Image description
সাড়ে ৪ লাখ সরকারি পদ শূন্য

জনপ্রশাসনে অনুমোদিত ১৯ লাখ ১৫১টি পদের বিপরীতে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদই শূন্য পড়ে আছে। শূন্য পদের এ সংখ্যা মোট জনবলের প্রায় ২৫ শতাংশ। এসব পদ পূরণে সেই অর্থে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দৃশ্যমান নয়। শীর্ষ কর্মকর্তাদের কারও ভাষ্য-মামলার কারণে শূন্য পদে জনবল নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না। কেউ বলছেন, ৩০-৩৫ বছর আগের নিয়োগবিধির আলোকে নিয়োগ দেওয়া যুক্তিসংগত নয়। এছাড়া প্রভাবশালী মন্ত্রী-এমপিদের তদবিরের ঝক্কির পাশাপাশি লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি তো আছেই। এসব নানাবিধ কারণে প্রশাসনের পদস্থদের মধ্যে একটা অনাগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে।

জনপ্রশাসনের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, মামলার কারণে অনেক নিয়োগ আটকে আছে। এছাড়া নিয়োগে কোনো সমস্যা থাকার কথা নয়। তবে নিয়োগে তদবির ছিল, আছে এবং থাকবে। এটাই বাস্তবতা। এসবের মধ্যেই চাকরিপ্রার্থীদের জন্য একটি সমপ্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করে নিয়োগ দিতে পারাই আমাদের কাজ। সে কাজটি আমরা করেছি, করছি এবং করব। কথা হয় ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, যেসব পদে ঝামেলা নেই, সেখানে আমি নিয়োগ দিয়েছি। এখনো দেওয়ার চেষ্টা করছি। তবে আইনগত ঝামেলা হলে এড়িয়ে চলি। সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক সরকারের সময় নিয়োগে আগের চেয়ে তদবিরের চাপ বাড়বে। আগে কোটা দেখিয়ে কিছু নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ ছিল। এখন তাও থাকবে না। তিনি আরও বলেন, জনবল শূন্য থাকলে জনসেবা বিঘ্নিত হবে। সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নিয়োগবিধি হালনাগাদ করা নেই। ৩০ থেকে ৩৫ বছর আগের নিয়োগবিধির আলোকে জনবল নিয়োগ দিলে সমস্যা আছে। সেক্ষেত্রে নিয়োগ বিলম্ব হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কেএম আব্দুল ওয়াদুদ যুগান্তরকে বলেন, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এখন উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এ ঝুঁকি এখন আর কেউ নিতে চান না। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির জনবল নিয়োগে কোনো কারণ ছাড়া একই পরীক্ষা তাকে পাঁচবার নিতে হয়েছে। তিনি জানান, নিয়োগবিধি হালনাগাদ নেই। তাছাড়া আগে বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার পর মন্ত্রণালয় ভাইবা নিয়ে নিয়োগ চূড়ান্ত করত। জনপ্রশাসনের সর্বশেষ সার্কুলারে বলা আছে, নিয়োগকারী মন্ত্রণালয়কে লিখিত পরীক্ষা নিতে হবে। লিখিত পরীক্ষা সব চেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ। যে কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় কেউ আর নিয়োগে জড়াতে চান না।

জনপ্রশাসনের আরেক অতিরিক্ত সচিব যুগান্তরকে বলেন, আমার পরিচিত এক স্যার নিয়োগ নিয়ে বিবাদে জড়ানোর কারণে আর পদোন্নতিই পাননি। একজন সাবেক ডিসি (এখন যুগ্মসচিব) জানিয়েছেন, ৫০ জন এমএলএসএস নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর একজন এমপি ৫২টি ডিও লেটার পাঠিয়েছেন। ওই জেলায় আরও ৪ জন এমপি রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত ওই নিয়োগ না দিয়েই তিনি অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন। এ পরিস্থিতিতে কেউ জড়াতে চান না।

আলাপচারিতায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলছিলেন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে নিয়োগে একটি পদের জন্য ডিও লেটার আসে ৮০-১২০টি। এখন কোনটি রেখে কোনটি ফেলব। কেউ কারও চেয়ে কম প্রভাবশালী নন। যার ডিও লেটার অনার করা হবে না, নির্ঘাত তার রোষানলে পড়তে হবে। আবার পান থেকে চুন খসলেই সব দায়িত্ব নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের।

এছাড়া দালালচক্র তো আছেই। তারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করবেই। এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তদন্ত কমিটি হবে। গণমাধ্যমে তুলাধুনা করা হবে। সঙ্গে যোগ হবে নিয়োগ কমিটির কে কখন কোথায় কী করেছে তা। সব মিলিয়ে নিয়োগ এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। যাদের নিয়ে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, তারা কেউ কাউকে বিশ্বাস করেন না। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসবোধের অভাব চরম আকারে দেখা দিয়েছে।

সবচেয়ে বেশি পদ খালি আছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। এ মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর ও সংস্থায় শূন্য পদের সংখ্যা ৭৪ হাজার ৫৭৪টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৪ হাজার ৭৯০টি পদ খালি আছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। দুই মন্ত্রণালয়ে মোট শূন্য পদের সংখ্যা ১ লাখ ১৯ হাজার ৩৬৪টি। অর্থ মন্ত্রণালয়ে শূন্য পদের সংখ্যা ২৬ হাজার ১৭৪টি, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে ১৫ হাজার ১১৩টি, কৃষি মন্ত্রণালয়ে ৯ হাজার ৭৯৬, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৬ হাজার ২৭৪, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ৫৮৭, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ৫৮৫, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৮ হাজার ৫৮৯ এবং নির্বাচন কমিশনে ৫৬১টি।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর ও সংস্থায় শূন্য পদের সংখ্যা ২ হাজার ২৭৪, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে ৭ হাজার ৪০৭, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে ৬ হাজার ৯৮, স্বরাষ্ট্রে ২০ হাজার ৩৮৯, গৃহায়ন ও গণপূর্তে ২ হাজার ২, তথ্য ও সম্প্রচারে ২ হাজার ৪৫, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে ৮৩৭টি শূন্য পদ রয়েছে।