবারের অধিবেশন। বিশ্লেষকরা তাই একে ইতিবাচক হিসাবে দেখছেন।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, ‘অতীতে আমরা পাতানো সংসদ দেখেছি। কে সরকারি দল আর কে বিরোধী দল, তা বোঝা যেত না। দুই পক্ষই ছিল একাকার। কিন্তু দীর্ঘদিন পর এবার একটি ইতিবাচক সংসদ আমরা দেখছি। এখানে সরকার এবং বিরোধী দলের অবস্থান পরিষ্কার ও স্পস্ট। এক পক্ষ আরেক পক্ষের সমালোচনা করেছে ঠিকই, আবার জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে তারা ভূমিকাও পালন করছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটে সরকার ও বিরোধী দল মিলে যে কমিটি গঠন করেছে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।’ তিনি বলেন, ‘এভাবে সরকার ও বিরোধী দল মিলে একসঙ্গে কাজ করতে পারলে এবং সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করলে বর্তমান সংসদ তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এবারের সংসদ সেদিকেই হাঁটছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শামসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে নানা বিষয়ে বিতর্ক হয়েছে। এটি অবশ্যই একটি ইতিবাচক দিক। তবে সংসদ যেন অর্থবহ হয়, সেদিকেও সব পক্ষকে নজর দিতে হবে। বিরোধী দল বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করবে-সংসদীয় ব্যবস্থার এই রীতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেখা গেছে। যেমন: জ্বালানি সমস্যা নিয়ে বিরোধী দল সংসদে সরকারের সমালোচনা করেছে। সরকারি দল জবাব দিয়েছে এবং সমস্যা সমাধানে বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে কমিটি গঠন করেছে, এটি ভালো লক্ষণ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ মনে করেন, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য সংসদের প্রথম অধিবেশন ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজের মতে, সংসদ কেবল টকিং ক্লাবে পরিণত হলে চলবে না। এখানে জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে হবে। কারণ, এবারের সংসদ আগের মতো নয়। এটি একটি গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সংসদ। তাই এ সংসদের কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক।
এবারের সংসদে পরস্পরের বিরুদ্ধে কুৎসা বা হিংসাত্মক না হয়ে উঠার নেপথ্যে বেশির ভাগ পর্যবেক্ষকই প্রধানমন্ত্রী ও সংসদনেতা তারেক রহমানের ইতিবাচক ভূমিকার কথা আলোচনা করেন। তাদের মতে, অত্যন্ত ধীরস্থির ও শান্তভাবে অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে যে ইতিবাচক বার্তা দিয়ে সংসদীয় কার্যক্রমের সূত্রপাত ঘটান, শেষ দিনেও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়ে আলো ছড়িয়েছেন তিনি। তিনি দীপ্তকণ্ঠে বলেছেন, বর্তমান সংসদকে কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদের রঙিন চেয়ারের মর্যাদা রক্ষায় সবাইকে একযোগে কাজ করারও আহ্বান জানান। একইভাবে ইতিবাচক ছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। রীতিনীতি মেনে তার নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদীয় কার্যক্রমে সরব এবং সক্রিয় ছিলেন অধিবেশনজুড়ে। প্রধানমন্ত্রীর কন্যার সম্মানহানির চেষ্টায় জড়িতদের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বিচারের দাবি জানান তিনি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষে নতুন সংসদের যাত্রা শুরু হয় ১২ মার্চ। নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বহুলকাঙ্ক্ষিত এবারের সংসদ সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সরব উপস্থিতি এবং খোলা মনে আলোচনায় প্রথম থেকেই প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। প্রবীণদের পাশাপাশি নবীনরাও সংসদকে প্রাণবন্ত করে তোলেন। নবীন সংসদ-সদস্য হলেও শেষ দিনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামের গঠনমূলক বক্তব্য সবার নজর কেড়েছে। আইনপ্রণয়ন, প্রশ্নোত্তরপর্বে অংশগ্রহণ, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের নোটিশের ওপর আলোচনা, পয়েন্ট অব অর্ডার, ৭১ বিধি, রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনার পাশাপাশি নিজের নির্বাচনি এলাকার দাবিদাওয়া তুলে ধরতে সোচ্চার ছিলেন সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ-সদস্যরা।
তবে সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান সামনে রেখে গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অগ্রভাগে থেকে লড়াই করা প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নিয়ম মেনে অধিবেশনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন। প্রয়োজনে কথা বলেছেন, কখনো উৎসাহ দিয়েছেন, কখনো আবার নিবৃত্ত করেছেন। একটিবারের জন্যও তিক্ততার পথে হাঁটেননি তিনি। বরং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিরোধী দলের প্রস্তাব মেনে নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়ে কমিটি গঠন করে অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। তারেক রহমান বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, আর অতীতে ফেরা নয়, সবাই মিলে এখন দেশকে এগিয়ে নেওয়ার সময়।
শপথ গ্রহণ, সংবিধান সংস্কারসহ জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দল প্রথম দিন থেকেই সরব থাকলেও তাদের গঠনমূলক ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সরব উপস্থিতি সংসদ অধিবেশনে প্রাণের সঞ্চার করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সুরে সুর মিলিয়ে তিনি বলেছেন, আজকের এই গ্যালারি হচ্ছে বাংলাদেশ। এই গ্যালারির দিকে দেশের জনগণ তাকিয়ে আছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। সংসদকে কার্যকর করতে বিরোধী দলের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সংসদ মানেই পুরো বাংলাদেশ। এই সংসদের সফলতা মানেই দেশের সফলতা। তাই এ সংসদকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। একইভাবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে গঠনমূলক সমালোচনা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তোলেন। তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে বলেন, দলমতনির্বিশেষে দেশের স্বার্থে আমরা যদি এক থাকতে পারি তবে কোনো অপশক্তিই আমাদের সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রাকে রুখতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলের নেতার এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংসদে ঐক্যের এক অনন্য নজির তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সমাপনী ভাষণে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও আশার কথা শুনিয়েছেন। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ ১৮ বছর পর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত এই সংসদে দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে প্রধান লক্ষ্য। স্পিকার আরও বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই শীর্ষ নেতার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশের সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন গণতান্ত্রিক চর্চার চিত্র যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনই জন-আকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন ঘটেছে। সরকার ও বিরোধী দলের তুলনামূলক অবস্থান এবং বিতর্কের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী দর্শন স্পষ্ট হয়েছে, তেমনই সাধারণ মানুষের চাওয়াপাওয়ারও প্রতিফলন ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি আরও মজবুত হয়েছে।
তবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ শক্তির কথা তুলে ধরে বিগত আওয়ামী লীগ আমলের মতো কিছু ‘ন্যারেটিভ’ চিত্রায়িত হয়েছে অধিবেশনের শেষদিকে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে কিছুটা তিক্ততা বেড়েছে, তেমনই কিছু সময়ের জন্য দৃশ্যমান হয়েছে অনৈক্যও। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা এবং মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিরোধিতা ইস্যুতে সংসদ মাঝেমধ্যে অশান্ত হয়ে উঠতে দেখা গেছে। বিরোধী দল তিন দফায় ওয়াকআউট করেছে। আবার ফিরে এসে সংসদীয় কর্মকাণ্ডে যথারীতি অংশ নিয়েছে।
সর্বশেষ মঙ্গলবার সংসদে বিএনপির সংসদ-সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্যের কারণে প্রায় ১০ মিনিট অচল ছিল অধিবেশনের কার্যক্রম। ওই সময়ে সংসদের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্নদিকে মোড় নেয়। একপর্যায়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দুই পক্ষকে নিবৃত্ত করতে দাঁড়িয়ে যান। পরিস্থিতি শান্ত হলে তিনি সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, সারা জাতি দেখছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের নিরপেক্ষভাবে অধিবেশন পরিচালনাও সবার বাহবা কুড়িয়েছে। সংসদের ভেতরের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে মূল কান্ডারির ভূমিকায় ছিলেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। প্রথম অধিবেশনেই সফলতার নজির স্থাপন করেন তিনি। শেষের দিকে এসে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে উঠলে হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজানের আবেগঘন বক্তব্য পরিস্থিতিকে অনেকটাই শান্ত করতে সহায়তা করে। নিজান বলেন, আমরা আর কত তর্ক, আর কত বিতর্ক এবং পরস্পরকে ঘায়েল করব। আসুন এই সংসদকে সবাই মিলে জনগণের আকাঙ্ক্ষার সংসদে পরিণত করি।
সংসদে অতীতে যেমন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার থেকে কুযুক্তি কিংবা কুতর্ককে উসকে দিতে দেখা যেত, এবার ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম। তারেক রহমান নিজে পরিমিত ভাষায় কথা বলেছেন। বিনয় এবং অন্যকে সম্মানের মনোভাব দেখিয়ে সংসদীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি দলের সংসদ-সদস্যদেরও সেভাবে পথ চলতে উৎসাহ দিয়েছেন তিনি। কেউ অযাচিত মন্তব্য করলে তিনি নিরুৎসাহিত করেছেন। নামাজের বিরতির সময়ে নিজের দলের পাশাপাশি বিরোধী দলের সদস্যদের কথা শুনেছেন। সংসদে বসেই অনেকের সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। অধিবেশন চলাকালে একজন সংসদ-সদস্য অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রধানমন্ত্রী ছুটে যান। তিনি ওই সংসদ-সদস্যের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। সংসদ চলাকালেই বিরোধী দলের নেতাকে ডেকে নিয়ে কথা বলেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদীয় রাজনীতিতে তারেক রহমান যে ইতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে চান, তার প্রতিটি পদক্ষেপে এবার সেটিই প্রমাণিত হয়েছে।